নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (রামেক) নতুন ভবনে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার প্রমাণ পেয়েছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও অন্য দুটি তলার লিফটের সামনেকার টাইলসের নিচেও বাঁশের অস্তিত্ব দেখা গেছে। আবার গোটা ভবনের কোথাও ভেঙে টাইলস উঠে গেছে, তো কোথাও টাইলসই আপনা-আপনি খুলে পড়ে গেছে। কোথাও দেখা দিয়েছে ফাটল। এসবের হয়েছে ভবনটি নির্মাণের সময় পদে পদে অনিযম করার কারণে-এমনটিই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যে অনিয়ম এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়া ওই ভবনের আর কোথাও বাঁশের ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। তবে বাশ ব্যবহারের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।
- হাসপাতালের রক্ত সঞ্চালন বিভাগের প্রধান মোসাদ্দেক হোসেনক সভাপতি এবং রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী লতিফুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটির অপর সদস্য হলেন রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী নাফিজ মাহমুদ। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

রামেক হাসপাতালের নতুন ভবনে গিয়ে দেখা যায়, আগের দিন লিফটের সামনে যেখানে টাইলস উঠে বাঁশ দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে ঢালাই তুলে ফেলে ভিতরকার ব্যবহৃত বাঁশ দুটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে লিফটের সামনে প্রায় ৪ ইঞ্চির মতো জায়গা ফাঁকা হয়ে আছে। ওই জায়গাটি ফাঁকা হয়ে যাওয়া দুর্ঘটনা এড়াতে ডান পাশের লিফটিও গতকাল বন্ধ রাখা হয়। চালু রাখা হয় বাম পাশের লিফটি।
তৃতীয় তলার লিফটির সামনে ব্যবহৃত বাঁশ সরিয়ে নেওয়া হলেও দ্বিতীয় ও চতুর্থ তলার লিফটের সামনেও টাইলসের নিচে বাঁশ ব্যবহারের দৃশ্য দেখা যায়। তবে ভবনের আর কোথাও বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।
আবার গোটা ভবনজুড়ে বিভিন্ন স্থানে এরই মধ্যে ভেঙে কোথাও টাইলস উঠে যাওয়া, কোথাও ফাটল দেখা দেওয়ায় সে সংশয় আরো জোরদার করেছে হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে রোগী ও তাদের স্বজনদের মাঝেও। তাদের দাবি ভবনটির নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ কারণে মাত্র চার বছর যেতে না যেতেই ভবনটিতে এখন নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
এদিকে সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পেরে বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন হাসপাতালের কয়েকজন জেষ্ঠ্য চিকিৎসক। এসময় ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ দায়েম উদ্দিন বলেন, ‘ভবনে কেন বাঁশ করা হবে। এটা কি যেন-তেন বিষয় যে যা ইচ্ছে ব্যবহার করলাম?’
- ওই ভবনের অন্য দুটি তলার লিফটের সামনেও বাঁশ ব্যবহারের দৃশ্য দেখে কয়েকজন চিকিৎসক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে থাকেন-এ যে লিফটের পদে পদেই বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে! এই অনিয়মের তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
হাসপাতালের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বাঁশের ছবি নতুন করে যেন আর মিডিয়ায় না আসতে পারে-এ কারণেই সকালে গণপূর্ত বিভাগের লোকজন গিয়ে সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিকুল ইসলাম গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের ডেকে পাঠালে তাঁরা কয়েকজন এসে ওই বাঁশ সরানোর ব্যবস্থা করেন।

এদিকে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রায় ২৫ কোটি টাকায় ব্যয় হয়েছে রামেক হাসপাতালের এক হাজার শয্যায় উন্নিতকরণের জন্য চার তলার ওই ভবনটি নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে। এখনো প্রতি বছর অন্তত অর্ধকোটি টাকা বরাদ্দ আসে ওই ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণকাজে। কিন্তু সব টাকায় হয় লুটপাট। আগেও ভবনটি নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। আবার এখনো রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অর্থ লুটপাট করা হয়। ফলে ভবনটি ক্রমেই হুমকীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর বিভিন্ন স্থানে এরই মধ্যে ফাটলসহ টাইলস উঠে যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলোও সংস্কার করা হয়নি।
- ওই সূত্রটি আরো জানায়, ২০১১-১২ সালে ভবনটি নির্মাণের পর সেটি বুঝিয়ে নেন তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল হক। তিনি ভবনটির নির্মাণকাজের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। এর আগে অপর দুই নির্বাহী প্রকৌশলী মিহির চক্রবর্তি, এএনএম গোলাম মোস্তফার আমলেও ভবনটির নির্মাণকাজ হয়েছে। কিন্তু ভবনটি নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ফজলুল হকের সময়কালে।
তিনি চাইলে ভবনটির কাজ ঠিকমতো হয়েছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করেই বুঝিয়ে নিতে পারতেন ঠিকাদারের নিকট থেকে। কিন্তু অনিয়মের মাধ্যমে নিম্নমাণের কাজ হলেও সেটি দেখভাল না করে ভবনটি বুঝিয়ে নেন ফজলুল হক। ওই ভবনটির নির্মাণকাজ করেন মাঠ বিল্ডার্স নামের ঢাকার একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্টান।
তবে এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে ফজলুল হকের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

অপর দুই প্রকৌশলী মিহির চক্রবর্তি ও গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমরা কাজটি শেষ করে আসতে পারিনি। তাই এ নিয়ে কিছুই বলার নাই।’
- বাঁশ ব্যবহারের ঘটানাটি পরিদর্শনে এসে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী লতিফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ভবন তৈরীর পরে লিফট লাগানো হয়েছে। এ কারণে লিফটের সামনে কিছু জায়গা ফাঁকা ছিল। ওই ফাঁকা স্থানে দুর্ঘটনা এড়াতে সেখানে বাঁশ ব্যবহার করে তার ওপর সিমেন্ট ও বালু দিয়ে ঢালাই করে দেওয়া হয়েছে। এরপর ওই ঢালাইয়ের ওপর টাইলস বসানো হয়েছে। তবে যেহেতু বাঁশ নিয়ে কথা উঠেছে-তাই সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভবন নির্মাণ কাজের সিডিউলে কোথাও বাঁশের ব্যবহার করার কথা উল্লেখ আছে কিনা জানতে চাইলে ওই প্রকৌশলী বলেন, বাঁশ ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। সেখানে স্টিলের পাত বা লোহা জাতীয় কিছু ব্যবহার করা যেত। কিন্তু সেটি না করে লিফট বসানো বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি তারা করতে ঠিকাদার করতে পারেন না।
রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, লিফটের সামনের ফাঁকা জায়গাটিতেই কেবল বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। আর কোথাও বাঁশ ব্যবহারের সুযোগ নাই। যদিও সেখানে স্টিলের পাত বা লোহার রড ব্যবহার করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা না করে সেখানে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত ২০১২ সালের ১৭ জুলাই তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ.ফ.ম রুহুল আমিন উদ্বোধন করেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০০০ শয্যার নতুন ভবনটি। এরপর থেকে সেখানে অর্থপেডিক্স, মেডিসিনসহ কয়েকটি ওয়ার্ডে সার্বক্ষণিক শতশত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এটি কেন ব্যবহার করা হলো, বা আর কোথাও বাঁশের ব্যবহার করা হয়েছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।
স/আর









