সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
প্রায় দেড় যুগ আগে নাটোরের এক বৃক্ষপ্রেমীর বাগানে এই গাছ প্রথম দেখি। গাছের গায়ে নামফলকে লেখা ছিল জামান ফল। তাৎক্ষণিকভাবে মনে করার চেষ্টা করি, আমাদের দেশে এই নামে কোনো ফল আছে কি না। মনে পড়ে না।
তবে মনে করা হয়, জামান নামক এক ব্যক্তি প্রথম এই ফলটি চাষ করেন বলেই এমন নামকরণ।
পরে অবশ্য সেই জামান সাহেবের সঙ্গেও আলাপ হয়। তিনি কিভাবে বিদেশ থেকে চারা সংগ্রহ করেছিলেন, কিভাবে কিছু চারা তৈরি করা হয়েছিল—এসব কথা জানা হয়। সে সময় ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে গিয়েছিলাম হেমন্তের ফলগুলো দেখতে।

আমরা যখন বাগানে হেঁটে হেঁটে জলপাই, আমলকী, সফেদা দেখছি তখন সতীর্থদের একজনের অনুসন্ধানী চোখ গাছতলা থেকে খুঁজে বের করল আধখাওয়া একটি ফল। দেখে বললাম, হয়তো কোনো বারোমাসি জাতের আম। আজকাল উন্নত কৃষি প্রযুক্তির কল্যাণে প্রায় সারা বছরই আম হতে দেখা যায়। কিন্তু ভুল ভাঙল ওপরের দিকে তাকিয়ে।
এ তো আম নয়, একেবারে অচেনা একটি ফল। কয়েকটি থোকায় ঝুলে আছে গাছে। বাগানের একজন ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা জানালেন, এটি সেই জামান ফল, যা আমি আগে দেখেছিলাম। পোশাকি নাম এগফ্রুট। ইংরেজি নাম Canistel. তবে বৈশিষ্ট্যগত কারণে সারা পৃথিবীতে এদের অনেক নাম—হলুদ সফেদা, মধু সফেদা ইত্যাদি।
হলুদ সফেদা বা ডিমফলএই বাগানে ছোট-বড় মিলিয়ে চার-পাঁচটি গাছ পাওয়া গেল। জার্মপ্লাজম সেন্টারের স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক এম এ রহিম ১৯৯৯ সালের দিকে প্রথমে থাইল্যান্ড থেকে এই গাছের কয়েকটি বীজ নিয়ে আসেন। তারপর ২০০১ সালে নিয়ে আসেন কয়েকটি কলম। অনেক বছর ধরেই নিয়মিত ফল ধরছে গাছগুলোতে। তবে তুলনামূলকভাবে চারার গাছ থেকে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
এগফ্রুট দক্ষিণ আমেরিকার চিরসবুজ গাছ। আদি আবাস মেক্সিকো। বর্তমানে ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, তাইওয়ানসহ দক্ষিণ এশিয়ার উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। গাছ ২০ থেকে ৩০ মিটারের মতো উঁচু হতে পারে। পাতা দেখতে অনেকটা আমপাতার মতোই। ফুল সবুজাভ সাদা। ফল নানান গড়নের হলেও ডিম্বাকার ও আগা সুচালো ফলই সহজলভ্য। পরিপক্ব রং মলিন বা সোনালি হলুদ। ভেতরের শাঁসও কমলা হলুদ রঙের। স্বাদ অনেকটা সফেদার মতোই নরম, সুগন্ধি, খেতে কখনো মণ্ডের মতো, আবার কখনো সিদ্ধ ডিমের কুসুমের মতো। শরবত করে লেবু মিশিয়েও খাওয়া যায়। ভেতরে চকোলেট রঙের একটি আঁটি থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে রয়েছে ক্যালরি, প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেড ও ক্যালসিয়ামসহ আরো অনেক খাদ্যগুণ।
এই গাছ বহুবর্ষজীবী। পাকা ফল আপনাআপনিই গাছতলায় ঝরে পড়ে। বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বছরে কয়েকবার ফল হয়। বেলে মাটিতে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে এবং ফলন ভালো হয়। ফিলিপিন্সে এই ফলের নাম ছেসা, শ্রীলঙ্কায় লাউলু বা লাভুলু, থাইল্যান্ডে লামুট বা খামুন নামে পরিচিত। স্পেনিশদের আমলে ফিলিপিন্সে এই গাছ ছড়িয়ে পড়ে। শুধু খাবার উপযোগিতা ছাড়া ছায়াবৃক্ষ হিসেবেও এই গাছ আদৃত।









