সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা : আনআম, আয়াত : ২২-২৪

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ یَوۡمَ نَحۡشُرُهُمۡ جَمِیۡعًا ثُمَّ نَقُوۡلُ لِلَّذِیۡنَ اَشۡرَكُوۡۤا اَیۡنَ شُرَكَآؤُكُمُ الَّذِیۡنَ كُنۡتُمۡ تَزۡعُمُوۡنَ ﴿۲۲﴾
ثُمَّ لَمۡ تَكُنۡ فِتۡنَتُهُمۡ اِلَّاۤ اَنۡ قَالُوۡا وَ اللّٰهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشۡرِكِیۡنَ ﴿۲۳﴾
اُنۡظُرۡ كَیۡفَ كَذَبُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ وَ ضَلَّ عَنۡهُمۡ مَّا كَانُوۡا یَفۡتَرُوۡنَ ﴿۲۴﴾
সরল অনুবাদ
(২২) আর স্মরণ করুন, যেদিন আমরা তাদের সবাইকে একত্র করব, তারপর যারা শিরক করেছে তাদেরকে বলব, তোমরা যাদেরকে আমার শরীক মনে করতে, তারা কোথায়?
(২৩) তারপর তাদের এ ছাড়া বলার অন্য কোনো অজুহাত থাকবে না, আমাদের রব আল্লাহর শপথ! আমরা তো মুশরিকই ছিলাম না।
(২৪) দেখুন, তারা নিজেদের প্রতি কিরূপ মিথ্যাচার করে এবং যে মিথ্যা তারা রটনা করত তা কিভাবে তাদের থেকে উধাও হয়ে গেল।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা আনআমের এই ২২ নং আয়াতে একটি সর্ববৃহৎ পরীক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে যা হাশরের ময়দানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-এর সামনে অনুষ্ঠিত হবে। বলা হচ্ছে যে, হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের সঙ্গে তাদের বানানো উপাস্যদেরও একত্র করবেন।
তখন তাদের জিজ্ঞেস করা হবে— যাদেরকে তোমরা অভাব পূরণকারী ও বিপদ মোচনকারী মনে করতে, আজ তারা কোথায়? কেন সাহায্য করছে না? তখন উপাস্যরা তাদের থেকে সম্পর্ক অস্বীকার করবে। যার ফলে মুশিরিকরা মুশরিকরা সম্মুখিন হবে চরম বিপদের। (তাফসিরে তাবারী, তাফসিরে কুরতুবী)
২৩ নং আয়াতে মুশরিকদের উত্তরকে فِتْنَةُ শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। এ শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়।
পরীক্ষার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তখন আয়াতের অর্থ হবে, তাদের পরীক্ষায় তারা উপরোক্ত উত্তর দিবে। তাছাড়া ফিতনা শব্দটি কারো প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এ অর্থের উদ্দেশ্য এই যে, এরা পৃথিবীতে এসব মূর্তি ও স্বহস্ত নির্মিত উপাস্যদের প্রতি আসক্ত ছিল, স্বীয় অর্থ-সম্পদ এদের জন্যই উৎসর্গ করত।
কিন্তু আজ সব ভালবাসা ও আসক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে এবং এ ছাড়া তাদের মুখে কোনো উত্তর যোগাচ্ছে না। কাজেই তারা কমস করে এ দাবীই করে বসলো যে, তারা কখনো শিরকই করতো না। । (তাফসিরে বাগভী)
কেয়ামতের সেই ভয়াবহ দৃশ্য কল্পনা করলে বিস্মিত হতে হয়— আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহাশক্তি ও ভয়ঙ্কর ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করার পরও কীভাবে তারা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে নির্জলা মিথ্যা বলবে! আশ্চর্যজনকভাবে তারা এমন বলিষ্ঠ ভঙ্গিতেই বলবে, এমনকি আল্লাহর মহাসত্তার কসম খেয়ে দাবী করবে যে, তারা নাকি মুশরিক ছিল না। অধিকাংশ মুফাসসির ব্যাখ্যা করেছেন, এ বক্তব্য তাদের কোনো যুক্তি বা পরিণামদর্শিতার উপর ভিত্তি করে নয়; বরং আতঙ্ক আর হতবুদ্ধিতার চাপে তাদের মুখে যা এসেছে তাই বলবে।
তবে আরও গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, আল্লাহ্ তাআলাই তাদেরকে এমন সুযোগ দেবেন যাতে তারা হাশরের ময়দানে পৃথিবীর মতো স্বাধীনভাবে কথা বলে। কেননা, এর মাধ্যমেই তাদের কুফর ও শির্কের পাশাপাশি এক নতুন অপরাধ সবার সামনে উন্মোচিত হবে— তারা চরম ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও মিথ্যা বলতে পিছপা হয় না। কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “তারা আল্লাহর সামনে শপথ করে মিথ্যা বলবে, যেমন তারা আজ দুনিয়ায় মুমিনদের সামনে মিথ্যা শপথ করে।” (সুরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ১৮)
অতএব, পরিষ্কার হলো যে, তারা আল্লাহর সামনেও মিথ্যা কসম করতে দ্বিধা করবে না। কিন্তু তখন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাদের মুখে মোহর এঁটে দেবেন। আর নির্দেশ দেবেন তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে— হাত-পা, চোখ-কান— যেন তারা সাক্ষ্য দেয়। তখন ধরা পড়বে যে, এ অঙ্গগুলোই ছিল আল্লাহর নিযুক্ত প্রহরী, যারা সব সময় তাদের কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করে রেখেছে। এ সম্পর্কেই কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে: “আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা সাক্ষ্য দেবে তাদের কৃতকর্মের।” (সুরা ইয়াসীন: ৬৫)
২৪ নং আয়াতে বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ্ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)–কে বলেছেন, দেখুন হাশরের দিন এরা নিজেরাই নিজের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলছে। যাদেরকে তারা আল্লাহর শরীক বানিয়েছিল, আজ তারা নেই। দুনিয়ায় যেসব মূর্তি ও উপাস্যকে আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী ভাবত, আজ সবই প্রমাণিত হলো মনগড়া ও ভিত্তিহীন। তাদের মিথ্যা কসম ও ভ্রান্ত ব্যাখ্যা হাত-পা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাক্ষ্যে প্রকাশ পাবে।
কিছু মুফাসসির বলেছেন, “মিথ্যা রটন “ বলতে বোঝানো হয়েছে তাদের সেই কথা— তারা বলতো (مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ) অর্থাৎ আমরা উপাস্য মনে করে মূর্তির উপাসনা করি না, বরং উপাসনা করার কারণ এই যে, তারা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে আমাদেরকে তার নিকটবর্তী করে দেবে। হাশরে তাদের এ মনগড়া ব্যাখ্যা এমনভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হবে যে, তাদের মহাবিপদের সময় কেউ তাদের সুপারিশ করবে না।
এখানে ইঙ্গিত আছে— দুনিয়ায় যারা মিথ্যা কসমের অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিল, তারা হাশরের ভয়াবহ ময়দানেও মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে পারবে না। ফলে সৃষ্টিজগতের সামনে তারা অপমানিত হবে। তাই কোরআন ও হাদিসে মিথ্যার নিন্দা প্রবলভাবে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-বলেন: “মিথ্যা থেকে বাঁচো; কারণ মিথ্যা পাপাচারের সহচর, আর মিথ্যা ও পাপাচার উভয়ই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।” (ইবনে হিব্বান: ৫৭৩৪)









