নিজস্ব প্রতিবেদক:
খাল থেকে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্পের মাধ্যমে পানি টেনে তুলে পাইপের মাধ্যমে জমিতে দেওয়ার জন্য ১৬০ জন অপারেটর নিয়োগ করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। এদের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় চমিতে পানি সেচ দিতে পাইপ বসানোর জন্য বিএমডি অংশগ্রহণকারী ফি হিসেবে কৃষকদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে (প্রতিটি পাম্প থেকে) নিচ্ছে বিএমডিএ। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরতরা এই অঘোষিত অপারেটরদের কাছ থেকে আদায় করছেন ৭০ হাজার টাকা করে। আর টাকা সংগ্রহের জন্য কৃষকদের নিকট থেকে বিঘাপ্রতি এক হাজার টাকা করে ধার্য করেছেন অঘোষিত অপারেটররা। নিয়োগ পাওয়ার আগেই নিজেদের অপারেটর ঘোষণাকারীরা কৃষকদের কাছ থেকে অনেকটা জোর করেই আদায় করছেন এই টাকা।
সব কৃষকই যে সমান হারে টাকা দিচ্ছেন তা-ও নয়। তবে এই প্রকল্প এলাকার আওতায় পড়া ১০ হাজার ২৫০ হেক্টর জমির মালিকদের কমবেশি সবাইকেই টাকা দিতে হচ্ছে অপারেটর নিয়োগ পেতে যাওয়া ব্যক্তিদের হাতে। কেউ কিছু টাকা দিচ্ছেন, আবার পরে দেবেন বলে কথা দিচ্ছেন। আবার কেউ একেবারেই দিতে পারছেন না, তাঁরাও পরে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন অপারেটরদের। আর টাকা না দিলে বোরো মৌসুমে সেসব কৃষকের জমিতে পানি সেচ দেবেন না অপারেটররা এমন হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে এই প্রকল্পের আওতায় বিঘাপ্রতি কৃষকদের এক হাজার টাকা দিতে হলে অন্তত ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে অপারেটরদের মাধ্যমে। এরই মধ্যে অন্তত পাঁচ কোটি টাকা তোলা হয়েছে কৃষকদের কাছ থেকে। বাকি টাকাও এই প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের ধান চাষ শুরু করার পরে পর্যায়ক্রমে দিতে হবে।
সরেজমিন অনুসন্ধান এবং বিএমডিএ সূত্র মতে, শুধু পাইপলাইন বসাতেই এরই মধ্যে এক কোটি ১২ লাখ টাকা তোলা হয়েছে। যার মধ্যে প্রতিটি পাম্প এলাকার জন্য ১৬০টি পাম্পের অধীনে পাইপলাইন বসাতে ৫০ হাজার টাকা করে ফি হিসেবে ৮০ লাখ টাকা পাবে বিএমডিএ। আর বাকি ৩২ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হবে বিএমডিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে। গোদাগাড়ী, কাঁকনহাট এবং পবা বিএমডিএ কর্মকর্তাসহ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যেও ভাগ-বাটোয়ারা হবে সেই টাকা।
তবে বিএমডিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক শিবির আহমেদ বলেন, ‘বিএমডিএ থেকে পাইপলাইন বসানোর জন্য যে ৫০ হাজার টাকা করে অংশগ্রহণ ফি ধার্য করা হয়েছে, সেটিই আদায় করার কথা। এর বাইরে কৃষক পর্যায়ে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
রাজশাহীর গোদাগাড়ী, তানোর ও পবা উপজেলার গ্রামগুলোর মধ্যে প্রশাদপাড়া, বিল্লি, বিলাশী, বাবুপুর, খড়িয়কান্দি, আলোকচ্ছত্রসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে জানা গেছে, ‘কারা ১৬০টি পাম্প পরিচালনার জন্য অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পাবেন, সেটি এখনোই স্থানীয় নেতারা ঠিক করে দিচ্ছেন। ফলে তাঁরাও ওই টাকার ভাগ পাচ্ছেন। এই প্রকল্পের আওতায় পানি সরবরাহের পাইপ কোন কোন জমি দিয়ে যাবে, সেটিও নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন তাঁরা। এর ফলে অনেকেই এরই মধ্যে জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করলেও সেই জমির ভেতর দিয়ে ড্রেজার মেশিন দিয়ে মাটি খনন করে সেই দিক দিয়ে পাইপ বসানো হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, এই পাইপ বসানোতে পাইপের নিচে এবং ওপরে বালু ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও সেটিও করা হচ্ছে না। পাইপ বসানোর পরে খননকৃত মাটি দিয়েই সেই গর্ত ভরাট করা হচ্ছে। ফলে পাইপের স্থায়িত্ব টেকশই হবে না বলেও দাবি করেছেন কৃষকরা।
তানোরের প্রশাদপাড়া এলাকার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ধানের জমির ভেতর দিয়ে গর্ত করে মোটা পাইপ বসানো হচ্ছে। কিন্তু পাইপ বসানোর পরে বালু না দেওয়ায় মাটি দিয়ে ভরাট করার ফলে চাপ লেগে সেটি ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে বেশি। এসব পাইপ খুব বেশিদিন যাবে বলে মনে হয় না।’
দুলাল উদ্দিন নামের একজন বলেন, ‘এখন পাইপ বসাতে অলিখিত অপারেটররা বিঘাপ্রতি এক হাজার টাকা চাঁদা ধার্য করেছেন। আমরা কিছু টাকা দিছি। তা-ও আমাদের এলাকা থেকেই অন্তত সাড়ে তিন লাখ টাকা তোলা হয়েছে। অপারেটর নিয়োগ নিতে নাকি ৭০ হাজার টাকা করে লেগেছে।’
আরেক কৃষক মাজেদুর রহমান বলেন, ‘আমার ১৫ বিঘা জমি আছে। বিঘাপ্রতি এক হাজার টাকা চাইছে। আমি ১০ হাজার টাকা দিছি। আর দিতে পারব না বলেছি। কিন্তু অপারেটর বলেছেন ধান চাষের সময় দিতে হবে।’
বিএমডিএ সূত্র মতে, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষি ও পরিবেশ উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ডাবল লিফটিং পদ্ধতিতে পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলন করে বরেন্দ্র এলাকায় সরবরাহ ও সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর জন্য পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলন করে সেই পানি খালে ফেলানো হবে। এরপর প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এবং শেষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জুনে। সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৫৪৮ কোটি টাকা। তবে আগামী জুনের মধ্যে এই কাজ শেষে হবে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন খোদ বিএমডিএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাই।
জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক শিবির আহমেদ বলেন, ‘জমিতে পানি সরবরাহের জন্য পাইপ বসানোর কাজে অনিয়ম হয়নি। এবার আমরা বালুর ব্যবহার শিডিউলে রাখিনি। রাখলেও ঠিকাদাররা দিতে চান না, তাই বালু বাদ দিয়ে মাটি দিয়েই ভরাট হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পদ্মা নদীর দুদাই এলাকা থেকে যেখানে বিদ্যুৎচালিত ছয়টি পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন করে খালে ফেলা হবে, সেই পানি ১৬০টি সোলার পাম্পের মাধ্যমে খাল থেকে উত্তোলন করে জমিতে সরবরাহ করা হবে পাইপের মাধ্যমে। তবে যেখানে পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলন হবে, সেখানে দুই একর জমি এখনো অধিগ্রহণ হয়নি। ফলে মূল পাম্প বসানোর কাজ এখনো শুরু হয়নি। এরপর বিদ্যুতের সাবস্টেশন নির্মাণসহ আনুষঙ্গি কাজ করতে আরো সময় লাগবে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষে হবে বলে মনে হচ্ছে না।’
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘পাইপলাইনের জন্য কৃষকদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে অংশগ্রহণ ফি নেওয়া হচ্ছে। এটি করতে গিয়ে কেউ কেউ হয়তো নিজেদের অপারেটর দাবি করে টাকা উত্তোলন করছেন বলে খবর আসছে। তবে অপারেটর নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয়নি এখনো। আগামী নভেম্বরের দিকে শুরু হতে পারে। কিন্তু এলাকার কিছু লোকজন হয়তো এখনোই নিযন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। তবে অভিযোগে পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’









