নিজস্ব প্রতিবেদক:
একসময় রাজশাহীর পদ্মা নদী ছিল ইলিশের অন্যতম উজানভূমি। গোদাগাড়ী থেকে চারঘাট পর্যন্ত নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় জেলেদের জালে ধরা পড়ত ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। শুধু মাছের প্রাচুর্যই নয়-ইলিশ এত বেশি ধরা পড়ত যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কোথাও কোথাও মাছ পচে দুর্গন্ধ ছড়াতো। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তখন ইলিশ মাটি খুড়ে চাপা দিয়ে রাখতেন জেলেরা। আবার ইলিশ শুকিয়ে শুঁটকি করাও হত। এখন সেই ইলিশেরই যেন দেখা নাই। জেলের জালে মাঝে মাঝে ধরা পড়ছে জাটকা। সেগুলোও অল্প পরিমাণে।
রাজশাহী মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট ও বাঘা-এই চার উপজেলায় মোট ৫ দশমিক ৩৭ টন ইলিশ ধরা পড়ে। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজশাহী জেলায় ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ৫৫ টন। অর্থাৎ প্রায় ১০ বছরের ব্যবধানে ইলিশ আহরণে বড় ধরনের পতন হয়েছে। এবার আরও কম আসছে ইলিশ। এলেও খুবই ছোট আকারের। জাকে বলা হয় জাটকা। এগুলো ধরা নিষিদ্ধ হলেও জেলের জালে এসে পড়লে সেগুলো আর ছাড়া হয় না। জেলেরা সেই মাছই বাজারে এনে বিক্রি করছেন।

রাজশাহী মৎস্য অধিপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া বলেন, ‘রাজশাহীর পদ্মায় ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত কারণগুলো হলো, নদীর পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা কমে যাওয়া, নদী দূষণ, অবাধে জাল ফেলা এবং ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন করা। পদ্মায় পানির প্রবাহ কমেছে, অনেক জায়গায় নদীর গভীরতা কমে চর ও বালুর আধিক্য বেড়েছে। ফলে সমুদ্র থেকে উজানে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যাতে করে ইলিশ পদ্মায় আসতে স্বাচ্ছন্দবোধ না করে গতিপথ পরিবর্তন করছে। এছাড়াও অবাধে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে শিকার, পদ্মায় শহরের বর্জ্য নেমে নদী দূষিত হওয়ার ফলেও ইলিশের সংকট বাড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার ভরা বর্ষা মৌসুমে রাজশাহীর জেলেরা তেমন ইলিশ পাননি বলে খবর পেয়েছি। তার পরেও যেটিই তারা পেয়েছে, সেটিই ধরেছে। এতে জাটকাই ধরা পড়েছে বেশি। তবে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখার সময় আমরা নিয়মিত অভিযান চালাবো।’
রাজশাহীর চারঘাটের টাঙ্গন এলাকার জেলে আব্দুল ওহাব বলেন, ‘ইলিশ এবার আরও কমে গেছে। মাঝে মাঝে দুই-একটা ছোট ছোট জাটকা ধরা পড়ছে জালে। ধরা পড়লে সেগুলো আমরা রেখে দিয়ে বাজারে বিক্রি করি। তাও ৪০০-৫০০ টাকা কেজি দাম পাওয়া যায়। তাই কোনো জেলেই ইলিশ ফেলে দেন না। কোনো মাছই ফেলে দেন না কেউ।’
ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আসলাম উদ্দিন বলেন, চায়না দুয়ারি জাল (কারেন্ট জাল) সব মাছ শেষ করে দিল। ইলিশ তো আর তেম দেখায় পাওয়া যায় না।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের গবেষকদের মতে, ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীর উজানে এসে প্রজনন করে। স্বাভাবিক স্রোত ও পর্যাপ্ত পানির গভীরতা তাদের উজানে চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহীর পদ্মায় পানির গভীরতা ও স্রোত কমে যাওয়ায় ইলিশের আগমনও কমেছে। এর সঙ্গে অপরিকল্পিত ড্রেজিং, বালু উত্তোলন, নদীর পরিবেশের পরিবর্তন এবং জাটকা ও মা ইলিশ আহরণের মতো বিষয়ও ইলিশের উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে বলে মৎস্য সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি করা ওই গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, পদ্মার স্বাভাবিক খরস্রোতা ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনা না গেলে শুধু ইলিশ নয়, দেশীয় অনেক মাছের অস্তিত্বও হুমকিতে পড়বে। ১৯৮৪ সালের তুলনায় শুকনো মৌসুমে পদ্মার আয়তন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে পানির গভীরতা ও প্রবাহ কমার কথাও গবেষণায় বলা হয়েছে।
রাজশাহীর পাঠানপাড়া এলাকার বাসিন্দা প্রবীন মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় পদ্মায় প্রচুর ইলিশ হতো। সেই ইলিশ গেলো কই। আমরায় তো দেখেছি ইলিশ পচার গন্ধে থাকতে না পেরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় জেলো মাটি খুড়ে ইলিশ চাপা দিয়ে রাখতেন। ইলিশের সুটকিও হতো।
রাজশাহীর নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘একসময় পদ্মায় ইলিশের পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত, আজ সেই পদ্মাতেই ইলিশের দেখা পাওয়াই যেন সৌভাগ্যের বিষয়। নদীর পানিপ্রবাহ, নাব্যতা ও প্রজনন পরিবেশ ফিরিয়ে আনা গেলে রাজশাহীর পদ্মায় ইলিশের পুরনো ঐতিহ্য কতটা ফিরবে-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এর জন্য ফারাক্কা বাঁধই অন্যতম দায়ী। পদ্মার উজানে ফারাকা বাধ দেওয়ার পর থেকেই রাজশাহীর নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ কমতে শুরু করে। এখন তো ইলিশ যেন সোনার হরিণ হয়ে গেছে।’









