জাতীয়

ভোটের হিসাব শেষ হলেও কাটেনি রেশ

নিউজ ডেস্ক১৮ জানুয়ারি ২০২৪৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ৭ জানুয়ারি। সেই হিসাবে পেরিয়ে গেছে ১০ দিনেরও বেশি সময়। ইতোমধ্যে এমপিদের শপথগ্রহণ এবং মন্ত্রিসভা গঠনের পর নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রাও শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু নির্বাচন ইস্যুতে তৃণমূলে হিংসা-বিদ্বেষের যে বীজ বোপিত হয়েছিল, তা এখনো ডালপালা ছড়াচ্ছে। প্রতিদিনই নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে হামলা পাল্টাহামলা, সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এমনকি গোলাগুলির মতো অনভিপ্রেত কাণ্ডও ঘটছে।

এসব কাণ্ড হচ্ছে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের। অথচ এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতা। কোথাও কোথাও দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব দিন দিন চরমে উঠছে। ঘটছে হতাহতের ঘটনা। কেউ প্রতিপক্ষের হামলার শঙ্কায় প্রাণভয়ে, কেউবা গ্রেপ্তার এড়াতে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে তৈরি হওয়া এ সংকট আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা ও রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষকরা।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা জোরদার করেছিল। পরে সেই জোরদার অবস্থা কমে গেছে। নির্বাচনের সময় দ্বন্দ্বের জেরে সমর্থক ও অনুসারীদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা বাড়ছে।

তিনি আরও জানান, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য আওয়ামী লীগ নৌকার বাইরেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনুমোদন দিয়েছিল। ফলে তৃণমূলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এই বিভক্তির ফল এই সংঘাত। সংঘাত বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও রাজনীতির দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ দুই পক্ষই সরকারের হওয়ায় তারা অ্যাকশনে যেতে ভয় পাচ্ছে। এখন সংঘাত বন্ধ করতে হলে আওয়ামী লীগকে দলীয়ভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য বলছে, নির্বাচনের পর গত সোমবার পর্যন্ত অন্তত ১৮টি জেলায় সংঘাত-সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষ-সংঘাতে অন্তত ৬ জন নিহত ও ৪০০ জন আহত হয়েছেন। ৬০ জনের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ সময় ২০০টির বেশি ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

গত ৮ জানুয়ারি মাদারীপুর-৩ আসনে (কালকিনি-ডাসার-সদরের একাংশ) ঈগল প্রতীকের প্রার্থীর বিজয় মিছিলে বোমা হামলায় এমারত সর্দার (৪৫) নামের এক চা দোকানি নিহত হন। ১২ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের বের কালোয়া গ্রামে নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের গুলিতে নৌকার সমর্থক জিয়ার হোসেন (৪৫) আহত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার তার মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সাতজন আহত হয়েছে। ইউপি কার্যালয় ভাঙচুর ও প্রাইভেট কারসহ চারটি গাড়ি পোড়ানো হয়। নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক স্বতন্ত্র প্রার্থী সম্পাদক শাহজাহান ভূঁইয়া ও আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজীর সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষ ঘটে। একই দিন বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য পংকজ নাথ ও নাগরিকত্ব জটিলতায় প্রার্থিতা হারানো আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, নির্বাচনের পর সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহ, মাদারীপুরের কালকিনি ও কাউয়াকুড়ি, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, রাজশাহী ও নারায়ণগঞ্জে। এ ছাড়া পিরোজপুর, নেত্রকোনা, সাতক্ষীরা, গাজীপুর, গাইবান্ধা, খুলনা, নাটোর, কুষ্টিয়া, মুন্সীগঞ্জ ও পটুয়াখালীতেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব এলাকায় প্রতিপক্ষের দোকান, বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন্স) আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে কিছু জায়গায় সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। প্রতি ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আমরা অ্যাকশনে যাচ্ছি। মামলা হচ্ছে, আসামিও গ্রেপ্তার হচ্ছে। এ ব্যাপারে হার্ডলাইনে থাকার জন্য পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, ভোটে জয়-পরাজয়ের হেতু ধরে সংঘাত-সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলে সংঘাত এড়াতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাতে হতাহতের পর প্রতিপক্ষসহ যুবকরা গ্রেপ্তার ও হয়রানি এড়াতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভোটের সময় সহিংসতায় মামলার আসামিরা অনেকেই এলাকায় আর ফেরেননি। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বে নৌকার সমর্থক জিয়ার হোসেন (৪৫) নিহতের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। কালোয়া গ্রামের হাটবাজার ও রাস্তাঘাটে মানুষের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। হামলার আশঙ্কায় বাড়ি ছেড়েছেন প্রতিপক্ষের লোকজন। এলাকায় সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজশাহী, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলায় অনেক মানুষ মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

ফরিদপুর-৩ আসনে নির্বাচনের সময় সংঘাতে জড়ানোর ঘটনায় এক মামলার আসামি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্বাচনের দুদিন আগে এলাকায় নৌকা ও ঈগলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সেই মামলা তিনিও আসামি হয়ে যান। এরপর ভোট না দিয়েই তিনি এলাকা থেকে পালিয়ে যান। পুলিশ ও প্রতিপক্ষের ভয়ে এখনো এলাকায় ফিরতে পারেননি।

 

ট্যাগ: