নিজস্ব প্রতিবেদক:
আমের রাজধানী রাজশাহীতে বেড়েই চলেছে আমের চাষ। গত কয়েক বছর ধরে রাজশাহীতে অব্যাহতভাবে বেড়েছে আমচাষ। এক হিসেব মতে, গত পাাঁচ বছরে রাজশাহীতে আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে দ্বিগুন। সেইসঙ্গে উৎপদানও বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। পাশাপাশি বাড়ছে অর্থনীতির গতিও।
মৌসুমজুড়ে আমা কেনা-বেচা, গাছ থেকে পাড়া, পরিচর্যা, পরিবহণসহ নানাকাজে যুক্ত থেকে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে হাজার হাজার মানুষের। চলতি বছরেও শুরু হয়েছে আমচাষ নিয়ে নানা কর্মযজ্ঞ। সেইসঙ্গে এবারও আম নিয়ে আশায় বুক বেধে আছেন হাজার হাজার চাষি।


- এরই মধ্যে আমগাছে আসা মুকুল ঝরে ছোট আকারের গুটি আসতে শুরু করেছে। সেই গুটিগুলো ধরে রাখতে চাষিরা বাগানে পরিচর্যাও শুরু করেছেন। কয়দিন পরেই এই গুটিগুলো মোটরদানার আকার লাভ করবে। এরপর সেগুলো কুড়িতে পরিণত হবে। তারপর হবে পরিপক্ক আম। বৈশাখের শুরুর দিকেই সেই আম উঠবে বাজারে। চাষিদের পকেটে ঢুকতে থাকতে টাকা।
রাজশাহী ফল গবেষণাগার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৯৬১ হেক্টর জমিতে আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা এটিই রাজশাহীতে সর্বোচ্চ আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা। এর আগের বছর ২০১৬ সালে রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল।
সেখান থেকে আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৭৯ মেট্রিক টন। সেখানে উৎপাদন হয় এক লাখ ৮১ হাজার ১০৭ মেট্রিক টন। গতবারের উৎপাদনই এবারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এবার গতবারের চেয়ে আম বেশি উৎপাদন হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। কারণ গতবারের চেয়ে এবার বেড়েছে লক্ষ্যমাত্রা।

ওই সূত্রটি আরো জানায়, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ হাজার ৫১৯ হেক্টর জমিতে। সেখানে চাষ হয়েছিল ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে। এর আগের বছর ২০১৪ সালে রাজশাহীতে আমচাষের জন্য ১৪ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে রাজশাহীতে আমের লক্ষমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৯৮৬ হেক্টর জমিতে। তবে সেখানে হয়েছিল ১৪ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে।
- রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আব্দুল আলীম জানান, হেক্টর প্রতি গড়ে ১৫ দশমিক ৫৮ মেট্রিক টন হারে আম উৎপাদন হবে বলেও এবারও আশা করা হচ্ছে। সেই হিসেবে এবার আমের উৎপাদন গতবারের চেয়ে অনেক বাড়বে। যা হবে সবচেয়ে বেশি আমের উৎপাদন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া এবং দুর্গাপুরে সবচেয়ে বেশি আমের উৎপাদন হয়। এর পরে রয়েছে পবা, বাগমারা, মোহনপুর, গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা।
-
এসব উপজেলার আম বাগানগুলোতে এরই মধ্যে মুকুল ধরে সেগুলো ঝরে পড়তে শুরু করেছে। আর ঝরে পড়া মুকুল থেকে এসেছে ছোট গুটি। সেই গুটিকে ঘিরে চাষিরা মেলতে শুরু করেছেন স্বপ্নডানা।
আমচাষিরা জানান, প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী আমগাছে এক বছর পর পর বেশি আম আসে। এর ফলে এক বছর অফ ইয়ার হলে, পরের বছরকে ধরা হয় অন ইয়ার।
এর অর্থ হলো, এক বছর কম আম আসে, তো পরের বছর তুলনামূলক বেশি হারে। সেই হিসেব মতে, গত বছর ছিল আমের অফ ইয়ার। এবার সেটি হয়েছে অন ইয়ার। আর এই অন ইয়ারে এবার আমের রাজধানী রাজশাহীর গাছগুলো শুরুতেই যেন বাধভাঙা জোয়ারের মতো করে আসে মুকুল।
