ধর্ম

শিশুদের পাঠদানে কঠোর আচরণের পরিণতি

নিউজ ডেস্ক১১ মার্চ ২০২১৪ মিনিট পড়া

ইসলামে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের গুরুত্ব : ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। রাসুল (সা.)-এর ওপর প্রথম অবতীর্ণ হওয়া ওহি ছিল জ্ঞানার্জনের বিষয়ে। রাসুল (সা.)-কে আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এর মাধ্যমে শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। তা ছাড়া ইসলামী শরিয়তের বিষয়ে গভীর জ্ঞান আহরণের জন্য অবশ্যই শিক্ষকের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞানার্জন করতে হয়। এ কারণে রাসুল (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদার যুগ থেকে শিক্ষার প্রতি মুসলিমদের মনোযোগ ছিল অত্যধিক এবং তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

শৈশবের শিক্ষা জীবনের পাথেয় : জীবনের সূচনাকাল যৌবনে গভীর জ্ঞান অর্জন করা হলেও শিশুকালে লব্ধ জ্ঞানের প্রভাব পরবর্তী জীবনের ওপর অনেক বেশি হয়। তাই মক্তব, প্রাথমিক মাদরাসা বা স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মাধ্যমে গড়ে ওঠে শিশুর ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানচর্চা। বড় বড় সাহাবা ও তাবেয়ির পক্ষ থেকে শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে দেওয়া হয় প্রজ্ঞাপূর্ণ নির্দেশাবলি।

শিশুর সঙ্গে কোমল ব্যবহার : ইসলামের শিক্ষা প্রবীণদের কাছ থেকে শিখে পরবর্তী প্রজন্মকে পৌঁছে দেওয়া হয়। তাই পাঠদানে শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাত্যহিক জীবনের শিষ্টাচার ও সুন্দর আচার-ব্যবহার তাঁদের শেখানো জরুরি। প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.)-এর শিষ্য মুজাহিদ বিন জাবার (রহ.) বলেছেন, ‘শিক্ষকরা শিশুদের সঙ্গে ন্যায়পূর্ণ আচরণ না করলে কিয়ামতের দিন তারা জালিমদের সঙ্গে থাকবে।’ (ইবনে হিব্বান, আস সিকাত, ১৭৩/৯)

শিশুর মানস গঠনে ইবনে সিনার পরামর্শ : ইসলামী বিশ্ব বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ শুরু হয়। নানা শ্রেণির লোকের সঙ্গে মুসলিম শিক্ষাবিদদের মেলামেশার সুযোগ ঘটে। আল্লামা ইবনে সিনা শিশুর আবেগ-আগ্রহের প্রতি গুরুত্বারোপের পরামর্শ দিয়েছেন। আগে তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। এমন কোনো কঠিন কাজ তাকে না দেওয়া উচিত, যা সে করতে পারে না। শিশুর মতামত ও আগ্রহকে যথাযথ সম্মান দিতে হবে। তাকে শাসন করতে হবে আদরের মাধ্যমে। অবশ্য সংশোধনের জন্য তাকে ধমক দেওয়া হবে। প্রয়োজনে তাকে হালকা প্রহারও করা যাবে। তবে তা সব পন্থা বিফল হওয়ার পর করা চাই। তাই শিশুকে প্রথম অবস্থায় প্রহার বা কঠোরতা প্রদর্শন করা যাবে না।

শিশুর সঙ্গে বিনম্র আচরণে ইমাম গাজালির পরামর্শ : হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালি (রহ.)-এর মতে, ‘শিশুর সঙ্গে সর্বোচ্চ বিনম্র আচরণ করা চাই। একটি শিশু মা-বাবার কাছে সবচেয়ে বড় আমানতস্বরূপ। তাই একনিষ্ঠতা ও মায়া-মমতা দিয়ে তার সঙ্গে আচার-ব্যবহার করা চাই। শিশুর আবেগ-অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। লাজুক প্রকৃতির হলে তার লাজুকতা দূর না করেই তাকে শেখানো উচিত। তেমনি প্রথমবারেই কোনো শিশুকে অভিযুক্ত না করা চাই। বরং শিশুর দোষত্রুটি প্রকাশ পেলেও তা না দেখার মতো থাকতে হবে।’ (ইহয়াউ উলুমুদ্দিন, পৃষ্ঠা : ৭২/৩)

শিশুর আনন্দ-বিনোদনে সজাগ থাকা : অষ্টম শতাব্দীর মিসরের প্রখ্যাত আলেম ইবনুল হাজ আবদারি (রহ.) শিশুর শিক্ষার ব্যাপারে অনেক নির্দেশনা দিয়েছেন। শিশুদের বেদম প্রহারকারীর নিন্দা করেছেন তিনি। বরং একজন শিক্ষক সাধ্যমতো নরম ভাষায় তার সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন। তবে প্রয়োজনে হালকা মারা যাবে। এ ছাড়া তিনি শিক্ষকদের উপদেশ দিয়েছেন, যেন তাঁরা শিশুদের বাড়ি থেকে খাবার আনার অনুমতি না দেন কিংবা পছন্দের কোনো খাবার কেনার জন্য তারা টাকাও না নিয়ে আসে। নতুবা দরিদ্র শিশু ধনীদের মতো আনন্দ করতে না পারায় মনে কষ্ট পাবে। বরং শিশুরা সবাই বাড়ি গিয়ে খাবার খাবে। আর পাঠ শেষে তাদের খেলতে দেওয়া উচিত, যেন ক্লান্তিবোধ দূর করে তারা আবার পাঠে আগ্রহী হয়। (ইবনুল হাজ, আল মাদখালা, ৩১৩/২)

শিক্ষার্থীর সঙ্গে কঠোর আচরণের কুফল : আল্লামা ইবনে খালদুন (রহ.) রচিত ‘মুকাদ্দিমাতুল ইবনে খালদুন’ গ্রন্থে ‘শিক্ষার্থীদের প্রতি কঠোরতা ক্ষতিকর’ নামে একটি অধ্যায় আছে। এতে তিনি বলেন, ‘সেবক ও শিক্ষকদের মধ্যে কঠোরভাবে লালন-পালন করলে ছাত্রদের মনও কঠোর ও রূঢ় হয়ে পড়ে। অতঃপর অলসতা ও মিথ্যা বলার অভ্যাস গড়ে ওঠে। এমনিভাবে প্রাথমিক অবস্থায় কঠোরতা ও রূঢ়তার ফলে ধীরে ধীরে একটি জাতির মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।’ (ইবনে খালদুন, আল মুকাদ্দিমা, ৭৪৩)

ইসলামী সভ্যতায় শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্বের চিত্র ফুটে ওঠে এতে। শিশুদের ভবিষ্যতের কাণ্ডারিরূপে গড়ে তুলতে চিন্তাশীল যোগ্য ও উপযুক্ত শিক্ষকের বিকল্প নেই।