জাতীয়

যেসব কারণে পরাজিত ১৫ হেভিওয়েট প্রার্থী

নিউজ ডেস্ক৯ জানুয়ারি ২০২৪১০ মিনিট পড়া

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৫ জন হেভিওয়েট প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই শোচনীয়ভাবে হেরেছেন। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তাদের পরাজয়ের কারণ নিয়ে চলছে আলোচনা। তাদের পরাজয়ের পেছনে জনবিচ্ছিন্নতা, দলীয় অন্তর্কোন্দল, তরুণদের ভোট টানতে না পারা, জোটের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ না করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা, দুর্নীতির অভিযোগ, অহংকার, দলীয় ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন না করাসহ বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে স্থানীয় সূত্র থেকে।

রাজশাহী: রাজশাহী-২ (সদর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশার কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও ১৪ দলের জোটপ্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশা। প্রায় ২৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন এমপি বাদশা। এ আসনে টানা তিনবারের এমপি ফজলে হোসেন বাদশা।

স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভাষ্য- জনবিচ্ছিন্নতা, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈরিতা, নিজ দলের নেতাকর্মীর সংকট, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এবং তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার মতো দলীয় এজেন্ডা না থাকায় ডুবছেন তিনি। এমনকি, নিজের কেন্দ্রেও ফেল করেছেন ফজলে হোসেন বাদশা।

রাজশাহী-২ আসনটি সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখানে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। কিন্তু ২০০৮ সাল থেকে ১৪ দলীয় জোটের কোটায় ফজলে হোসেন বাদশা নৌকার প্রতীকে নির্বাচন করে আসছিলেন। নিজ দলের কোনো ভোটব্যাংক না থাকার পরও শুধু জোটের শরিক দলের বড় নেতা হওয়ার কারণে এবারও চতুর্থবারের মতো নৌকা পেয়েছিলেন বাদশা। এতে চরম নাখোশ ছিলেন স্থানীয় মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

ফলে দলটির নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুর রহমান বাদশাকে জেতাতে মরিয়া ছিলেন। এমপি থাকাকালে নির্বাচনী এলাকায় নামে-বেনামে অসংখ্য ভুয়া প্রকল্প তৈরি করে সরকারি টাকা লোপাটের অভিযোগ ছিল ফজলে হোসেন বাদশার বিরুদ্ধে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বাদশা আওয়ামী লীগের ভোটের মুখাপেক্ষী হয়েও এই দলের নেতাকর্মীদের কোনো কাজে আসেননি তিনি। অন্যদিকে, ওয়ার্কার্স পার্টির যুব ও ছাত্রসংগঠনগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়। এ ছাড়া বার্ধক্যজনিতসহ নানা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতেন না। এসব কারণে পরাজিত হন ফজলে হোসেন বাদশা।

মাদারীপুর: জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকায় মাদারীপুর-৩ আসনে নৌকার প্রার্থী আব্দুস সোবাহান মিয়া ওরফে গোলাপের পরাজয়ের মূল কারণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। তারই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বতন্ত্র (ঈগল) নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান সংরক্ষিত আসনের এমপি অধ্যাপিকা মোসা. তাহমিনা বেগম।

কালকিনির সাধারণ মানুষের অভিযোগ, অহংকার, স্বেচ্ছাচারিতা ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা এবং দলে বিভাজন তৈরির কারণেই গোলাপকে হারতে হয়েছে। এমনকি ভোটের আগে কালকিনিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নির্বাচনী জনসভায় নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়ায় ফুরফুরা মেজাজে দাম্ভিকতা নিয়ে কালকিনি-ডাসার উপজেলা চষে বেরিয়েছেন। সাধারণ মানুষ তা ভালোভাবে নেয়নি বলে মনে করেন অনেকে।

গাজীপুর: গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডাকসুর সাবেক ভিপি আখতারউজ্জামানের কাছে প্রায় পনেরো হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী। তার এ হেরে যাওয়ার পেছনে নানা কারণের কথা বলছে এলাকার লোকজন। বিশেষ করে রাজনীতিতে আত্মীয়স্বজনের প্রাধান্য দেওয়া, দলীয় ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করা, নিজস্ব কর্মী বাহিনী তৈরি, দলীয় সংগঠনে নিজস্ব লোকদের পদায়ন, এপিএস দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং দলীয় বিভাজন তার পরাজয়ের জন্য দায়ী বলে মনে করেন তারা। এর বিপরীতে আখতারউজ্জামান দুই মেয়াদে ছিলেন গাজীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, এ সময় তিনি এলাকার উন্নয়ন নিয়ে সরব ছিলেন।

