রাজশাহী

রাজশাহী হাসপাতাল: ভর্তির চারদিন পরে মূল চিকিৎসা, পদে পদে হয়রানি

নিউজ ডেস্ক৭ জুলাই ২০২৬৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বর্হিবিভাগের স্যাম্পল কালেকশন ও রিপোর্ট ডেলিভারি বিভাগের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন সইবুর রহমান সাবু নামের এক ব্যক্তি। নিজের স্ত্রী আনোয়ারা খাতুন ভর্তি আছেন হাসপাতালের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে। তাঁর শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্ট নিতে তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন দুই ঘন্টা ধরে। দুপুর ১২টা থেকে রিপোর্ট দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি সকাল ১০টারও কিছু আগে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে যান। এসে দেখেন তাঁর আগে আরও জনা পঁঞ্চাশেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন রিপোর্টের অপেক্ষায়। দুপুর ১২টায় যখন রিপোর্ট দেওয়া হয়, তার প্রায় ৩০ মিনিট পরে স্ত্রী আনোয়ারার রিপোর্টটি হাতে পান সাবু।

এসময় তিনি বলেন, ‘এখন রিপোর্ট পেয়ে কি হবে। বড় ডাক্তাররা তো ওয়ার্ডে রাউন্ড (পরিদর্শন) দিয়ে চলে গেছে। আবার কাল সকালে আসবে। তাহলে আমার স্ত্রীর মূল চিকিৎসা শুরু হবে কখন? এখন যে ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা যেসব ওষুধপত্র লিখে দিচ্ছেন-সেগুলো ধারণা থেকে। রিপোর্ট না পেলে তারা বুঝবেন কি করে করে রোগীর রোগ কোন পর্যায়ে আছে?’

তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা খাতুনকে তিনি গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ভর্তি করেছেন। এর পর শুক্রবারে ছুটির দিনে অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা হাসপাতালে যাননি। পরের দিন শনিবার সকালে অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা ওয়ার্ডে গিয়ে রোগী দেখে কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী রোগীর শরীর থেকে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করতে দেওয়া হয় এবং বুকের এক্সরে করা হয় শনিবার দুপুরের মধ্যেই। সেই সব রিপোর্ট গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাতে পান সাবু। ততক্ষণে গতকাল অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের ওয়ার্ডে রাউন্ড (পরিদর্শন) শেষ হয়ে গেছে। আবার সোমবার সকাল ৯টার পর থেকে রাউন্ড শুরু হবে। তখন হয় আনোয়ারা খাতুনের রিপোর্ট দেখে তাঁর রোগের ধরন নির্ণয় করে চিকিৎসাপত্র দেবেন চিকিৎসকরা। ফলে ভর্তি হওয়ার চার দিন পরে ওই রোগীর মূল চিকিৎসা শুরু হবে।

শুধু আনোয়ারা খাতুনই নন, এভাবে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর যেসব রোগী ভর্তি হোন, তাঁদের মূল চিকিৎসা শুরু হতে চারদিন সময় পার হয়ে যাচ্ছে শুধু রিপোর্টের ওভাবে। আবার বৃহস্পতিবার দুপুরের আগে চিকিৎসক রাউন্ডে থাকা অবস্থায় রোগী ভর্তি হলে তারও চিকিৎসা শুরু হতে তিন লাগে। অর্থাৎ শনিবার দুপুর ১২টার পরে রোগীর অভিভাবকরা রিপোর্ট হাতে পেলে সেগুলো রবিবারের আগে আর অভিজ্ঞ চিকিৎসককে দেখানোও সুযোগ হয় না। ফলে রবিবার পর্যন্ত মূল চিকিৎসকার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

হাসপাতালের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন রইচ উদ্দিন (৫৫)। শুক্রবার দুপুরে তাঁকে ভর্তি করা হয়। ওই ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা শনিবার রইচ উদ্দিনকে দেখে এমআরআইসহ রক্তের কিছু পরীক্ষা করতে দেন। এরপর রক্তা পরীক্ষা করতে দেওয়া হয় শনিবারই। কিন্তু সেইদিন আর এমআরাই করা হয়নি। গতকাল সকাল সাড়েগ ১১টার দিকে রইচ উদ্দিনের কন্যা ফাতেমা খাতুনসহ পরিবারের লোকজন একটি ট্রলিতে করে তাঁকে হাসপাতালের রেডিওলোজি বিভাগের সামনে নিয়ে আসেন এমআরআই করাতে। কিন্তু এসে জানতে পারেন, আজকে (গতকাল) আর এমআরআই হবে না।

 

এরই মধ্যে ২০ জন রোগীর সিরিয়াল নেওয়া হয়ে গেছে। একদিনে ২০ জনের বেশি এমআরআই করা হয় না। উপায়ন্তর না পেয়ে আবার ট্রলি ঠেলে ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হয় রইচ উদ্দিনকে। আর রেডিওলোজি বিভাগে আনা-নেয়ার জন্য হাসপাতালের ট্রলিম্যানকে দিতে হয় ২০০ টাকা। কিন্তু এমআরআই করতে না পারায় হতাশ হয়ে পড়েন রইচের মেয়ে ফাতেমা।

