রাজশাহী

শিক্ষার্থীদের বেতন-ভর্তির টাকাও আত্মসাৎ করেন আ.লীগ নেতা অধ্যক্ষ মাঞ্জাল

নিউজ ডেস্ক১২ জানুয়ারি ২০২৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজশাহী জেলা শাখার যুগ্মসম্পাদক ও নগরীর সুজাউদ্দৌলা কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জালের বিরুদ্ধে ওই কলেজের ভর্তি ও বেতনের প্রায় পৌনে দুই কোটি আত্মসাতের অভিযোগ অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ ও বেতন করার নামে আরও অন্তত সাড়ে ৬ কোটি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও তিনি অধ্যক্ষ থাকাকালিন তাঁর কক্ষের ভিতরে আরেকটি ছোট খাসকামরা গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে তিনি রঙ্গলীলায় মেতে উঠতেন। এ নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্ত করছে দুদক। তবে জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এ নেতা এখনো বহাল তবিয়তে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। গত ১০-১২ দিন আগেও তিনি এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ান। পাশাপাশি নির্বাচন বানচালের নানা ষঢ়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগ সূত্র মতে, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে হওয়া সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন এসএম মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জাল। এর পর ২০১৯ সালের সম্মেলনে হওয়া কমিটিতেও তিনি একই পদ পান।

কলেজ সূত্র মতে, ২০১৪ সালের কমিটিতে পদ পেয়ে দুই বছরের মাথায় ক্ষমতার দাপটে তিনি রাজশাহী মহানগরীর তেরোখাদিয়া এলাকায় অবস্থিত সুজাউদ্দৌলা কলেজের অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নেন। এরপর তিনি হয়ে উঠেন বেপরোয়া। ওই কলেজের যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হোন বা মাসিক বেতন আদায় করা হয়, সব টাকা নগদ আদায় করে অধ্যক্ষ এসএম মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জাল বগলদাবা করতেন। দুটি ব্যাংকের তিনটি শাখায় কলেজের তিনটি হিসাব খোলা হলেও শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও বেতনের একটা টাকাও সেখানে জমা করা হত না। সব টাকা অধ্যক্ষ আত্মসাত করতেন। এভাবে ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি কলেজ থেকে পদত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এক কোটি ৭৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা আত্মসাত করেন।

এছাড়াও কলেজের অনার্স শাখার অনুমোদন না থাকলেও তিনি ৪০ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অন্তত চার কোটি টাকা, ডিগ্রি শাখায় অনুমোদন ছাড়ায় ৯জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অন্তত এক কোটি টাকা এবং ১২ জন কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে আরও অন্তত দেড় কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করে সাবেক অধ্যক্ষ মাঞ্জাল আত্মসাৎ করেছেন। এসব নিয়ে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষাক্ষার্থীদের তোপের মুখে ২০২৪ সালে ২৫ আগস্টে নিজেই পদত্যাগ করে বাঁচার চেষ্টা করেন। তবে কলেজ পরিচালনা পর্ষদ তাঁর অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্ত করে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের বেতন ও ভর্তির নামে উত্তোলনকৃত এক কোটি ৭৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায়। এরপর তদন্ত প্রতিবেদনসহ প্রথমতে রাজশাহীর মহানগর আদালতে মামলা দায়ের করেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

পরে সেই মামলাটি তিনি অজ্ঞাত কারণে প্রত্যাহার করে নেন। পরবর্তিতে সেই প্রতিবেদনসহ একটি লিখিত অভিযোগ কলেজ পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে দুদকে দেওয়া হয়। এতে মাঞ্জালের দুর্নীতি-অনিয়ম এমনকি কলেজের শিক্ষার্থীদেরও তিনি কুপ্রস্তাবও দিতেন বলেও অভিযোগ করা হয়। দুদক সেটি গ্রহণ করে রাজশাহী জেলা সম্নয় কার্যলায়কে তদন্তের নির্দেশ দেয়। এখনো সেটি তদন্তাধীন আছে বলে দুদকের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন।

কলেজের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জালের মতো দুর্নীতিবাজ শিক্ষক হয় না। সে তাঁর কার্যালয়ের ভিতরে আরেকটি ছোট খাস কামরা গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে আমাদের যাওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না। ওখানে তিনি মদপান সহ রঙ্গলিলার আসর বসাতেন রাতভর। কলেজ ছুটির পরে সেগুলো চলতো। রাত ১২-১টা পর্যন্ত তিনি এসব করতেন। তাঁর বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু তিনি এখনো এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে শুনেছি। আওয়ামী লীগের নেতারা পলাতক থাকলেও মাঞ্জাল কিভাবে এলাকায় ঘুরছেন-সেটি মাথায় আসে না।’

অপর আরও কয়েকজন শিক্ষক বলেন, ‘মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জাল, চাকরি পাইয়ে দেওয়া, সুজাউদ্দৌলা কলেজে ভুয়া নিয়োগ দেয়াসহ নানা অপকর্ম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বাড়ি-গাড়িসহ অগাধ সম্পদ গড়েছেন। সেই টাকায় মেয়েকে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। পুকুর করেছেন। কিন্তু তার মাধ্যমে প্রতারিতরা এখনো টাকার আশায় ঘুরছেন।’

এসব বিষয়ে জানার জন্য মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জালের ফোনে যোগাযোগ কার হলে তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ সঠিক নয়। আমাকে ফঁসানো হচ্ছে। আমি কোনো অনিয়ম করিনি।’

ওই কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির বড় অভিযোগ কলেজের অভ্যান্তরিন তদন্তে উঠে আসে। আমরা সেই প্রতিবেদনসহ দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছি। এখন কি অবস্থা নতুন অধ্যক্ষ বলতে পারবেন। আমি এসব নিয়ে কিছু বলতে পারব না।’

জানতে চাইলে বর্তমান অধ্যক্ষ আ ফ ম লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে সাবেক অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমানের অনিয়ম-দুর্নীতিগুলোর বিষয়টি আমি নিয়ে কাজ করছি। তাঁর খাসকামরাটি গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কলেজ হলো শিক্ষার জায়গা এখানে কোনো খাস খামরা থাকতে পারে না। ওই খাসকামরা আর ব্যবহার হয় না।’
কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আহমেদ ইমতিয়াজ বলেন, ‘আমি কেবল দায়িত্ব নিয়েছি। সাবেক অধ্যক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি আমি শুনেছি। এগুলো কি অবস্থা খোঁজ নিয়ে জানাবো।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ’সাবেক অধ্যক্ষের বাড়িতে কলেজের সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিল, সেই সূত্রে আমিও গেছিলাম। এখানে ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নাই।’