তথ্যপ্রযুক্তি

বাংলাদেশ যেন আন্তর্দেশীয় অপরাধচক্রের নিরাপদ আশ্রয় না হয়

নিউজ ডেস্ক৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬৯ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে স্ক্যাম সেন্টার খুলে আন্তর্দেশীয় চক্রের প্রতারণা চালানোর খবর বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এসেছে। এবার বাংলাদেশেও সীমান্ত জেলা কক্সবাজারে এমন একটি সন্দেহভাজন চক্র ধরা পড়েছে।

এই চক্রের সদস্যরা চীনের নাগরিক।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই চীনের সম্পৃক্ততা দিন দিন বাড়ছে। একটি সম্পর্ককে শুধু ভয় বা সন্দেহের চোখে দেখা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি পর্যাপ্ত সাবধানতা অবলম্বন বা সতর্কতা ছাড়া এই সম্পর্ককে এগিয়েও নেওয়া যায় না।

বাংলাদেশে চীনা নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উপস্থিতি বাড়ার পাশাপাশি মানবপাচার, সাইবার প্রতারণা ও সংঘবদ্ধ অপরাধের কিছু ঘটনায় চীনা নাগরিকদের নাম এসেছে। তবে বিষয়টি কোনোভাবেই চীন রাষ্ট্র বা চীনা নাগরিকত্ব নিয়ে নয়। এটি চীনের বিনিয়োগের বিরোধিতার প্রশ্নও নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে যাতে আন্তর্দেশীয় অপরাধচক্র বাংলাদেশে জায়গা করে নিতে না পারে, তা ঠেকানোর মতো সক্ষমতা আমাদের আছে কি না।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরো জোরালো করেছে।
কক্সবাজারে কিভাবে গড়ে উঠল এমন নেটওয়ার্ক?
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণার একটি কথিত চক্রের তদন্তে ছয়জন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৩০টি বহনযোগ্য কম্পিউটারসহ বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। পরে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ঘটনার আরো উদ্বেগজনক দিক হল, তদন্তকারীরা এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরো বড় একটি নেটওয়ার্কের যোগ থাকার কথা বলছেন।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা নাগরিক এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁদের অনেকে ছড়িয়ে পড়েছেন বলেও জানা গেছে। অবশ্য এ সংখ্যা নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ৩০০ জন প্রমাণিত অপরাধীকে শনাক্ত করেছে। তাঁরা সন্দেহভাজন ব্যক্তি, অথবা তদন্তে যাঁদের এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে।
তার পরও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—এত বড় একটি নেটওয়ার্ক কক্সবাজারে কিভাবে নিজেদের জায়গা করে নিল? এটাই মূল নিরাপত্তার প্রশ্ন। কক্সবাজার শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়। একদিকে মিয়ানমার সীমান্ত, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর। কাছেই রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির। তার ওপর মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে গোটা এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থাও জটিল।

এমন একটি কৌশলগত এলাকায় কোনো বড় বিদেশি অপরাধচক্র হোটেল বা ভাড়া করা স্থাপনা ব্যবহার করে কার্যক্রম চালালে সেটি শুধু পুলিশের বিষয় হওয়ার কথা নয়। সেখানে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, সাইবার অপরাধ দমনকারী সংস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থারও নজর থাকা প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামেও উদ্বেগের কারণ
এ গল্পের আরেকটি দিক আরো মানবিক, আবার আরো বেদনাদায়ক—মানবপাচার ও বিয়ে। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, চীনা নাগরিকদের সঙ্গে আন্তদেশীয় বিয়ের ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা কিছু বাংলাদেশি নারীকে পাচারের লক্ষ্য বানানো হচ্ছে।

একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে ১৯ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি নারী অভিযোগ করেছেন, তাঁকে প্রতারণার মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা হয়, ওষুধ খাইয়ে অচেতন করা হয়, পরে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে চীনে পাচার করা হয়। এ ঘটনায় বিয়ের মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকার বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে।

আরো উদ্বেগের বিষয়, এ ধরনের অভিযোগ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকেও এসেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাংলাদেশি নারীদের, বিশেষ করে পাহাড়ি নারীদের লক্ষ্য করে পাচারকারীরা তৎপর থাকতে পারে। রাঙামাটির এক চাকমা নারী তাঁর ২১ বছর বয়সী বোনকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগে মামলা করেছেন। আবার খাগড়াছড়ির ২১ বছর বয়সী এক মারমা নারী অভিযোগ করেছেন, পাচারকারীরা তাঁকে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়েতে বাধ্য করেছিল। পরে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।

এসবই অভিযোগ ও ব্যক্তিবিশেষের ঘটনা। তাই এখান থেকে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই যে চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বাংলাদেশি নারীদের সব বিয়ে প্রতারণামূলক। তবে আরেকটি পরিসংখ্যান অবশ্যই নজরে রাখা দরকার। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিবারভিত্তিক বা কিউ-১ ভিসায় অন্তত ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারী চীনে গেছেন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৭৮ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৭২১ জনে।
এ সংখ্যা মানবপাচারের প্রমাণ নয়। কিন্তু এটি দ্রুত বাড়তে থাকা একটি অভিবাসনপথের ইঙ্গিত দেয়। আর এমন একটি পথে নজরদারি ও যাচাই-বাছাই বাড়ানো স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজন।