তিনি বলেন, আমার বাবার শারীরিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। তিনি স্ট্রোক করেছেন। চিৎিকসক এমআরআই রিপোর্ট ছাড়া ঠিকমতো চিকিৎসাও নাকি দিতে পারছেন না। আবার এমআরআই করাতে এসেও ঘুরে যেতে হচ্ছে। কাল (সোমবার) সকাল ৮টা থেকে থেকে নাকি এমআরআই করাবে। কিন্তু রোগী নিয়ে এসে লাইন ধরতে হবে সকাল ছয়টার মধ্যে। কালকেও যদি সিরিয়াল না পাই, তাহলে আরও একদিন অপেক্ষা করতে হবে। তাহলে আমার বাবার চিকিৎসা শুরু হবে কবে?”

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুল কাদের গত শনিবার রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কেটে একজন চিকিৎসককে পেটের সমস্যার চিকিৎসা করাতে যান। চিকিৎসক আব্দুল কাদেরকে আল্ট্রাস্নোগ্রাম করার পরামর্শ দেন। এরপর তিনি ওইদিন বহির্বিভাগের আল্ট্রা¯েœাগ্রাম বিভাগে গিয়ে সেটি করান। কিন্তু আল্ট্রাস্নোগ্রামের  সেই রিপোর্ট তিনি হাতে পান গতকাল বেলা একটার দিকে। আব্দুল কাদের এরপর ওই রিপোর্ট নিয়ে দৌড়ে যান বর্হিবিভাগের সেই চিকিৎসকের কাছে। গিয়ে দেখেন তাঁর আগে দাঁড়িয়ে আছেন নারী-পুরুষসহ দুই লাইনে আরও অন্তত দেড়শ জন রোগী। ওই রোগীগুলো দেখতে দেখতে চিকিৎসক সাইদ সাতিল মুজতাহিদের দুইটার পার হয়ে যায়। এরপর তিনি হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। রোগী আব্দুল কাদেরসহ আরও অন্তত ৫০ জন রোগী চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি ফিরে যেতে হয়। চিকিৎসক সাইদ সাতিল মুজতাহিদের কক্ষ থেকে বলা হয় পরের দিন (সোমবার) সকালে এসে রোগীদের আবার লাইন ধরতে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার আব্দুল মজিদ নামের এক রোগী গত শনিবার হাসপাতালের বহির্বিভাগের ১৭ নম্বর কক্ষের চিকিৎসক মোক্তার আলীর কাছে চিকিৎসা নেন। ওই চিকিৎসকও রক্তের কিছু পরীক্ষা দিয়েছিলেন মজিদকে। শনিবার রক্ত পরীক্ষা করতে দিয়ে গতকাল রবিবার বেলা দুপুর একটার দিকে সেই রিপোর্ট হাতে তিনি। এরপর ওই চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি আজ (গতকাল) ছুটিতে আছেন। বুধবারে বসবেন। ওইদিন যেতে বলা হয় ওই আব্দুল মজিদক। তাঁর মতো ওই চিকিৎসকের কাছে আগের দিন চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের যাদের রক্তের পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছিলো, তাদের আবার বুধবারে যেতে বলা হয়। আর না হলে নতুন করে টিকিট কেটে অন্য চিকিৎসকের কাছে দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

ওই চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ইসমাইল হোসেন নামের এক রোগী বলেন, ‘একদিন পরে রিপোর্ট তো হাতে পেলাম। এখন গিয়ে দেখি ডাক্তারই আসেননি। অন্য ডাক্তারের কাছে রিপোর্ট দেখাতে গেলে তিনি বললেন নতুন করে টিকিট কেটে আনতে হবে। এখন টিকিট কাটতে গেলে লাইন ধরে টিকিট পেতে দুইটা পারও হয়ে যেতে পারে। তখন তো ওই চিকিৎসকও আর থাকবে না। তাহলে আমাদের কি এভাবেই হয়রানি করা হবে? চিকিৎসার নামে পদে পদে আর কত হয়রানির শিকার হবো আমরা?

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এমন অব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাইলে মুখপাত্র চিকিৎসক শকঙ্কর কে বিশ্বাস বলেন, ‘রিপোর্ট পেতে রোগীদের কিছুটা সময় লাগছে। এর কারণ হলো রোগীর চাপ বেশি। সেই হিসেবে পরীক্ষা-নীরিক্ষার পরিমাণ বেশি হচ্ছে। যেগুলো শেষ করতে কিছুটা সময়সাপেক্ষ। এতে করে একদিন পরে রিপোর্ট ডেলিভারি দিতে হচ্ছে। আর সেটি করতে গিয়ে রোগীর চিকিৎসাও কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।’

তিনি বলেন, রিপোর্ট ডেলিভারি সুষ্ঠ মতে করতে আমরা আলাদা কাউন্টার করেছি। কাউন্টার বাড়ানো হয়েছে। তার পরেও রোগী ও স্বজনদের চাপ থাকছে। তবে চিকিৎসাকর ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আন্তরিকতার অভাব নাই।’