নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মায়ের মৃত্যুর পর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেছিলেন সেনাবাহিনীর ল্যান্স করপোরাল সোহেল আলী (২৯)। সঙ্গে ছিল ছোট ভাই জয় আলী (২৪)। কিন্তু ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে ‘হট্টগোলে’ জড়িয়ে যান তারা। সে সময় মায়ের মরদেহ ট্রলিতে থেকে গেলেও তাদের নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। পরে আত্মীয়রা এসে মরদেহ নিয়ে যান।
এর আগে সোমবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় জুলিয়ারা বেগম (৫০) নামে ওই নারীর মৃত্যু হয়। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ধর্মহাটা গ্রামে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বেলা সোয়া ৩টায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগ এনেছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রাতেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলার পর সেনাসদস্য সোহেল আলীকে সেনাবাহিনী নিয়ে যায়। আর ছোট ভাই জয় আলীকে আদালতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে জামিন নিয়ে তিনি মায়ের জানাজায় আসেন। আর বড় ছেলেকে জানাজায় নিয়ে আসে সেনাবাহিনী। তিনি সেনাবাহিনীর হেফাজতে আছেন।
জয় আলী জানান, তিনি মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ১১টার দিকে আদালত থেকে জামিন নিয়ে এসে মায়ের জানাজায় উপস্থিত হয়েছেন। বড় ভাইকে সেনা হেফাজতে জানাজায় নিয়ে আসা হয়। জানাজা শেষে সেনাবাহিনী আবার তাকে নিয়ে চলে যায়।
তিনি আরও বলেন, তার মায়ের শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকলে তিনি ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের ডেস্কে বসা নার্সদের ডাকতে যান। তখন তারা বলেছেন, স্যার ছাড়া কিছু করতে পারবেন না। ইন্টার্ন চিকিৎসকরাও তাদের কথা শোনেননি।
জয় দাবি করেন, অবহেলাজনিত কারণেই তার মায়ের মৃত্যু হয়েছে, এ কথা বলতে গেলে যারা তার ভাইয়ের ওপর হামলা করেছেন তাদের তার নার্স, ডাক্তার বলে মনে হয়নি। মনে হয়েছে তারা সন্ত্রাসী। হাসপাতালে কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা না থাকলে তারা তার ভাইকে মেরে ফেলতো।
পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে জুলিয়ারা বেগমের মৃত্যু হয়েছে। এ কথা বলতে গিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে তারা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। সোহেল আলী মোবাইল ফোন নিয়ে ভিডিও করতে গেলে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা এসে তাকে মারধর করেন। এতে সোহেলের মুখে জখম হয়। সোমবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল। এরপর রাত ৩টার দিকে তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার এস এম মোশাররফ হোসেন। মামলায় অজ্ঞাত আরও একজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, মায়ের মৃত্যুর পর আসামিরা চিকিৎসায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে ইন্টার্ন চিকিৎসকের সঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসক তানিয়া আক্তার ও শিবলীর সরকারি কাজে বাধা দিয়ে আক্রমণাত্মক এবং মারমুখী হয়ে কথা-কাটাকাটি করে এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি প্রদর্শন করতে থাকেন। পরে পরিচালকের নির্দেশে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জেনে থানায় এসে বাদী এজাহার দায়ের করেন। বিবাদী সোহেল আলী ইন্টার্ন চিকিৎসক ও উপস্থিত লোকজনের কাছে আটকের সময় সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ আছে।
এদিকে, মামলার এজাহারে চিকিৎসক তানিয়া আক্তার ও শিবলীর সঙ্গে মারমুখী আচরণ করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। শিবলী বলেন, তিনি ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ওই সময় ছিলেন না। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে একই রকম একটা বিষয়ের মুখোমুখি হয়েছেন।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস জানান, শিবলী ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে তখন ছিলেন কিনা, এটা তিনি বলতে পারবেন না। তবে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ধর্মঘট অব্যাহত রয়েছে। এই অবস্থায় বুধবার (২২ এপ্রিল) সকাল ৯টায় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা একটি সংবাদ সম্মেলন করে তাদের কথা বলবেন।
এদিকে, মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রোগীর স্বজনদের দ্বারা হেনস্তার শিকার হওয়ার প্রতিবাদে ও দোষীদের সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। আকস্মিক এই কর্মবিরতির ফলে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত রোগী। দাবি আদায়ে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ৯টায় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেন বিক্ষুব্ধ ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ২৪ ঘণ্টার এই কর্মবিরতির মধ্য দিয়ে তাদের দাবি আদায় না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন









