রাজশাহী

অর্ধশত বছরেও বরাদ্দ হয়নি রাজশাহীর উপশহরের ২৩ প্লট, শত কোটি টাকার সম্পদ বেদখলে

নিউজ ডেস্ক১১ আগস্ট ২০২৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী নগরীর অভিযাত উপশহর এলাকার ২ নম্বর সেক্টরে রাজশাহী গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন চারটি আবাসিক প্লট প্রায় অর্ধশত বছর ধরে ফাঁকা পড়ে আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত এসব প্লট বরাদ্দ না হওয়ায় এখন সেগুলো পড়ে আছে। আর সেই সুযোগ স্থানীয় একটি চক্র প্লটগুলো বরাদ্দ করে বস্তি গড়ে তুলেছে। আবার রাজনৈতিক কার্যালয়ও গড়ে তোলা হয়েছে। এভাবে নগরীর অভিযাত এই এলাকায় এখনো ফাঁকা পড়ে আছে মোট ২৩টি প্লট।

গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন রাজশাহী হাউজিং অ্যাস্টেট গড়ে উঠে। ১৯৮০ সালে উপশহর আবাসিক এলাকার প্লট বরাদ্দ শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে প্রায় দেড় হাজার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও এতো বছর পরে এখনো পড়ে আছে ২৩টি। যার আনুমানিক বেসরকারি মূল্য অন্তত একশ ২৫ কোটি টাকা। সরকার এখন এই প্লটগুলো বরাদ্দ দিলেও কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারবে। কিন্তু নানা অসঙ্গতির কারণে প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। সেই সুযোগে স্থানীয়রা যে যার মতো করে প্লটগুলো দখল করে রেখেছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক কার্যালয়ও গড়ে তুলেছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপশহর ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা কোটার আওতায় চারটি প্লট সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল। তবে পর্যাপ্ত আবেদন না পাওয়ায় প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ২৪০/১, ২৪০/২, ২৪০/৩ ও ২৪০/৪ নম্বর প্লটগুলো ফাঁকা পড়েও নাই এখন। বছরের পর বছর ধরে এসব প্লট খালি পড়ে থাকলেও সেগুলো নতুন করে বরাদ্দের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় গত প্রায় ১০ বছর ধরে সেগুলো দখল হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর আল মামুন সরকার একসময় দখলে রেখেছিলেন প্লটগুলো। সেখানে আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্ড কার্যালয়ও গড়ে উঠেছিল। এর পর সরকার পরিবর্তন হলে স্থানীয় ১৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য সচিব জুয়েল রানার নেতৃত্বে সেখানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভেঙে যুবদলের কার্যালয় গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি ৫-৬টি আধা-পাকা বাড়িও নির্মাণ করে বস্তি গড়ে তোলা হয়।

নগরীর এক নম্বর সেক্টরের কয়েকটি প্লট দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, ক্লাবঘর থেকে শুরু করে নানা প্রতিষ্ঠান। তিন নম্বর সেক্টরে কয়েকটি দোকানপাট গড়ে উঠেছে। তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা হলো দুই নম্বর সেক্টর এবং এক নম্বর সেক্টরের। ২৩টি প্লটের মধ্যে এই দুই সেক্টরেই অন্তত ২০টি প্লট এখনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এক নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘এই অভিযাত এলাকায় এখনো অনেকগুলো প্লট ফাঁকা পড়ে থাকায় সেগুলোর অধিকাংশ দখল হয়ে গেছে। আবার এখনো অনেকগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। ফলে এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। অনেক স্থানে মাদকসেবীরা আড্ডাস্থল গড়ে তুলেছে। আবার অনেক স্থানে বস্তি গড়ে তোলায় এলাকার পরিবেশও বিনষ্ট হচ্ছে।’

তিন নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আলী আকবর বলেন, ‘যতগুলো প্লট এখনো ফাঁকা পড়ে আছে, সেগুলো সরকার বরাদ্দ দিলে এখন অন্তত ৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারবে। কিন্তু কেন এসব প্লট দীর্ঘ দিনেও বরাদ্দ হচ্ছে না-তা সেটি বিষ্ময়কর। এর ফলে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি এলাকার পরিবেশও খারাপ হচ্ছে দিনের পর দিন।’
আরেক বাসিন্দা মাজদার হোসেন বলেন, ‘অনেক প্লট দখল করে ক্লাব গড়ে তোলা হয়েছে। এসব ক্লাবে মূলত জুয়ার আসর বসে রাতের বেলায়। কোনো স্থানে হয় মাদকের কারবার। এগুলো বরাদ্দ দিয়ে অভিযাত উপশহর এলাকার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা উচিত।’

রাজশাহী হাউজিং এ্যাস্টেটের একটি সূত্র জানায়, ‘আশির দশকে একটি জরীপ হয়েছিল। সেই জরীপে তখন ২৬টি প্লট ফাঁকা ছিল। পরবর্তিতে তিনটি প্লট মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বাকিগুলো আর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে।’

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘এই এলাকার এক কাঠা জমির মূল্য এখন অন্তত ৮০ লাখ টাকা। সেই হিসেব ধরে ২৩টি প্লটের বেসরকারি মূল্য দাঁড়াবে অন্তত ১২৫ কোটি টাকা। একেকটি প্লট পৌনে দুই কাঠা থেকে শুরু করে সাড়ে সাত কাঠা পর্যন্ত আছে।

রাজশাহী গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী সোহেল সরকার জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত চারটি প্লটের বিপরীতে কোনো আবেদন না আসায় সেগুলো বরাদ্দ দেওয়া যায়নি। পরে ২০২৪ সালে কোটাব্যবস্থায় পরিবর্তন এলেও এ বিষয়ে নতুন কোনো সরকারি সার্কুলার বা নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমানে প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আবার নতুন করে অন্য প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়ারও কোনো সার্কুলার না থাকায় আমরা সেগুলোও বরাদ্দ দিতে পারছি না। ফলে অনেক প্লট এরই মধ্যে দখলও হয়ে গেছে। তবে বরাদ্দ দিলে সেগুলো উদ্ধার সম্ভব।’