- গাছে গাছে মুকুলের সমারোহ দেখা দেয়। এবার আবহাও রয়েছে অনুকূলে। বছরের শেষ শীতের দিকেও এবার তেমন কুয়াসা দেখা যায়নি। যদিও মুকুল আসার পরে গত ৩ ও ৪ মার্চ রাজশাহীতে হালকা বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে এই বৃষ্টিতে আমের মুকুলের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং কিছুটা হলেও খরার কবল থেকে মুক্ত হয়েছে আমের মুকুল। যা আমচাষের জন্য উপযোগীই হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজশাহীর বাঘার আমচাষি হাফিজুর রহমান বলেন, ‘রাজশাহীর সুস্বাদু আম সারাদেশজুড়েই ব্যাপক চাহিদা থাকে। ফলে এই আম ঘিরে রাজশাহীর চাষি ও আমবাগান মালিকরাও আশা-নিরাশার দোলাচলে ভোগেন। যেবার গাছে আম বেশি থাকে, দাম বেশি পাওয়া যায়, সেইবার আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি থাকে। আবার যেবার গাছে আম কম থাকে, সেইবার চাষিদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও কিছুটা হতাশ হয়ে ওঠেন। তবে এবার এমর মুকুলের সঙ্গে আশায় বুক বাধছি আমরা। আশা করছি মৌসুম শেষে এবার লাভবান হব আমরা।’
- বাঘার হাবাসপুর গ্রামের আম ব্যবসায়ী ও চাষি আশরাফুল ইমলাম বলেন, ‘এবার আমগাছ যে পরিমাণে গুটি এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে বাম্পার ফলন হবে। এখন বাকি সময়টুকুতে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না দেখা দিলেই হলো।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার প্রতিটি ৮-১০ বছর বয়সের ছোট আকারের একটি আম গাছেও অন্তত ২-৩ মণ আম আসবে। যা বিক্রি করে ভালো জাতের একটি আম গাছ থেকেই কমপক্ষে চার হাজার টাকার আম বিক্রি করা যাবে। আর বড় গাছগুলোতে কমপক্ষে ৮ মণ করে আম আসবে। যা বিক্রি করে চাষিরা কমপক্ষে ১৬ হাজার টাকা আয় করতে পারবে।’
- জেলার দুর্গাপুরের আমচাষি আলতাফ হোসেন জানান, ‘এবার সধারণ প্রক্রিয়ায় ছাড়াও ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতেও আমের চাষ করা হবে। যা হবে একেবারে কেমিক্যাল মুক্ত। এই পদ্ধতিতে চাষকৃত আমের চাহিদা বাড়ার কারণেই আমিও এবার ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আমচাষ করবো।’
তিনি আরো বলেন, ‘এবার ২২টি বাগান থেকে অন্তত এক হাজার ২০০ মণ আম বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করছি। যা বিক্রি করে অন্তত ২০ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছি।’
এসময়ে গুটির পরিচর্যায় করণীয়:
অন্যদিকে আমচাষের পরিচর্যা সম্পর্কে কৃষকদের উদ্দেশ্যে রাজশাহী ফল গবেষণাকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আব্দুল আলীম বলেন, ‘আমের গুটি টিকিয়ে রাখতে সাইপারমেটথ্রিন জাতীয় কীটনাশক এক মিলিমিটার এবং ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক দুই গ্রাম এক লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে গাছে ¯েপ্র করতে হবে। এছাড়াও খরা দেখা দিলে প্রতি ১৫-২০ দিনের মাথায় ২-৩ বার আম বাগানে সেচ দিয়ে পরিচর্যা নিতে হবে। তা না হলে খরায় আমের গুটি ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।’
তিনি বলেন,‘আম একটি যত্নশীল ফল। এটিকে যত্নসহকারেই উৎপাদন করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে যেন সেটি কখনোই বাড়তি যত্ন না হয়। তাহলে ভালো ফলনের চেয়ে আরও খারাপ হতে পারে। কাজেই আমের গাছে কোনো ধরনের সমস্য দেখা দিলেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী গাছের পরিচর্যা নিতে হবে।’
স/আর









