আন্তর্জাতিক

জান্তা সেনার সঙ্গে পালাচ্ছে সশস্ত্র আরসাও

নিউজ ডেস্ক৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সে দেশের সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সদস্যরাও বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন। মঙ্গলবার সকালে চারটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, আটটি ম্যাগাজিন ও বিপুল পরিমাণ গুলিসহ বাংলাদেশে প্রবেশের সময় স্থানীয় লোকজন ২৪ জন রোহিঙ্গা বিদ্রোহীকে আটক করে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে আরসা বা আল ইয়াকিনের সশস্ত্র সদস্য বলে ছড়িয়ে পড়লেও রাত পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি।

আটক ২৪ রোহিঙ্গা যুবক উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে আছেন। তাদের কাছ থেকে অস্ত্রগুলো বিজিবির হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারের বিভিন্ন প্রদেশে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে এলাকাভিত্তিক কিছু সশস্ত্র গ্রুপ সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বিজিপির পক্ষে হয়ে লড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা সশস্ত্র যুবকরা জান্তা সেনা ও বিজিপির হয়ে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়ছিল। তবে তারা আরসার সদস্য কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, লোকজন অস্ত্রসহ তাদের নিয়ে আসে। তারা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে বিজিবি ও অন্যান্য সংস্থার জিম্মায় আছেন। তিনি বলেন, আটক মিয়ানমারের নাগরিকরা যে আরসা বা আল ইয়াকিনের সদস্য সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। কেউ আমাকে সেটা নিশ্চিত করতে পারেনি। আমিও তাদের সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করিনি।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম হোসেন বলেন, অস্ত্রসহ আটক যুবকদের বিজিবি দেখভাল করছে। তারা রোহিঙ্গা শিবিরে যাওয়ার আগেই লোকজন তাদের ধরে ফেলে। তারা আরসার সদস্য কিনা আমি জানি না। সেটা বিজিবি যাচাই করছে।

আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির পুরনো নাম হারাকাহ আল ইয়াকিন। সৌদি আরবে প্রথম এই আরবি নামে সংগঠনটি ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সংগঠনের প্রধান কমান্ডার আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনিনি। তিনি শুরুতে আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিলে আরসার অনেক সদস্য এ দেশে চলে আসেন। পরবর্তীতে আরসা নেতা আতাউল্লাহ অন্তত ছয়বার বাংলাদেশে এসেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। তিনি বাংলাদেশের একটি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মূলত চিকিৎসা নিতে এবং সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন বাংলাদেশে, কাজ শেষে নিরাপদে মিয়ানমার ফিরে যান।

২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট জাতিগত রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান মিয়ানমার যান। আর সেদিনই রাখাইনে একটি পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলা করে পুলিশকে হত্যা করে আরসা। এই অজুহাতে জান্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর চরম নিপীড়ন শুরু করে। প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। পরবর্তীতে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও আরসা বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। গড়ে তুলে একাধিক কিলিং গ্রুপ।

২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়ার লাম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরে ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ (এআরএসপিএইচ) সংগঠনের কার্যালয়ে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত হন রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ। তিনি ওই সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলেন। আরসার কিলিং মিশনের প্রধান নুর কামালসহ ১২ আরসা সদস্য এ হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ২০২২ সালের ১৩ জুন কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মুহিবুল্লাহ হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এতে বলা হয়, মুহিবুল্লাহ হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিলেন আরসার প্রধান কমান্ডার আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনিসহ ৩৬ জন। কিন্তু ঠিকানা শনাক্ত না হওয়ায় আতাউল্লাহসহ আরসার সাতজন কমান্ডারকে অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণারত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হওয়ার জন্য রোহিঙ্গারা আরসার কার্যক্রমকে দায়ী করে। তারা মনে করে, আরসা একযোগে পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালানোর ফলে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতে জান্তা বাহিনী একটি অজুহাত পেয়ে বসে। তা ছাড়া বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা নিপীড়িত না হলেও ক্যাম্পগুলোতে আরসা বাহিনীর কারণে নিরাপত্তাহীন। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে পুরনো সংগঠকরা মিলে নতুন করে আরাকান সলিডারিটি অরগানাইজেশন (আরএসও) গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। কারণ এর মধ্যে মহিবুল্লাহর এআরএসপিএইচও নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তবে রোহিঙ্গাদের কোনো সংগঠনই মিয়ানমারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি অর্জন করেনি। আরসার মূল লক্ষ্য শক্তি ও অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে উখিয়া ও টেকনাফে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

 

 

ট্যাগ: