নিজস্ব প্রতিবেদক :
সরকারের যুগ্ম-সচিব পদমর্যদার কর্মকর্তা এসএম তুহিনুর আলম বর্তমানে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৫ আগস্টের মাত্র কিছুদিন আগে তাঁকে এ পদে বসানো হলেও এখনো তিনি রয়েছেন বহাল তবিয়তে।
এই সুযোগে রাজশাহী আরডিএর প্রায় ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা নগরীর তালাইমারী এলাকায় বঙ্গবন্ধু স্কয়ারকে পানির দামে লিজ দেওয়া, ভুয়া বিল-ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি সিন্ডিকেট এবং একটি ডেভেলপার কম্পানীর সঙ্গে গোপনে ব্যবসা করারও অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সূত্র মতে, বিসিএস ২১ ব্যাচের প্রভাবশালী কর্মকর্তা এসএম তুহিনুর আলম ২০০৮ সালে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে যোগদান করেন। সেখান থেকেই মূলত কপাল খুলে যায় তুহিনুর আলমের। সে সময় ফরিদপুরের সালথা ও নাগরকান্দা উপজেলার এমপি ছিলেন তৎকালীন সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরী। ২০০৮ থেকে ২০১২ এই ৫ বছর এসএম তুহিনুর আলম ছিলেন ফরিদপুরের সালথা এবং পরবর্তিতে নাগরকান্দা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে।
এরপর সাজেদা চৌধুরীর তদবিরে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের তৎকালীন বিতর্কিত উপাচার্য আব্দুস সোবহানের মাধ্যমে তুহিনুর আলম তাঁর স্ত্রী সেরেনা সুলতানাকে রবিশ^বিদ্যালয়ের ভাষা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাইয়ে দেন। ২০১১ সালের ৮ আগষ্ট সেরেনা সুলতানাকে রাবির শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ওই নিয়োগের সময় ভির্সি আব্দুস সোবহান ভাষা বিভাগে ২ জনের সার্কুলারের বিপরীতে ৪ জনকে নিয়োগ দেন।
অতিরিক্ত দুইজনের একজন ছিলেন তুহিনুর আলমের স্ত্রী সেরেনা সুলতানা আরেকজন ছিলেন রাজশাহীর পবা-মোহনপুর আসনের সংসদ তৎকালীন সংসদ সদস্য ও রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আয়েন উদ্দিনের স্ত্রী এলিনা আক্তার পলি। সেরেনা সুলতানা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করার ১২ বছর পর প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩৭ তম সিন্ডিকেটে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
সাজেদা চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তার পর শুরু হয় তুহিনুর আলমের আমলাতান্ত্রিক রাজনীতি।
সূত্র মতে, ২০১২ সালে ফরিদপুর থেকে বদলি হয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন তুহিনুর আলম। এরপর পদন্নোতি পেয়ে রাজশাহী জেলার এডিসি (শিক্ষা) হন। তৎকালীন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক মেসবাহ উদ্দিনের সময়ে। ২০১৪ সালের পর রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার হেলাল উদ্দিন যোগদান করলে তাঁর সঙ্গেও ভালো সখ্যতা গগে তুহিনুর আলমের। ওই সময়ে সরকারের প্রভাবশালী ডিসি মেসবাহউদ্দিন ও বিভাগীয় কমিশনার হেলাল উদ্দিন সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েছিলেন তুহিনুর আলম।
এরপর মেসবাহ উদ্দিন যখন মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব হন, তখন সিন্ডিকেট থেকে তুহিনূর আলম কে করা হয় রাজশাহী ওয়াসার ডিএমডি পদে বসানো হয়। রাজশাহী ওয়াসার জন্য একনেক ২০১৮ সালে ১৭ টি প্রকল্পে ১৪ হাজার ২০০ কোটি ৫৯ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ডিএমডির দায়িত্বে থেকেই ওয়াসার গোদাগাড়ীর জমি অধিগ্রহনের প্রায় ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের পিডি হন তুহিনুর আলম। এছাড়াও ১০০ কোটি টাকার কয়েকটি সার্ভে প্রকল্প এবং ৫ কোটি টাকার অপর একটি সার্ভে প্রকল্প থেকে বিপুল অংকের অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠে তুহিনুর আলমের বিরুদ্ধে। তুহিনুর আলমের সাথে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তাঁর অধিনস্ত রাজশাহী ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী ও আরেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা সোহেল রানা ডন। এরই মধ্যে ডনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তদন্ত শুরু করেছে।
এর মধ্যে ২০১৯ সালে ডিসিদের ফিটলিস্ট তৈরি হলে সেখানে তিনি প্রথম সারিতে আলোচনায় থাকলেও রাজশাহী ওয়াসার প্রজেক্টের হাজার কোটি টাকা লুটপাটের লোভে তিনি তখন আর সরকারের ডিসি হননি। এর চার বছর পরে তুহিনুর আলম ২০২২ সালে পদন্নোতি নিয়ে হন যুগ্ম-সচিব। সবশেষ ৫ই আগস্ট সরকার পতনের কিছুদিন আগে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন।
পরবর্তীতে সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব মেসবাহউদ্দিন ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ওএসডি হলে এবং ২৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব ও স্থানীয় সরকার সচিব হেলালউদ্দিন গ্রেফতার হন। কিন্তু এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন তাঁদের ডানহাত বলে পরিচিত আরডিএর চেয়ারম্যান এসএম তুহিনুর আলম।
সূত্র মতে, তুহিনুর আলমের বাড়ি জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলায় এবং তার সকল অবৈধ ব্যবসা দেখভাল করা ব্যক্তি হচ্ছেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আক্কেলপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা শহীদুল আলম চৌধুরী। যাকে তিনি অবৈধ টাকা দিয়ে আক্কেলপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত করেন ২০২০ সালে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মেসবাহ উদ্দিনের ক্ষমতাবলে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান হয়ে বহাল তবিয়তে থাকা তুহিনুর আলম স্ত্রী সেরিনা সুলতানার সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষক কোয়ার্টারে অবস্থান করেন।
সূত্র মতে, এই তুহিনুর আলমের মধ্যসত্বতায় তাঁর ঘোনিষ্ট আমানা গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজশাহীর বড়কুঠি এলাকায় ৬৩ কাঠার ওপরে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আবাসন প্রকল্পের ১৪ তলা ভবন নির্মাণে। সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ‘প্রত্যয় সমবায় সমিতি লিমিটেডের একসময় সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তুহিনুর আলম।
সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব ও স্থানীয় সরকার সচিব হেলালউদ্দিনের ডানহাত ছিলেন আমানা গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান। এই সুবাদে রাজশাহীতে বিভাগীয় কমিশনার থাকাকালীন আমানা সুপার শপও উদ্ধোধন করেছিলেন হেলালউদ্দিন। হেলালউদ্দিনকে ফুফাতো ভাই বলে পরিচয় দেন ফজলুর রহমান। সেই সুবাদেই ফজলুর রহমানের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেন তুহিনুর আলম। এরপর ফজলুর রহমানের সঙ্গে অলিখিতভাবে ডেভলপার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। সেই সুবাদে সরকারি আবাসন প্রকল্পের ওই ১৪ তলা ভবনটি নির্মাণের ডেভেলপার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে অনিয়মের হোতা এই আমানা গ্রুপ এখনো সেই ভবনটির কাজ শেষ করতে পারেনি।
জানতে চাইলে আমানা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাসউদুল হক বলেন, ‘আরডিএ চেয়ারম্যান এসএম তুহিনুর আলম স্যার ও রাজশাহীর সাবেক জেলা প্রশাসক মেসবাহ উদ্দিনসহ অন্য কর্মকর্তারা সরকারের কাছে থেকে একটা জমি সরকারি নিয়ম মেনে কিনেছেন। সেই জমিতে আমানা গ্রুপ ডেভেলপার হিসেবে তাদের সাথে পার্টনারে বিল্ডিংয়ের কাজ করছে। দ্রুতই আমরা কাজ শেষ করে দিব।’
এদিকে, রাজশাহীর তালাইমারীতে বঙ্গবন্ধু স্কয়ারকে ক্যাম্ব্রিয়ান স্কুল করতে পানির দরে ভাড়া দিতেও তুহিনুর আলমমের হাত ছিল। ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা এই ভবন ভাড়া দেওয়া হয় মাসিক মাত্র চার লাখ ৮০ হাজার টাকায়। এখানেও বড় অনিয়ম করা হয়।
গত বছরের ৭ জুলাই টেন্ডার আহ্বান করে আরডিএ। ওই টেন্ডারে অংশ নেন দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক, গোলাম রাব্বানী এবং সাইফুর রহমান নামের তিনজন। কিন্তু শুধু দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক ছাড়া বাকি দুজন দরপত্রের সঙ্গে জামানতের টাকা দেননি। নিয়ম অনযায়ী মাত্র একজন বৈধ দরদাতা থাকায় ওই দরপত্রটি বাতিল করার কথা। কিন্তু গত বছরের ১১ আগস্ট দরপত্র মূল্যায়ন করে কমিটি সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী ও সাইফুরের ‘দরপত্র দুটি বাতিল করে দেবাশীষ কুমারের দরপত্র বৈধ ঘোষণা করে তাকে ভাড়া দেওয়া হয়।
দরপত্র মূল্যায়নের পরদিনই (১২ আগস্ট) দেবাশীষ কুমার প্রামাণিকের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি সম্পাদনের অনুমোদন দেন আরডিএর চেয়ারম্যান এসএম তুহিনুর আলম। আরডিএর উদ্যোগে বিশ^ বসতি দিবস পালনের নামে শুধু ডকুমেন্টারি তৈরীতেই ৫ লাখ টাকার ভুয়া ভাউচারে বিল উত্তোলনের অভিযোগও আছে। রাজশাহীর একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে এ বিল প্রদানের নামে ওই টাকা আত্মসাত করার অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান তুহিনুর আলমের বিরুদ্ধে।
এছাড়াও আরডিএতে দুটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিজেদের লোকজনকে নিয়োগ দিতে তিনি গড়িমশি করছেন বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন।
তবে এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আরডিএ’র চেয়ারম্যান তুহিনুর আলম বলেন, ‘আমি কোনো সিন্ডিকেটের সাখেথই জড়িত ছিলাম না।
আমার স্ত্রী চাকরি পেয়েছেন তার যোগ্যতা বলে। আরডিএর ভবন টেন্ডারের লোকই পাওয়া যাচ্ছিল না। তার পরেও সর্বোচ্চ দরদাতাকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি।’
ভুয়া বিল ভাউচারে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ নাই। যারা কাজ করেছেন, তারা টাকা নিয়েছেন। জনবল নিয়োগ নিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এটি নিয়ে কথা উঠলে আমি নিয়োগই দিব না।’









