চাঁপাইনবাবগঞ্জ

সান্তাহার-রহনপুর রেলপথ প্রকল্প শত বছর ধরে ফাইলবন্দি

নিউজ ডেস্ক৯ মে ২০২৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রেলপথ যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেশের উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এ দুই জেলার মানুষের স্বপ্ন শত বছর ধরে যেন ফাইলবন্দি হয়ে আছে। শত বছর পেরিয়ে গেলেও বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার জংশন থেকে নওগাঁ জেলার মধ্যে দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর পর্যন্ত ৬৬ কিলোমিটার রেলপথ প্রকল্পটি ঝুলে আছে শত বছর ধরে।

এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে অনগ্রসর এই জনপদে সারা বছর যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি উৎপাদিত কৃষিপণ্য ধান, আম, পাট, আখ, গম, ভুট্ট, ড্রাগন, পেয়ারা ইত্যাদি পরিবহনে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারবে। আমের মৌসুমে নওগাঁর সাপাহার, পোরশা উপজেলায় এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার উৎপাদিত আম পরিবহনেও বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে এই রেলপথটি। সেই সাথে পরিবহনে অনগ্রসর বরেন্দ্র এলাকায় বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হবে। এখন শুধুই সড়ক পথই ভরসা নওগাঁর মানুষদের কাছে।

অপরদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী খুব সহজেই রংপুর বিভাগের ৮ জেলার সাথে রেলপথে যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

রেলওয়ে সূত্র মতে, সান্তাহার জংশন থেকে নওগাঁ জেলার উপর দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুর ষ্টেশন পর্যন্ত রেল লাইন স্থাপনের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১০ সালের দিকে তৎকালিন ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে একটি জরিপ পরচালনা করে।

জরিপ দলের নেতা ডেলগ্রীন তার রিপোর্টে অবিলম্বে এ রেলপথ নির্মানের জন্য জোর সুপারিশ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর থেকে উত্তরাঞ্চলের জনগনের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালিন পাকিস্তান সরকারের রেলওয়ে বোর্ড ১৯৬৩ সালে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষে পুনরায় কাজ শুরু করে।

গঠিত জরিপ দলের তৎকালীন প্রধান আশরাফ আলী ডেলগ্রীনের রিপোর্টের পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন। আশরাফ আলী তার অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ১৯৪ পৃষ্টার লিখিত রিপোর্টে প্রকল্পের একটি ব্লু প্রিন্ট ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের গর্ভনরের নিকট হস্তান্তর করেন।

কিন্তু যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও রেলওয়ে বোর্ড রহস্যজনকভাবে হঠাৎ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
৬৬ মাইল দীর্ঘ বগুড়ার সান্তাহর-চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলওয়ে প্রকল্পটি ব্রড ও মিটার গেজ দু’ধরনের লাইন স্থাপনের কথা ছিল।

এই রেলপথে ১১টি ষ্টেশন রাখার কথাও ছিল। ষ্টেশনগুলো হলো সান্তাহার জংশন থেকে নওগাঁ শহর, হাঁপানিয়া হাট, হযরতপুর, জাহাঙ্গীরাবাদ, মহিষবাথান, নজিপুর, মধইল, সাপাহার, পোরশা উপজেলার সারাইগাছী বাজার, বেজোড়া, দাদপুর হয়ে রহনপুর ষ্টেশন। এছাড়া ট্রেন চলাচলের জন্য দুটি সেতু নির্মানের প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার কথাও ছিল। সেতু দুটি নওগাঁ শহরের ডিগ্রি কলেজের উত্তর ধারে ছোট যমুনা নদীর উপর একটি এবং অপরটি পতœীতলা উপজেলার নজিপুের আত্রাই নদীর উপর একটি।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংসদে সে সময়ের আবুল কালাম আজাদ ও মোজাফ্ফর রহমান চৌধুরী এই প্রকল্পটির কথা সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায় সান্তাহার- রহনপুর রেলপথ প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনাও হয়েছিল।

রেলওয়ে কতৃপক্ষ উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অবহেলিত জনপদ তথা বরেন্দ্র ভূমির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করেননি। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে অনগ্রসর এ জনপদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ধান, আম, পাট, আখ, গম ইত্যাদি পরিবহনে মূখ্য ভূমিকা রাখতে পারবে এবং সেই সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি ঘটবে বলে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাবাসী মনে করছেন।

নওগাঁর ইতিহাস গবেষক ও কবি অধ্যাপক (অবঃ) আতাউল হক সিদ্দিকী কালের কন্ঠকে বলেন, এই রেল যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটি প্রয়োজন ছিল এবং এখনো আছে। এই দীর্ঘ সময়ে জনগনের দাবী থাকলেও শুধু নেতৃত্বের অভাবে এবং তাঁদের দূর্বলতার কারনে নওগাঁ জেলার মধ্যেদিয়ে সান্তাহার থেকে চাঁপইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপন হয়নি।

এই দুই জেলায় ধান ,আমসহ উৎপাদিত কৃষিপণ্য স্বপ্লমূল্যে এবং দ্রুত পরিবহন অনেক সহজতর হয়ে যেতো।
অধ্যক্ষ (অবঃ) প্রফেসর শরিফুল ইসলাম খান বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এই রেল লাইন স্থাপনের একটি বড় অন্তরায়। এছাড়াও এই এলাকায় যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁরা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি বলে আমি মনে করি।

এখনো এর গরুত্ব অপরিসীম।
নওগাঁ জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আবু বক্কর সিদ্দিক নান্নু কালের কন্ঠকে বলেন, এই জেলায় বরেন্দ্র এলাকা গুলোয় সড়ক যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা নাই। এখানে নদীপথে যোগাযোগের কোন সুযোগ নাই।

শুধু সড়ক যোগাযোগই একমাত্র অবলম্বন। এখানে রেল যোগাযোগ স্থাপন হলে এলাকার সাধারন মানুষের অনেক সুযোগ সৃষ্টি হতো। বিশেষ করে এই জেলার বরেন্দ্র এলাকায় ব্যাপক ধান উৎপাদন হয়।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে আম, পেয়ারা, মাল্টা, ড্রাগন, বড়ইসহ অন্যান্য কৃষি পণ্য। সম্প্রতি ব্যাপক ভাবে মাল্টা চাষ শুরু হয়েছে অচিরেই এর উৎপাদন শুরু হবে। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদিত এইসব কৃষিপণ্য শুধু সড়ক পথের উপর নিভর্রশীল না হয়ে বিকল্প পথ হিসাবে রেলপথ স্থাপন করা এই অঞ্চলের মানুষ পরিবহনের বিকল্প সুবিধা পাবে।

এই বিষয়ে কথা বলার জন্য রাজশাহীস্থ পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরদি আহমেদ বলেন, ‘এই ধরনের প্রকল্পের বিষয়টি আমার জানা নাই। নতুন করে এই প্রকল্প নিয়ে কোনো কার্যক্রমও শুরু হয়নি।