সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করতে চায় ভারত। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সম্প্রতি আফ্রিকার তিন দেশ ঘানা, কোত দিভোয়ার ও ইথিওপিয়া সফর করেছেন।
এই সফরের লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য বাড়ানো, উন্নয়ন সহযোগিতা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একসঙ্গে কাজ করা। পাঁচ দিনের এই সফরে দুই পক্ষের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ৬ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই সফরে জয়শঙ্কর তিন দেশের সঙ্গে ভারতের সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাণিজ্য, উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো ছিল সফরের প্রধান লক্ষ্য।
সফরের শেষ পর্যায়ে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কর্মরত ভারতের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের এক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জয়শঙ্কর। আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শক্তিশালী করার উপায় নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়।
আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘানা সফর করেন।
ওই সফরে দুই দেশের সম্পর্ককে বিস্তৃত অংশীদারি উন্নীত করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মোদি ইথিওপিয়া সফর করেন। সে সময় দুই দেশ কৌশলগত অংশীদারি প্রতিষ্ঠা করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ভারত সফর করেন।
এসব সফর ও আলোচনার মধ্য দিয়ে আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
বাণিজ্য ও উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চায় নয়াদিল্লি।
৯ অক্টোবর ইথিওপিয়ার আদওয়া বিজয় স্মৃতি জাদুঘরে দেওয়া এক ভাষণে জয়শঙ্কর বলেন, আফ্রিকার চতুর্থ বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ভারত। দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার।
ঘানার সঙ্গে বাণিজ্য ও কৃষি সহযোগিতা বাড়াতে চায় ভারত
বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে ঘানার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় ভারত। সম্প্রতি দেশটি সফরে গিয়ে এসব বিষয়ে আলোচনা করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। একই সঙ্গে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে এ বিষয়ে ভারতের সমর্থন চেয়েছে ঘানা।
৬ ও ৭ অক্টোবর ঘানা সফরে দেশটির প্রেসিডেন্ট জন ড্রামানি মাহামা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যামুয়েল ওকুডজেটো আবলাকওয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন জয়শঙ্কর। বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি ওষুধশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা, রেলপথ, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃষি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর একটি কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা বিষয়ে, অন্যটি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহযোগিতা নিয়ে। ঘানা নিজ দেশে ওষুধ উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী। অন্যদিকে ভারতের ওষুধ কম্পানিগুলোর সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ উৎপাদনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ ছাড়া কৃষি ও রেলপথ উন্নয়নেও দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আবেদন করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে ঘানার মন্ত্রিসভা। এ বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে দেশটি। জয়শঙ্কর ঘানার আগ্রহকে সমর্থন জানালেও ব্রিকসের সব সদস্যের সম্মতি ছাড়া নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়।
দুই দেশের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করা।
কোত দিভোয়ারের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে চায় ভারত
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ কোত দিভোয়ারের সঙ্গেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে চায় ভারত। এ লক্ষ্যে কৃষি, ওষুধশিল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন দুই দেশের কর্মকর্তারা।
৭ ও ৮ অক্টোবর কোত দিভোয়ার সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর দেশটির প্রেসিডেন্ট আলাসান ওয়াত্তারা, উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী তেনে বিরাহিমা ওয়াত্তারা এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নিয়ালে কাবার সঙ্গে বৈঠক করেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫০ কোটি ডলারের বেশি। কোত দিভোয়ার থেকে ভারত কাজুবাদাম, প্রাকৃতিক রাবার, তুলা ও সেগুন কাঠ আমদানি করে। সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়।
কৃষি, ওষুধশিল্প ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বাড়লে কোত দিভোয়ারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। দুই দেশ সামরিক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করে। তবে সফরে নতুন কোনো বড় প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সফরকালে জয়শঙ্কর ভারতের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচি (আইটিইসি)-এর আওতায় প্রশিক্ষণ নেওয়া কোত দিভোয়ারের সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
তিনি জানান, গত ১২ বছরে দেশটি এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৮০০টি প্রশিক্ষণের সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। জয়শঙ্কর বলেন, ‘এগুলোই প্রকৃতপক্ষে একটি সম্পর্কের মূলধন।’ আইটিইসি কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা ভারতে প্রশাসন, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ পান। এই উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে দক্ষতা বিনিময় ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকা রাখছে।
বাণিজ্য ও নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়িয়ে কোত দিভোয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায় ভারত।
ইথিওপিয়ায় ভারতীয় বিনিয়োগে ৭৫ হাজার কর্মসংস্থান
আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় গত দুই দশকে ৬০০টিরও বেশি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে ৭৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশিক্ষণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আদওয়া বিজয় স্মৃতি জাদুঘরে দেওয়া এক ভাষণে জয়শঙ্কর বলেন, ইথিওপিয়ায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন, বস্ত্র, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করছে।
প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার অংশ হিসেবে ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া দেশটিতে আরেকটি ‘জয়পুর কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন শিবির’ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। ২০২৪ সালে ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চলে এমন একটি শিবিরে প্রায় ৪৫০ জনকে কৃত্রিম অঙ্গ দেওয়া হয়েছিল।
ভারত ইথিওপিয়ার কর্মকর্তাদের জন্য ফরেনসিক বিজ্ঞান, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণের প্রস্তাবও দিয়েছে। সফরকালে জয়শঙ্কর ১৮৯৬ সালে আদওয়ার যুদ্ধে ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ইথিওপিয়ার বিজয়ের কথা তুলে ধরেন। এই বিজয় দেশটির স্বাধীনতা রক্ষার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে পরিচিত।
তিনি ইথিওপিয়ার এই বিজয়ের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলের ইতিহাসের মিল তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান।
জয়শঙ্কর ভারতের ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ পরিকল্পনার সঙ্গে আফ্রিকার ‘এজেন্ডা ২০৬৩’-এর লক্ষ্যগুলোর মিল তুলে ধরেন। তিনি শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে দুই পক্ষের সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, অংশীদারির মাধ্যমে দেশগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো উচিত, নির্ভরশীলতা নয়। তার মতে, যৌথ উদ্যোগ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারত ও ইথিওপিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হতে পারে।