চীনের দূতাবাসও বিষয়টির ঝুঁকি স্বীকার করেছে। ঢাকায় চীনা নাগরিকদের অবৈধভাবে বিয়ের মধ্যস্থতা এবং বিদেশি নারী ‘কেনাবেচা’-সংশ্লিষ্ট প্রতারণার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। অবৈধ আন্তর্দেশীয় বিয়ে মানবপাচারের মতো অপরাধে ফৌজদারি মামলার কারণ হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশ ও চীনের উচিত বিষয়টিকে শুধু বিব্রতকর কোনো দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে না দেখে যৌথ আইন প্রয়োগের বিষয় হিসেবে দেখা।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো রয়েছে প্রতিবেশী অঞ্চলে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীনা অপরাধচক্র-সংশ্লিষ্ট প্রতারণাকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে বড় ও জটিল অপরাধব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে সেখানে যুক্ত হয়েছে অর্থপাচার, মানবপাচার এবং জোরপূর্বক শ্রম।

মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন প্রতারণাকেন্দ্রের বিস্তার নিয়ে রয়টার্স বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছে। তাদের এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওসের বিভিন্ন প্রতারণাকেন্দ্রে প্রায় ৩ লাখ মানুষ কাজ করতে পারে। বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশ থেকে মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে সেখানে নেওয়া বা পাচার করা হয়েছে বলেও ধারণা করা হয়।

এটি আর শুধু অনলাইন প্রতারণার সমস্যা নয়। এটি আন্তর্দেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের একটি বড় শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আঞ্চলিক বাস্তবতা রয়েছে। চীনের জনমিতিক ভারসাম্যহীনতা ও অর্থনৈতিক শক্তির কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে বিয়ের মাধ্যমে অভিবাসন বেড়েছে। কিন্তু স্বেচ্ছায় হওয়া অভিবাসন আর জোরপূর্বক মানবপাচারের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, সেই পার্থক্য শনাক্ত করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা।

বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে নিরাপত্তার হিসাবও জরুরি
এখানে ভূরাজনীতির বিষয়টিও সামনে আসে। বাংলাদেশের অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে চীনা কম্পানিগুলোর উপস্থিতি এখন বড় বাস্তবতা। বন্দর, পরিবহনসহ বিভিন্ন কৌশলগত প্রকল্পেও চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বাংলাদেশের অন্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় চীনের প্রভাব আরো বাড়তে পারে বলেও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এটি স্বাভাবিক ভূরাজনীতি। কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার সঙ্গে শুধু বিনিয়োগ আসে না। এর সঙ্গে বাজার, অবকাঠামো, পরিবহনব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও মানুষের চলাচলের সুযোগও যুক্ত হয়। তাই বাংলাদেশের এখন একটি আধুনিক বিদেশি বিনিয়োগ-নিরাপত্তা কাঠামো প্রয়োজন।

চীনের বিনিয়োগকে আলাদাভাবে বিপজ্জনক মনে করার জন্য নয়। বরং যে কোনো বড় বিদেশি অর্থনৈতিক উপস্থিতি, বিশেষ করে কৌশলগত খাতে, নিরাপত্তার দিক থেকে যাচাই হওয়া উচিত বলে। অনেক দেশই তা করে। চীনও করে। নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশকেও তা করতে হবে।

গুপ্তচরবৃত্তির প্রশ্নে প্রয়োজন আরো বেশি সংযম
এ জায়গায় ভাষার ব্যবহারে বিশেষ সতর্ক থাকা জরুরি। বাংলাদেশে কাজ করা চীনা কোম্পানিগুলোকে গোয়েন্দা সংস্থার ‘আবরণ’ বা ‘গোপন সহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো প্রমাণ না থাকলে এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উপেক্ষা করা যায় না।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগের কথা এসেছে—চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান কসকো কিছু জাহাজে গোপন সরঞ্জাম ব্যবহার করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশের উপকূলের কাছে সংকেত-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছে। চীনের দূতাবাস অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্রাউডস্ট্রাইক জানিয়েছে, তাদের আগের বছরের মূল্যায়নে চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি ছিল। এসব তৎপরতার লক্ষ্য ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও তথ্য।

এসব বাংলাদেশের কোনো চীনা নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। বরং এগুলো মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশের মধ্যে আছে, সেটি কতটা জটিল।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিষয়টিকে আরো সংবেদনশীল করে তোলে। চীন ও ভারতের কৌশলগত প্রতিযোগিতার মাঝখানে, বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এবং সংঘাতপূর্ণ মিয়ানমারের পাশে থাকা একটি দেশ সাইবার নিরাপত্তা, বিদেশি বিনিয়োগ, সামুদ্রিক অবকাঠামো ও গোয়েন্দা ঝুঁকিকে আলাদা আলাদা করে দেখার সুযোগ পায় না।

আঞ্চলিক প্রভাবও কম নয়
ঢাকার কূটনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশে চীনা নাগরিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো অপরাধচক্র বড় আকারে ঘাঁটি গেড়ে বসলে প্রতিবেশী ভারত স্বাভাবিকভাবে বিষয়টিতে নজর দেবে। একইভাবে কোনো আঞ্চলিক দেশের নাগরিক বা আর্থিক ব্যবস্থা যদি এসব অপরাধের লক্ষ্যবস্তু হয়, তারাও উদ্বিগ্ন হবে। ঝুঁকিটা শুধু এই নয় যে বাংলাদেশ অনলাইন প্রতারণার ঘাঁটি হয়ে উঠতে পারে।

এর চেয়েও বড় বিপদ হলো—বাংলাদেশের একটি দুর্বল আইন প্রয়োগকারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি তৈরি হতে পারে; যেখানে বিদেশি অপরাধচক্র সহজেই বাড়ি বা হোটেল ভাড়া নিতে পারে, স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী খুঁজে নিতে পারে, অর্থ সরাতে পারে, যোগাযোগের সরঞ্জাম জোগাড় করতে পারে এবং প্রয়োজনের সময় সীমান্ত পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। একবার এমন পরিচিতি তৈরি হলে তা মুছে ফেলা অত্যন্ত কঠিন।

সমাধান আতঙ্কে নয়, দায়িত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনায়
বাংলাদেশের সামনে পথ একটাই—বৈধ অংশীদারত্বকে স্বাগত জানানো, কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় না দেওয়া। বৈধ চীনা বিনিয়োগ ও বৈধ চীনা নাগরিকদের স্বাগত জানাতেই হবে। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংঘবদ্ধ অপরাধ শনাক্ত করতে বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

কোনো বিশ্বাসযোগ্য অপরাধের সূত্র পাওয়া গেলে অভিবাসন-তথ্য, হোটেলে অবস্থানের রেকর্ড, কম্পানির মালিকানা, বাড়ি বা জমি ভাড়া নেওয়ার তথ্য, আর্থিক লেনদেন এবং টেলিযোগাযোগ-সংক্রান্ত তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের মধ্যস্থতা করা ব্যক্তিদের নিবন্ধনের আওতায় এনে নজরদারি বাড়ানো দরকার।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য প্রয়োজন আলাদা মানবপাচারবিরোধী কর্মসূচি, যেখানে স্থানীয় সম্প্রদায়কে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা হবে। কক্সবাজারের মতো কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় বিদেশিদের কর্মকাণ্ডের ওপরও বাড়তি নজর প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কক্সবাজারে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের দেশের বাইরে কোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে—চীন, মিয়ানমার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে—যোগাযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঢাকার সঙ্গে বেইজিংয়ের খোলামেলা আলোচনা ও নিবিড় যোগাযোগ।

চীনের নাগরিকেরা যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়তে পারেন, তেমনি তাঁরা নিজেরাও এসব অপরাধের শিকার হতে পারেন। এই জায়গায় বাংলাদেশ ও চীনের স্বার্থ অনেকটাই অভিন্ন। সেই অভিন্ন স্বার্থ কাজে লাগানো উচিত।

এখনই ব্যবস্থা নেওয়ার সময়
প্রশ্নটা তাই শুধু কক্সবাজারে কতজন বিদেশি গ্রেপ্তার হলেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো—তাঁদের এখানে কে নিয়ে এল? কারা অর্থের জোগান দিল? কারা তাঁদের থাকার জায়গা করে দিল? অর্থ কোথায় গেল? তাঁরা কার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন? স্থানীয় কোনো সহযোগী ছিল কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কক্সবাজারের ঘটনাটি কি বিচ্ছিন্ন একটি অপরাধচক্র, নাকি বড় কোনো আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের অংশ?

একইভাবে, কথিত ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে যে নারীরা পাচারের শিকার হয়েছেন, তাঁদের ঘটনাকে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখলে চলবে না। সম্ভাব্য সংঘবদ্ধ অপরাধ হিসেবে এসব ঘটনার তদন্ত করতে হবে। বাংলাদেশের হাতে এখনো সময় আছে। এসব নেটওয়ার্কের কিছু কার্যক্রম দৃশ্যমান, কিছু চিহ্নও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু অপরাধচক্র একবার বৈধ ব্যবসা, সম্পত্তি, বিয়ে, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আন্তর্দেশীয় অর্থ লেনদেনের সঙ্গে মিশে গেলে তাদের শনাক্ত করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।

সতর্কসংকেত আমাদের সামনে ইতোমধ্যেই আছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে এগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া, নাকি সময় থাকতেই বুঝে নেওয়া যে ছোট ছোট ঘটনা বড় কোনো নিরাপত্তাঝুঁকির পূর্বাভাস হতে পারে—এ সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে।