নাবিক থেকে ক্রিকেট তারকা ফকর

June 18, 2017 at 8:39 pm

সিল্কসিটিনিউজ ক্রীড়া ডেস্ক:

অসীম সমুদ্রের বুকে রোমাঞ্চকর এক জীবনে মনের মধ্যে একটু একটু করে বুনেছিলেন স্বপ্নটা। সাগরের গর্জনে কান পাতলে শুনতে পেতেন ভরা গ্যালারিতে সমর্থকদের উল্লাস-চিৎকারের শব্দ।

উত্তেজনার সাগরে ডুব মারতেন তিনি প্রতিদিনই। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে হয়তো আগামীর সম্ভাবনা খুঁজতেন রাতের আকাশের তারার মাঝে। স্বপ্ন মানুষকে কতদূরই না নিয়ে যেতে পারে। শৈশবে ব্যাট হাতে খেলতে খেলতে কখন যে ক্রিকেটকে জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন ফখর জামান খুব বুঝতে পারছিলেন নৌবাহিনীতে সাগরের বুকে ভাসতে থাকা ‘একাকী’ জীবনে। ভালোবাসার টানে ফিরে এলেন ২২ গজে। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখাটা হয়ে গেল তার ‘এলেন, খেললেন, জয় করলেন’–এর মতো!

যতটা সহজে বলা হয়ে গেল, ফখর জামানের ক্রিকেটের জীবনের চাকা কিন্তু অত সহজে ঘোরেনি। কঠিন পরীক্ষা দিয়েই পাকিস্তানের ক্রিকেট আকাশে জ্বলে ওঠেছেন উজ্জ্বল তারা হয়ে। ক্রিকেট বিশ্বও হয়তো খুঁজে পেয়েছে আগামীর তারকাকে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালের পর অন্তত এমনটা বলাই যাই। একে শিরোপা নির্ধারণের মঞ্চ, তার ওপর আবার প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। দুটো একসঙ্গে হওয়াতেই সম্ভবত নিজের সেরাটা দেখিয়ে দিলেন পাকিস্তানি এই ওপেনার। ফাইনাল মঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করে তুলে নিলেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিও।

অভিষেক হয়েছে কিন্তু তার ইংল্যান্ডের এই টুর্নামেন্ট দিয়েই। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দিয়ে শুরু করা এই মিশনে টানা দুই ম্যাচে হাফসেঞ্চুরির দেখা পেয়েছিলেন শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ভারতের বিপক্ষে নিজের সেই অর্জনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন আরও দূরে। দুর্দান্ত সব শটে খেলে যান ১১৪ রানের ঝলমলে ইনিংস।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে থাকলেও একাদশে সুযোগ পাবেন কিনা, সেই সংশয় ফখরের মনের মধ্যে থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের উদ্বোধনী ম্যাচে সুযোগ হয়ওনি। তবে ওপেনার আহমেদ শেহজাদ খারাপ করায় সুযোগ পেয়ে যান দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পরের ম্যাচে। আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। খেলা দেখে একবারও মনে হয়নি এটাই তার প্রথম ম্যাচ। কাগিসো রাবাদা-মরনে মরকেলদের বোলিংয়ে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে বুঝিয়েছেন দীর্ঘ সময় রাজত্ব করতেই এসেছেন তিনি ২২ গজে।

সত্যিই ফখরের রাজত্ব মারদানের ছোট্ট শহর কাটলাং থেকে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পাকিস্তানে। তার বাবা তাই বলতে পারলেন, “একটা সময় ফখর ছিল শুধু কাটলাংয়ের গৌরব, এখন সে ‘পাকিস্তানের ফখর’।’ কথাগুলো বলার সময় মুখে ঔজ্জ্বলতা ছড়ানো এই ফকির গুলই একটা সময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ক্রিকেট আর ফখরের মাঝে। ছেলে ক্রিকেট খেলুক, সেটা মোটেও পছন্দ ছিল না তার। স্কুল থেকে প্রায়ই অভিযোগ আসতো, ফখরের পড়াশোনায় কোনও মনোযোগ নেই, সারাক্ষণ থাকেন তিনি ক্রিকেট মাঠে।

অথচ এসএসসি পাশের পরই বদলে যায় ফখরের জীবন। ক্রিকেট দুনিয়া ছেড়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে নাম লেখান পাকিস্তান নৌবাহিনীতে। ২০০৭ সালে নাবিক হলেও ক্রিকেট থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হননি তিনি। মাঝেমধ্যেই খেলতেন নৌবাহিনীর আন্তঃবিভাগীয় টুর্নামেন্ট। সেখানেই তিনি নজরে পড়ে যায় নৌবাহিনীর ক্রিকেট একাডেমির কোচ আজম খানের। তার পরামর্শে নৌবাহিনীর শারীরিক প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি পরে।

ব্যস তাতেই শুরু ফখরের দ্বিতীয় ‘যুদ্ধ’। ক্রিকেটকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়াতেই ২০১৩ সালে ছেড়ে দেন নৌবাহিনীর চাকরি। ভাগ্যও তার সহায় ছিল, সান্নিধ্য পেয়ে যায় পাকিস্তানের গ্রেট ইউনিস খানের। একই এলাকার ছেলে বলে ফখরকে ঘরোয়া ক্রিকেটে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন কিছুদিন আগেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া ইউনিস। তার কথা মতো নেমে পড়েন ২২ গজের লড়াইয়ে। ঘরোয়া ক্রিকেটের পর পাকিস্তান সুপার লিগের (আইএসএল) দ্বিতীয় আসরেও আলো ছড়ান তিনি ব্যাট হাতে। সবশেষ আসরেও সচল রাখেন রানের চাকা।

যে চাকা ঘুরিয়েই চলেছেন ফখর জামান। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মতো বড় মঞ্চে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে প্রমাণ করে গেলেন ‘বড় রেসের ঘোড়া’ হয়েই এসেছেন তিনি ক্রিকেট দুনিয়ায়। সাগরের বুকে ভাসতে থাকা জাহাজের নাবিক থেকে আজ তিনি ক্রিকেট আকাশের তারা। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

Print