নওগাঁ প্রতিনিধি :
নিরবিচ্ছিন্ন ভূমি সেবা নিশ্চিত করতে বুকভরা আশা নিয়ে মাত্র ৭ মাস আগে নতুন অবকাঠামো সমৃদ্ধ নির্মাণ করা চকচকে ভবনে চালু করা হয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস । কিন্তু সেই স্বপ্নের ভূমি অফিস এখন ঘুষের দাবানলে ভূমি মালিকদের স্বপ্ন পুরে অঙ্গার হয়েগেছে। সেবা প্রার্থীরা ক্ষুব্ধ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেও কর্তৃপক্ষের তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে ।
একাধিক অভিযোগ আছে, নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ৩ অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ২ দালালসহ ৫জনের নিকট কয়েক হাজার জমির মালিক জিম্মি ও অসহায় হয়ে পড়েছে। এখানে ঘুষের মন্ত্র ছাড়া কোন কাজ হয়না।

উপ-সহকারী কর্মকর্তা দুরুল হুদা, প্রসেস সার্ভার কুদ্দুস, পিওন সোহাগ ও তাদের নিয়োগ করা ২ দালাল যোগসাজশে ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘুষের হাটবাজার বানিয়েছে । চাহিদা মতো ঘুষ না দিলে যেমন কাজ হয়না তেমনি পদে পদে হয়রানির সীমা থাকেনা।
সংশ্লিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, রাণীনগর উপজেলার কাশিমপুর ও মিরাট ইউনিয়নের ইউনিয়ন যৌথ ভূমি অফিস ছিল কাশিমপুরে। ভূমিসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রত্যন্ত এলাকা মিরাট ইউনিয়নের জন্য প্রায় সাত মাস আগে হামিদপুর বাজারে নতুন ভাবে মিরাট ইউনিয়ন ভূমি অফিস স্থাপন করা হয়। অফিস পরিচালনার জন্য পদায়ন করা হয় উপ-সহকারী কর্মকর্তা দুরুল হুদা,প্রসেস সার্ভার কুদ্দুস ও পিওন সোহাগকে।
কিন্তু শুরু থেকেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে- খাজনার অনুমোদন, খাজনার চেক দিতে, খারিজের( নামজারি ) প্রতিবেদন-প্রস্তাব, হোল্ডিং খোলা ,খতিয়ানের অনুমোদন সহ বিভিন্ন প্রতিবেদন দিতে ২ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার, ২০ হাজার, এমনকি লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করেন দুরুল হুদা চক্র।
সেবাপ্রত্যাশীরা তাদের চাহিদা মতো ঘুষ দিলে কাজ হয়, না দিলে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস। এছাড়া অফিসে দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ । অফিসের স্টাফদের মতো দুইজন দালাল সার্বক্ষণিক অফিসের মধ্যে ঘুরঘুর করে। ২ দালালদের মধ্যস্থতায় সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেন তারা।
জায়গা-জমির খারিজ (নামজারি) করিয়ে দিতে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ৭ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা নেয়া হয় ঘুষ। খারিজের জন্য কেউ ঘুষ দিয়েও ঘুরছে দিনের পর দিন। আবার টাকার বিনিময়ে গোপনে দেয়া হয় প্রস্তাবিত খতিয়ান। খারিজ শেষে কেউ হোল্ডিং খুলতে গেলে বা কেউ খাজনা দিতে গেলে সেবাপ্রত্যাশীদের মাসের পর মাস হয়রানি করে। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কাজ সম্পন্ন করে দেয়।
মিরাট ইউনিয়নের জালালাবাদ গ্রামের রায়হান রাফু জানান, আমাদের একটি জমির খারিজের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ মিসকেস করেছে। এই মিসকেস থেকে কীভাবে উদ্ধার হওয়া যায় সেজন্য মিরাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েবের কাছে যাই। নায়েব দুরুল হুদা ও তার সঙ্গে থাকা একজন দালাল আমাদের জমির সব সম্যসা সমাধান করে দেয়ার জন্য টাকা দাবি করেন। তারা দুইজন মিলে প্রথমে ১৫ হাজার টাকা নেয়। এরপর নায়েব দুরুল হুদা বলে এই সামান্য টাকা দিয়ে কাজ হবে না। পরে এক দালালসহ আমাদের সঙ্গে ৯৭ হাজার টাকা চুক্তি করেন। কয়েক ধাপে নায়েব ও তার দালাল ৯৭ হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওই কাজের কোনো সমাধান হয়নি বা নায়েব আমাদের টাকাও ফেরত দেয়নি।
ধনপাড়া গ্রামের মোছা. মেঘনা নামে ভুক্তভোগী এক নারী জানান, জমি খারিজের পর খাজনা দেয়ার জন্য অনলাইনে আবেদন করেছি। কিন্তু অফিসের নায়েব অনুমোদন দেননি। আবার আবেদন করেছি। প্রায় ৬ মাস ধরে অফিসে ঘুরছি। অফিসের পিওন সোহাগের কাছেও ঘুরেছি। এখনও অনুমোদন মেলেনি, খাজনাও দিতে পারিনি।
পার্শ্ববর্তী নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার তুরুকবাড়িয়া গ্রামের আব্দুল লতিফ জানান, জমির খাজনা দিতে মিরাট ভূমি অফিসে নায়েবের কাছে গেলে তার একজন দালাল আমার কাছ থেকে জমির কাগজপত্র নেয়।
পরে কী-জানি এন্টি করতে হবে এজন্য ২ হাজার টাকা দিতে হবে বলে জানায়। আমি তাদের চাহিদামতো টাকা দিইনি বলে খাজনা দেয়া হয়নি। এছাড়া চলতি বছরে আমার কয়েক দাগে জমির খারিজ করে নিয়েছি।
সেই খাজিরের ৪৬ শতাংশ জমির খাজনা দিতে অফিসে গেলে নায়েব দুরুল হুদা আমার কাছে ৩১ হাজার ৮১৮ টাকা দাবি করেন। সেই টাকা তাকে না দেয়ায় খাজনা দিতে পারিনি। পরে নায়েবের কাছে আবার গেলে তিনি আমার জমির হোল্ডিং বের করে জমির নানা সমস্যা তুলে ধরেন। এরপর টাকা না পেয়ে হোল্ডিংয়ে লাল কালির চিহ্ন দিয়ে দেয়।
হরিশপুর গ্রামের সোলাইমান জানান, আমার ৪৫ শতাংশ জমির খাজনা দেয়ার জন্য পিওন সোহাগ খাজনার চেক করে দিবে বলে ১৩ হাজার টাকা দাবি করেন। সেইদিন চাহিদামতো টাকা দিইনি বলে খাজনা করে দেননি।
মিরাট উত্তরপাড়া গ্রামের ফাহাদ জানান, জমির খাজনা দিতে মিরাট ভূমি অফিসে গেলে অফিসের কুদ্দুস ও সোহাগ ১০ হাজার টাকা চায়। এরপর তারা আমাকে বেশ কয়েকদিন ঘুরিয়ে ১০ হাজার টাকা নিয়ে মাত্র ৭৭২ টাকার খাজনার চেক করে দিয়েছে। একই এলাকার ফজলু সরদার ও মজনু সরদার দুই ভাই।
তারা কয়েক মাস আগে পৃথক দলিলে ৬ শতাংশ জমির খারিজের জন্য সোহাগের হাতে ঘুষ দিয়েছিলেন ৫ হাজার টাকা। কাজ হওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী আরও ৭ হাজার টাকা দেয়ার কথা আছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ঘুরেও কোনো সমাধান পাচ্ছি না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মিরাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা দুরুল হুদা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। আর প্রসেস সার্ভার কুদ্দুস ও পিওন সোহাগ ফোন রিসিভ না করাই বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
রাণীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ নওশাদ হাসান বলেন, বিষয়গুলো জানা নেই। তবে অভিযোগের প্রমাণ সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।









