সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
তুলশীমালা চালের পর এবার ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে শেরপুরের ছানার পায়েস। বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) শেরপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) তরফদার মাহমুদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর ফলে শেরপুরের ছানার পায়েস এখন দেশের ৪৪তম জিআই পণ্য।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর শেরপুরের ছানার পায়েসের জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত দেশের ৪৪তম জিআই পণ্য হিসেবে শেরপুরের ছানার পায়েসের নিবন্ধন সনদ জেলা প্রশাসকের হাতে পৌঁছেছে।
ছানার পায়েসের জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে শেরপুর জেলা শহরে আনন্দ-উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। অনলাইন ব্র্যান্ডিং গ্রুপ ‘আওয়ার শেরপুর’-এর পক্ষ থেকে শহরবাসীকে ছানার পায়েস খাইয়ে আনন্দ উদযাপন করা হয়।
আওয়ার শেরপুরের প্রতিষ্ঠাতা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ছানার পায়েস শেরপুরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ।
জিআই পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আমরা আনন্দিত। এটি শেরপুরে জেলার ব্র্যান্ডিং ও ঐতিহ্য আরো বহুদূর নিয়ে যাবে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে শেরপুরের জনপ্রিয় মিষ্টান্নের জায়গা দখল করে আছে ‘ছানার পায়েস’। শেরপুরের তৎকালীন ‘নয়ানী’, ‘আড়াইআনি’ ও ‘পৌনে তিনানি’ জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় দিন দিন ছানার পায়েস জনপ্রিয়তা লাভ করে।
শেরপুরের লোকজনের অতিথি আপ্যায়নে, কাউকে খুশি করতে কিংবা কোথাও বেড়াতে গেলে উপহার হিসেবে এখনো এই ছানার পায়েসের জুড়ি মেলা ভার।
প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, ইউরোপ-আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য সব স্থানেই শেরপুরের ছানার পায়েস নিজ গুণে সবাইকে মুগ্ধ করেছে। রসনাবিলাসী না হোন, কিন্তু শেরপুরে এসে কেউ ছানার পায়েসের স্বাদ না নিয়ে ফিরে গেলে সেটা তার জন্য এক অতৃপ্তিই বটে।
শেরপুর শহরের রঘুনাথ বাজারের নিউ মার্কেট মোড়ের ‘অনুরাধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ ছানার পায়েস তৈরির ক্ষেত্রে এক অনন্য নাম। ৫ পুরুষ ধরে তারা ছানার পায়েস তৈরি করে আসছেন।
অনুরাধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের বর্তমান কর্ণধার সুব্রত দে বাপ্পী জানান, তার পূর্বপুরুষরা আড়াইআনি জমিদারদের পারিবারিক মিষ্টি সরবরাহ করতেন। জমিদারদের আগ্রহে তার ঠাকুর দাদার দাদা চন্দ্র কিশোর দে ছানার পায়েস নামে নতুন এই মিষ্টি বানানো শুরু করেন। সেই থেকে তারা পারিবারিকভাবে এই ছানার পায়েস তৈরি ও বিক্রি করে আসছেন। অবশ্য একই সময়ে অন্য জমিদারদের মধ্যে এই ছানার পায়েস নিয়ে কৌতূহল শুরু হয়, এটি পরে বাণিজ্যিক রূপ লাভ করে। বর্তমানে প্রতি কেজি ছানার পায়েস বিক্রি হয় ৪০০ টাকায়।
তিনি জানান, ছানার পায়েসের মূল বিষয় হলো দুধের ক্ষির ও ছানার গুটি। এতে ক্ষির থাকে বেশি, আর ছানার গুটি থাকে কম। শেরপুর অঞ্চলে আগে ক্ষিরের মিষ্টান্ন প্রচলিত ছিল। একসময় ছানার গুটি ঘি দিয়ে ভাজা হতো, কিন্তু ঘিয়ের দাম বৃদ্ধি এবং বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যের কারণে ছানার গুটি ঘি দিয়ে না ভেজে চিনির শিরায় ডুবিয়ে প্রস্তুত করা হয়। তবে কেউ বিশেষ অর্ডার করলে এখনো ঘি দিয়ে গুটি ভেজে ছানার পায়েস তৈরি করা হয়। তবে এজন্য দ্বিগুণ দাম গুনতে হবে।
তিনি জানান, বংশপরম্পরায় বাবা সুবীর চন্দ্র দে ঠাকুরদা সুরেশ চন্দ্র দের কাছ থেকে এবং তিনি তার বাবা গিরিশ চন্দ্র দের কাছ থেকে ছানার পায়েস তৈরি করা শিখেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে ছানার পায়েস তৈরির জন্য তিনজন কারিগর রয়েছেন। তাদের মধ্যে ছামেদুল ইসলাম ও কালিপদ ঘোষ সবচেয়ে ভালো বানায়।’
সুব্রত দে বাপ্পী জানান, প্রতিদিন তার দোকানে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কেজি করে ছানার পায়েস বিক্রি হয়। এ ছাড়া বর্তমানে শহরের বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজমা উদ্দিন সড়কের ঘোষপট্টি (গোয়ালপট্টি) এবং নয়ানি-কালিরবাজার এলাকায় ‘প্রেমানন্দ গ্রান্ড সন্স’, ‘নন্দগোপাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’, ‘দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’, ‘মা ভবতারা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’, ‘চারু সুইটস’ ছানার পায়েস তৈরি ও বিক্রি করে থাকে। শহরের আরো বেশ কিছু দোকান রয়েছে। বিভিন্ন উপজেলা এবং বাজারগুলোর মিষ্টির দোকানেও এখন ছানার পায়েস পাওয়া যায়।’
ছানার পায়েসের জিআই পণ্যের স্বীকৃতির জন্য ২০২৩ সালের ২৪ আগস্ট জেলা প্রশাসনের জেলা ব্র্যান্ডিং বাস্তবায়ন কমিটির সভায় প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন হিসেবে শেরপুরের ছানার পায়েসের জিআই পণ্যের স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়।
সে সময় জিআই পণ্যের স্বীকৃতির প্রস্তাবনায় বলা হয়, ছানার পায়েস জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলে এর পরিচিতি ও প্রসার ঘটবে, বাড়বে ব্র্যান্ডিং এবং বাণিজ্যিক মূল্যমান। এর আগে শেরপুর জেলার আরেক কৃষিপণ্য ‘তুলশিমালা ধান’ জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
শেরপুরের ছানার পায়েস জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় আনন্দিত স্থানীয় মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরা। শহরের নিউমার্কেট অনুরাধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্ত্বাধিকারী সুব্রত দে বাপ্পী বলেন, ‘আমরা আনন্দিত, খুশি। এটা আমাদের জন্য গৌরবের। এতে স্থানীয় অর্থনৈতিক খাত চাঙা হওয়ার পাশাপাশি দেশ ও দেশের বাইরে শেরপুরের সুনামও ছড়িয়ে পড়বে বলে আমি মনে করি। তবে এখন আমাদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল। ছানার পায়েসের মান এবং গুণ ধরে রাখতে হবে। এ বিষয়ে আমাদেরকে আরো সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।’
জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘দেশের ৪৪তম জিআই পণ্যের মর্যাদা অর্জন করেছে শেরপুরের ছানার পায়েস। আমরা আজকেই সনদের কপি হাতে পেয়েছি। আগে যারা জেলা প্রশাসনে ছিলেন তারা আবেদন করায় শেরপুরের ছানার পায়েস জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। এটা আনন্দের।’
তিনি বলেন, ‘এই স্বীকৃতির ফলে জিআই পণ্য হওয়ার কারণে শেরপুরের ছানার পায়েসের সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে যাবে। এতে এলাকার কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যেমন ছড়িয়ে পড়বে তেমনি এর ফলে অর্থনৈতক প্রবৃত্তিও বাড়বে। শেরপুরের সম্ভাবনায় অন্যান্য সব পণ্যের জিআই স্বীকৃতি চেয়ে শিগগিরই প্রস্তাব করা হবে।’