কুষ্টিয়া:কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে ২৩ হাজার ৩৪৫ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু। ইনুর পরাজয়ের বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী কামারুল আরেফিন বলেন, হাসানুল হক ইনু নৌকা প্রতীক নিয়ে দুবার এমপি হয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেননি। তার নির্দেশে হামলা-মামলার শিকার হয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী। তার আমলে এ আসনে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নও হয়নি। অন্যদিকে, কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসীন বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী কামারুল আরেফিনের ক্যাডার বাহিনী অধিকাংশ কেন্দ্র দখল করে নেয়।

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি: গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে ২৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন বর্তমান এমপি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী আনন্দ গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ নাহিদ নিগারের (সাগর) কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন তিনি। স্থানীয়রা মনে করেন, এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর বিগত ৫ বছরে শামীম পাটোয়ারী কোনো প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করেননি। হয়নি কোনো দৃশ্যমান উন্নয়নও। জনগণের সঙ্গে ছিল না তার নিবিড় যোগসূত্র। গ্রাম-গ্রামান্তরে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন যেন ডুমুরের ফুল। তিনি এ আসনের এমপি হলেও এলাকায় তার অবস্থান খুব একটা ছিল না। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদেরও তিনি ঠিকভাবে মূল্যায়ন না করায় সাংগঠনিকভাবে উপজেলায় জাপা দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের খুব একটা সমর্থন পাননি তিনি এবং শুরুর দিকে সে চেষ্টাও করেননি।

পিরোজপুর: পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) একক আসনে ৪ বারের সংসদ সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী (ঈগল) ডা. রুস্তুম আলী ফরাজীকে ১৫ হাজার ৫০০ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী (কলার ছড়ি) মো. শামীম শাহনেওয়াজ। এ আসনে জাপার মাশরেকুল আলম রবির সমর্থনে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা আশরাফুর রহমানের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। সংগত কারণে নৌকার মনোনয়ন হারিয়ে আশরাফুর ও তার দলীয় সমর্থকরা আশরাফুর রহমানের আপন বড় ভাই স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীমের পক্ষ নেন। এতে ভোটের হিসাব সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা আশরাফুর রহমানের এলাকায় রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। এছাড়া রুস্তুম আলী ফরাজী জাতীয় পার্টির কর্মকাণ্ডে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তিনি জাতীয় পার্টি রওশনপন্থী হওয়ায় মনোনয়ন পাননি।

কুমিল্লা: স্বজনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবেই কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসন থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান এমপি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন পরাজিত হয়েছেন। জানা গেছে, নির্বাচনের তিন-চারদিন আগে রহস্যজনক কারণে তিনি মাঠ অনেকটা ছেড়ে দেন। অনেকের ধারণা, তার কাছের কিছু লোক অভিমান করে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। গতকাল মুরাদনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল খায়েরসহ উপজেলার বেশ কিছু রাজনীতিবিদ ও দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন নিয়মমাফিক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও এলাকায় আশানুরূপ সময় দিতেন না বলে জানা গেছে।

নেত্রকোনা: নেত্রকোনা-৩ আসনের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, নির্বাচনী এলাকার জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইফতিকার উদ্দিন বিজয়ী হয়েছেন। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অসীম কুমার উকিল পরাজিত হয়েছেন। জানা গেছে, অসিম কুমার উকিল দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও ত্যাগী নির্যাতিত নেতাকর্মীদের দূরে সরিয়ে রাখতেন। গুটিকয়েক নেতাকর্মী নিয়ে চলাফেরা করতেন। এ ছাড়া বিগত ইউপি নির্বাচনে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে সুযোগসন্ধানীদের নমিনেশনে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পিরোজপুর: ৩৮ বছর একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছিলেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। টানা সাতবারের এমপি তিনি। সারাদেশে সাংগঠনিক ভিত্তি না থাকলেও পিরোজপুরের ৭টি উপজেলায় জেপির রয়েছে শক্ত অবস্থান। তবে নির্বাচনে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ে নিজের শিষ্য মহিউদ্দিন মহারাজের কাছে হেরে গেছেন তিনি।

জানা গেছে, মঞ্জু নৌকা প্রতীক পেলেও তার সঙ্গে ছিল না স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী। এমনকি তার নিজ দল জেপিরও বড় একটি অংশ জেপি থেকে পদত্যাগ করে মহারাজের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। এ ছাড়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে উপজেলা ও ইউনিয়নগুলোতে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করায় তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের কাছে আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

হবিগঞ্জ: হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট- মাধবপুর) আসনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে সাতটি কারণে তিনি হেরেছেন। সেগুলো হচ্ছে, ১. দলীয় নেতাকর্মীদের নির্বাচনী প্রচারে আন্তরিকতার অভাব, কোথাও প্রকাশ্য বিরোধিতা এবং চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আকবর হোসেন শারীরিক অসুস্থতা দেখিয়ে প্রচার থেকে দূরে থাকা, ২. এলাকার উন্নয়ন না করা, ৩. বিগত ইউপি, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা না রাখা, ৪. দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশকে অবমূল্যায়ন করা, ৫. ব্যক্তিগত সহকারী মোছাব্বির হোসেন বিলালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছারিতার অভিযোগে মানুষের ক্ষোভ, ৬. সাধারণ মানুষ থেকে দূরে থাকা, ৭. প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার সুমনের চা বাগানে তৎপরতা এবং চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকা, ৮. তরুণ প্রজন্মের কাছে সুমনের ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং ৯. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরামহীন ও কৌশলী প্রচার।

মানিকগঞ্জ: মানিকগঞ্জ-২ (সিংগাইর-হরিরামপুরের একাংশ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান জাহিদ আহম্মেদের কাছে পরাজিত হয়েছেন একবার সংরক্ষিত ও দুবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রার্থী কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম। জানা গেছে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দলে পারিবারিকীকরণ, দলের অন্তর্কোন্দল, পদ্মার চরের বালুমহালের ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্ব, বক্তব্যে আলেম-উলামাদের ক্ষেপিয়ে তোলা ও দলের মধ্যে একক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় তিনি পরাজিত হয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মহিউদ্দিনসহ জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মীই মমতাজের পক্ষে কাজ করেননি।

সাভার: ঢাকা-১৯ আসনে হাইভোল্টেজ প্রার্থী হিসেবে দলের দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান। এ আসনে ৮৩ হাজার ৭৫০ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদ। তার প্রাপ্ত ভোট ৮০ হাজার ৫৮২। আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. এনাম পেয়েছেন ৬০ হাজার ভোট। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, হঠাৎ করে সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদ মাঠে ফিরে এসে আবেগী বক্তব্য দেওয়া, নির্বাচনী প্রচারে আওয়ামী লীগের পদধারী বেশ কিছু নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পাশ থেকে যাওয়ার কারণে প্রধানত ডা. এনামুর পরাজিত হয়েছেন।

রংপুর: রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনে পরাজিত হয়েছেন হেভিওয়েট প্রার্থী জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কৃত সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান সংসদ সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী মসিউর রহমান রাঙ্গা। মূলত সংসদ সদস্য হয়েও এলাকার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না করা, বহিরাগত এমপি হওয়া এবং জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার হওয়াই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জন্য। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান বাবলুর কাছে ৪৯ হাজার ৫৯৫ ভোটে পরাজিত হন তিনি। এ ছাড়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়াও তার পরাজয়ের আরেকটি কারণ। বিপরীতে ‘স্থানীয় এমপি চাই’ স্লোগান স্বতন্ত্র প্রার্থী আসাদুজ্জামান বাবলুর পক্ষে যায়। গঙ্গাচড়ার মর্ণেয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন ও গজঘন্টা এলাকার মমিন উদ্দিনসহ অনেকেই রাঙ্গার পরাজয়ের এ সব কারণ তুলে ধরেন।

যশোর: যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএম ইয়াকুব আলীর কাছে হেরেছেন প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য এমপি। ৫ হাজার ১৩৬ ভোটে পরাজিত হন তিনি। তার পরাজয়ের বিষয়টি এলাকার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের আলোচনা থেকে তার পরাজয়ের পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এগুলো হচ্ছে- এক সময় তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত থাকলেও সাম্প্রতি বছরগুলোতে নানাবিধ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে সুবিধাবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। ‘যশোরের দুঃখ’ ভবদহের সমস্যা সমাধানে তিনবার তিন প্রকল্পের বরাদ্দের মোটা অংকের টাকার সিংহভাগ গায়েব করা হয়। অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার ছেলে সুপ্রিয় ভট্টাচার্য্যকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

সখীপুর (টাঙ্গাইল) : সাধারণ ভোটার ও একাধিক কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের পরাজয়ের মূল কারণ নতুন ভোটারদের টানতে না পারা এবং আওয়ামী লীগের তরুণ প্রার্থী অনুপম শাহজাহান জয় ও তার মরহুম বাবা শওকত মোমেন শাহজাহানের জনপ্রিয়তা। বিপরীতে কাদের সিদ্দিকী এই এলাকায় বহিরাগত হওয়ায় ভোটে প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতাকর্মীদের পরামর্শ গ্রহণ না করাও বঙ্গবীরের পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় সরকারি মুজিব কলেজের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন সিকদার বলেন, বঙ্গবীর একজন হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তি। তবে তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা সম্ভবত ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা কম। এ কারণে তরুণেরা তার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়নি।

 

 

ট্যাগ: