নিজস্ব প্রতিবেদক:
ম্যাচ ফিক্সিংয়ের গুরুতর অভিযোগে পদত্যাগকারী বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক মুখলেসুর রহমান শামীমের বিরুদ্ধে এবার বেকার যুবক-যুবতিকে লন্ডন পাঠানোর নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৫ বছর ধরে লন্ডন ও রোমানিয়া পাঠানোর নামে রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বেশকিছু যুবকে-যুবতির পরিবারের নিকট থেকে লাখ লাখ হাতিয়ে নিয়েছেন শামীম।
‘মার্স এডুকেশন’ নামে রাজশাহীতে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে এই প্রতারণা করেন তিনি। এর মধ্যে কয়েকজনকে কিছু টাকা ফেরতও দিয়েছেন। জমি বিক্রি করে বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার আশ^াস দিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ পরিবারকেই কোনো টাকা ফেরত দেননি। টাকা আত্মসাত করে শামীম এখন লন্ডনে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। শামীমের বাড়ি হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মাহদীপুর গ্রামে। বর্তমান ঠিকানার স্থলে দেওয়া আছে রোড নম্বর তিন, সেক্টর নম্বর তিন উপশহর, রাজশাহী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শামীমের লন্ডনের যে বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানসহ থাকেন সেই বাড়িতে গিয়েই উঠতেন আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রশিকিউটর। আর সেই সদ্য বিদায় হওয়া ওই প্রশিকিউটরের মাধ্যমেই বিসিবির পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি রাজশাহী বিভাগীয় কাউন্সিলর থেকে পরবর্তিতে বিসিবি’র পরিচালক হোন।
প্রসঙ্গত, বিপিএলের ১২তম আসরের ফাইনালের মাঝেই বিসিবির সব দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান মুখলেসুর রহমান শামীম। তাঁর আগে তিনি বিসিবির পরিচালক এবং অডিট কমিটির চেয়ারম্যান চিলেন। মূলত, ফিক্সিংয়ের অভিযোগ উঠার পরেই তিনি ওই পদ থেকে পদত্যাগ করে লন্ডন পাড়ি জমান।
ওই সময় শামীম ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অডিট কমিটির চেয়ারম্যানসহ আমার সব দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিছিয়ে, যেন একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা যায়। এটি কোনোভাবেই দায় স্বীকার নয়; বরং দেশের ক্রিকেট ও প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রতি আমার দায়বদ্ধতার প্রকাশ।’
রাজশাহীর মোল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও কানাডা প্রবাসী হামিম আহমেদ সুচি অভিযোগ করে জানান, তাঁর বোন সোনিয়া আক্তার সুচিকে লন্ডনে মেডিক্যাল টেকনলজিস্ট হিসেবে পাঠানোর নাম করে মুখলেসুর রহমান শামীম তাঁর একাউন্টে মোট ১৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়েছেন। ওইসময় তিনি লন্ডনে থাকতেন। কিন্তু টাকা নিয়েছেন বাংলাদেশের এবি ব্যাংকে তার নিজের নামের একাউন্টে এবং সিটি ব্যাংক রাজশাহী শাখায় খোলা মুখলেসুরের ‘মার্স এডুকেশন কন্সালটেনন্সি’র প্রতিষ্টানের একাউন্টে। ওই নামে তিনি রাজশাহী সিটি করপোরেশন থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্সও বাগিয়ে নেন। নগরীর বর্নালীর মোড়ের ঠিকানায় নেওয়া ট্রেড লাইসেন্সের লাইসেন্সধারীর স্থানে লিখা আছে মুহাম্মদ মুখলেসুর রহমান। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের লাইসেন্স ফিও জমা দেওয়া আছে। সেখানে মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে মুখলেসুর রহমানের নিজের ব্যবহৃত নম্বরটি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মুখলেসুর রহমানকে তিনটি ডিপোজিট স্লিপের মাধ্যমে ১৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেন সোনিয়া আক্তার সুচি। এর মধ্যে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেন ২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর দিয়েছেন ৩ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট সাত লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন মুখলেসুর রহমানের নিজের একাউন্টে। প্রথমে সাড়ে সাত লাখ টাকা নিয়ে সোনিয়াকে লন্ডন পাঠানোর নাম করে আরও বিভিন্নভাবে অন্তত দুই লাখ টাকা খরচ করানো হয়। এরপর ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর লন্ডনের ‘এনজেলিক কেয়ার রিসোর্সিং লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয় সোনিয়ার নামে। ওই নিয়োগপত্র দিয়ে লন্ডনে ভিসা আবেদন করার পরে সেখান থেকে জানানো হয়, এই ধরনের কোনো নিয়োগপত্র সোনিয়ার নামে ইস্যু করেনি ওই প্রতিষ্ঠানটি। এরপর সোনিয়ার পরিবার থেকে টাকা ফেরতের জন্য বার বার মোখলেসুর রহমান শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সময়ক্ষেপন করতে থাকেন।
কখনো কখনো সোনিয়াকে ভয়েস ম্যাসেজ পাঠিয়ে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা স্বীকার করার পাশাপাশি পরোক্ষভাবে হুমকিও প্রদান করেন শামীম। ‘একটি ভয়েস ম্যাসেজে বলতে শোনা যায়, সুচি আপু আপনি জানেন আমি এরকম লোক না। আপনি ভালো করেছেন আমার অফিসে গেছেন লোকজন নিয়ে চেঁচামেচি করেছেন। এটা খুবিই ভালো। আপনি চাইলে আমার নামে মামলাও করতে পারেন। কিন্তু করে কতটুকু কি হবে আপনি ভালো করেই জানেন। আমার নিজের কাছে কোনো টাকা নাই এখন। আমার পার্টনাররা দেড় দুই কোটি টাকার হিসেব দিতে পারছে না। আমার কাছে আপনার কিছু টাকা আছে। যেহেতু আমার একাউন্টে টাকা দিছেন, সেগুলো আমি ফেরত দিব। তবে আমাকে তিন মাস সময় দিতে হবে। আর আপনি চাইলে আমার অফিসে লোকজন নিয়ে যেতে পারেন কোনো সমস্যা নাই। চাইলে মামলাও করতে পারেন।’
সোনিয়ার কানাডা প্রবাসী ভাই হামিম আহমেদ বলেন, ‘এইভাবে একের পর এক ডেট নিছে শামীম। তাকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছি। কিন্তু আমার বোনের টাকা আর ফেরত দিচ্ছে না। সে এখন লন্ডনে পালিয়ে আছে। এভাবে অন্তত একশ মানুষের নিকট থেকে কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা প্রতারণা করে আত্মসাত করেছে শামীম। তারা সবাই তাকে খুঁজছে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিসিবির সাবেক পরিচালক মুখলেসুর রহমান শামীম চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের হাজির মোড় এলাকার সাদিকুল ইসলামের ছেলে ডলারকে লন্ডন পাঠানোর নাম করে ২৫ লাখ টাকা নেন। কিন্তু তাঁকেও লন্ডনে পাঠাতে পারেননি। পরবর্তিতে ২০ লাখ টাকা কয়েক দফায় ফেরৎ দিয়েছেন শামীম। কিন্তু বাকি পাঁচ লাখ টাকা এখনো পাবেন সাদিকুল ইসলাম।
সাদিকুল বলেন, ‘আমি ফেঁসে আছি মখলেসের কাছে। ছেলেকে লন্ডন পাঠানোর জন্য ২৫ লাখ টাকা দিছিলাম ৫ বছর আগে। পরে আর পাঠাতে পারেনি শামীম। কিন্তু ২০ টাকা কয়েক দফায় দিয়ে বাকি পাঁচ লাখ টাকা এখনো পাবো। জমি বিক্রি করে নাকি সেই টাকা ফেরত দিবে? কিন্তু তার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারছি না।’
একইভাবে প্রতারণা করেছেন সাগর আহমেদ নামের আরেক যুবকের সঙ্গে। তাঁকে লন্ডনে পাঠানোর নাম করে ২৫ লাখ টাকা নগদ নিয়েছেন শামীম। আর অন্যান্য খরচ মিলে আরও প্রায় সাত লাখ টাকা খরচ করানো হয়েছে সাগর আহমেদের পরিবারকে। পরে তাঁকেও লন্ডনে পাঠাতে পারেননি শামীম। পরবর্তিতে সাগরের পরিবারকে ২১ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন। কিন্তু বাকি চার লাখ টাকা এখনো ফেরত দেননি। বলে দাবি করেছেন ওই পরিবারের একজন সদস্য।
তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শামীম আমাদের আত্মীয় হয়। কিন্তু আমাদের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। এখন টাকা চাইলে আর বাকি টাকা ফেরত দিচ্ছেন না।’
শিবগঞ্জের ছত্রাজিতপুর এলাকার যুবক রবিউল ইসলাম তাঁর বাপের জমিজমা বিক্রি করে ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন মোখলেসুর রহমান শামীমকে। তাঁকেও লন্ডন পাঠাতে পারেননি। উল্টা জমিগুলোও হারাতে হয়েছে রবিউলকে। এখন একেবারে পথে বসার দশা এই পরিবারটির।’
রবিউলের পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘আমার আর কিছুই নাই। যা সম্পদ ছিলো সব বিক্রি করে টাকা দিছি শামীমকে। এখন বোনরাও এসে সম্পত্তির ভাগ চাই। কিন্তু কাউকেই আর দেয়ার মতো কিছু নাই। ২০ লাখ টাকা আত্মসাত করে নিছে শামীম।’
একই উপজেলার বাসিন্দা শাহীন আলী বলেন, ‘লন্ডন যাওয়ার আশায় মুখলেসুরের একাউন্টে ১৫ লাখ টাকা দিছি। আর একজনের মাধ্যমে দিছি ১৯ লাখ টাকা। যেই ১৫ লাখ টাকা একাউন্টে দিছি ২০২৩ সালে, ওই টাকা ফেরত দিব বলে ঘুরাচ্ছে শামীম। কিন্তু টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এখন লন্ডন পালিয়ে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লন্ডন এবং রোমানিয়া পাঠানোর নাম করে আমার মতো অন্তত একশ মানুষের নিকট থেকে লাখ লাখ টাকা প্রতারণা করে আত্মসাত করেছে মানব পাচারকারী শামীম। আমরা এখন পথে বসে গেছি। আর সে লন্ডনে বিলাসি জীবন কাটাচ্ছে। এই প্রতারক কিভাবে বিসিবির পরিচালক হয়েছিল, সেটিই বিষ্ময়কর।’
আরেক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অন্তত ২০-২৫ জন যুবক-যুবতিকে লন্ডন এবং রোমানিয়া পাঠানোর নাম করে বিসিবির সাবেক পরিচালক মুখলেসুর রহমান শামীম অন্তত ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রাজশাহীতে একটি অফিস খুলে ওই টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। ভুক্তভোগীরা সেই টাকা পাওয়ার আশায় এখন বিভিন্ন দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। অনেকেই স্থানীয় এমটি কেরামত আলীর কাছেও অভিযোগ করেছেন। কেউ কেউ দিয়েছেন লিগ্যাল নোটিশ।
জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের এমপি কেরামত আলী বলেন, ‘এই ধরনের বেশকিছু অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। কিন্তু আমার এ বিষয়ে কিছুই করার নাই।’
সূত্র মতে, শামীম স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ লন্ডনের যে বাসায় থাকেন, সেখানে গিয়ে উঠতেন আন্তজার্তিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য বিদায়ী এক প্রভাবশালী প্রশিকিউটার। ওই প্রশিকিউটরের সহযোগিতায় বিগত ইউনূস সরকারের আমলে মোখলেসুর রহমান শামীম প্রথমে রাজশাহী বিভাগের কাউন্সিলর হন। এরপর তিনি কোটি টাকা খরচ করে বিসিবির পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগে স্বেচ্ছায় গত ৩ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর লন্ডনে পালিয়ে যান শামীম।
সম্প্রতি মোখলেসুর রহমান শামীমের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ তুলেন ফ্রিল্যান্স ক্রীড়া সাংবাদিক রিয়াসাদ আজিম। তার প্রকাশিত ভিডিওতে শামীমের একাধিক কল রেকর্ড তুলে ধরা হয়। যেখানে ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার আলামত পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়।
জানতে চাইলে মোখলেসুর রহমান শামীম বলেন, মানুষের জীবনে ছোটখাটো কিছু ভুল থাকতে পারে সেটা আমার জীবনে ঘটেছে। তবে শতাধিক ব্যক্তি আমার কাছে টাকা পাবে এটা সঠিক নয় সর্বোচ্চ চারজন টাকা পাবে। আমি টাকা তাদের ফেরত দিতে চেয়েছি হয়তো কিছু সময় লাগছে। ভুয়া নিয়োগপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন এসব বিষয়ে আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব। এর জন্য আমাকে সময় দেন। বিসিবির বোর্ড দখল হয়ে গেছে। সেটি নিয়ে আমি ব্যস্ত আছি। এই সময়টা পার করে আমি এ বিষয় নিয়ে আপনার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলব।
বর্তমানে কোথায় আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা গোপন বিষয়। আপনার সঙ্গে পরে কথা বলবো। তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবাইকে টাকা ফেরত দিচ্ছি। যাদের দিতে পারিনি, তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। জমি বিক্রি করে দ্রুতই দিয়ে দিব। আমিও ফেঁসে গেছি। তাই সমস্যা হচ্ছে। তবে দ্রুতই সবার টাকা দিয়ে দিব।’









