নিজস্ব প্রতিবেদক:
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অধিকাংশ আন্তঃনগর ও লোকাল মেইল ট্রেন লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে লক্ষ্যামাত্রার অর্ধেকও আয় করতে পারছে না পশ্চিমাঞ্চল। যদিও ট্রেন বাণিজ্যিক পরিবহণ নয়; জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তার পরেও ট্রেনের দায়িত্বরত সিন্ডিকেটের কারণে টিকিটবিহীন যাত্রীদের নিকট থেকে আদায় করা টাকার বেশির ভাগ চলে যাচ্ছে তাদের পকেটে। এতে অব্যাহত লোকসান গুনতেই হচ্ছে ট্রেনকে।
এই অবস্থায় পশ্চিমাঞ্চল থেকে চলাচলকারী ৬৮টি ট্রেনের মধ্যে মাত্র ১০-১২টি ট্রেন কোনো মতে লাভের মুখ দেখছে। বাকি ট্রেনগুলোর আয় পরিচালনা ব্যয়ের তুলনায় কম হওয়ায় নিয়মিত লোকসান গুনতে হচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে। ফলে আরও ১১টি ট্রেনে বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে রেলওয়ে সদর দপ্তরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এটি অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অনুমোদনের পর এই ট্রেনগুলো লিজ দেওয়া হবে বেসরকারী কম্পানীগুলোকে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, যাত্রীচাহিদা বেশি থাকা ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী-খুলনা রুটের অন্তত ১০-১২টি ট্রেন লাভজনক অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা, সিল্কসিটি, ধূমকেতু ও বনলতা, সাগরদাঁড়ি, কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস উল্লেখযোগ্য। এসব ট্রেনে অধিকাংশ সময় আসন পূর্ণ থাকায় আয়ও তুলনামূলক বেশি হচ্ছে। কিন্তু মেইল ও কমিউটার ট্রেনগুলোতে দিনের পর দিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। স্বল্প ভাড়া এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বেশিরভাগ ট্রেন লোকসানে চলছে।
খোদ রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল ও অবকাঠামোগত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক ট্রেনের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। রেলওয়ে কেবল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জনসেবামূলক পরিবহন ব্যবস্থা। তাই কিছু ট্রেন লোকসানে চললেও আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের স্বার্থে সেগুলো চালু রাখা হয়। তার পরেও দিনের পর লোকসান গুনতে হচ্ছে ট্রেনের দায়িত্বরতদের বাণিজ্য আর যাত্রীদের অসেচতনতার কারণে। এতে করে প্রভাব প্রড়ছে রেলওয়ের ওপর।
সূত্র মতে, কেবল পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আওতায় মোট ৬৮টি ট্রেন চলাচল করছে বর্তমানে। এর মধ্যে ৩২টি হলো আন্তঃজেলা ট্রেন। আর ৩০টি আন্তঃনগর ট্রেন। আন্তঃনর ট্রেনগুলো পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যেই চলাচল করে। আর আন্তঃজেলা ট্রেনগুলো চলাচল করে পশ্চিমাঞ্চল-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে। এছাড়াও রয়েছে ৬টি আন্তঃনগর কমিউটার ট্রেন।
রেলওয়ে সূত্র মতে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ট্রেনে যাত্রী ও মালামাল পরিবহণ থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১৩শ ৭৭ কোটি ৫ লাখ টাকা। সেখানে আয় হয় ৬৪৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ওই অর্থ বছরে ২ কোটি ৪৪ লাখ ৭ হাজার যাত্রী ও মালামাল পরিবহন থেকে এই আয় হয়। ওই বছর যাত্রী পরিবহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১১শ ৫৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। সেখানে আয় হয় ৬২১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ওই বছরে যাত্রী পরিবহন হয় ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার। যাত্রী পরিবহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৩ কোটি ১৫ লাখ ৬৫ হাজার।
২০২৫-২৬ অর্থ বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৮২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সেখানে এপ্রিল পর্যন্ত আয় হয়েছে ৫৬৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এই সময় পর্যন্ত যাত্রী পরিবহণ করা হয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ৪১ লাখ ৫৫ হাজার।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্র আরও জানায়, রেলওয়ের ২৪টি মেইল ও কমিউটার ট্রেন বেসরকারি খাতে লিজ দিয়ে মাসিক আয় হচ্ছে এক কোটি ৩৩ লাখ টাকার মতো। এই অবস্থায় মেইল ও লোকাল আরও ১১টি ট্রেন কমিউটারে রুপান্তরে করে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে অনুমোদন পক্রিয়াও প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। অনুমোদনের পর নানা পক্রিয়া শেষে এগুলোকে লিজ দেওয়া হবে।
সূত্রটি আরও জানায়, মেইল ও লোকাল ট্রেনগুলোতে প্রচুর পরিমাণে যাত্রী উঠলেও সাধারণত বেশিরভাগই টিকেট কাটেন না। আবার টিকিট চেক করার জন্য ট্রেনে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তারা যাত্রীদের নিকট থেকে যে টাকা আদায় করেন, সেই টাকাও সম্পূর্ণ জমা দেন না। ফলে দিনের পর দিন এই ট্রেনগুলো লোকসান গুনছে ব্যাপক হারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এই ট্রেনগুলোর মধ্যে আরও ১১টি ট্রেন বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়া হবে।
রেলওয়ে সূত্র আরও জানায়, আন্তঃনগর এবং আন্তঃজেলা ট্রেনেও বিপুল পরিমাণ যাত্রী প্রতিদিন টিকিটবিহীন যাতায়াত করছেন। সেখান থেকেও আয়ের একটি অংশ চলে রেলওয়ের ওই ট্রেনগুলোর দায়িত্বরতদের পকেটে। ফলে এসব ট্রেন থেকেই কাঙ্খিত আয় করতে পারছে না রেলওয়ে। এতে করে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও পূরণ হচ্ছে না কোনো কোনো বছরে।
রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, গত ৪ জুন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাজশাহী স্টেশনে এসে থামে যাত্রী নামানোর জন্য। এসময় চাঁপাইনবাগঞ্জগামী বিপুল পরিমাণ যাত্রী ওঠেন কিটিট ছাড়ায়। পরে ওই ট্রেনে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা জরিমানাসহ আদায় করেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।
ওই সূত্রটি আরও জানায়, শুধু রাজশাহী-রহনপুর এবং রাজশাহী-চাঁইপনবাবগঞ্জগামী ট্রেনে যাত্রীরা টিকিট কেটে যাতায়াত করলে প্রতি মাসে অন্তত ১৫-১৬ লাখ টাকা বেশি আয় হবে। কিন্তু যাত্রীদের অসেচতনতার কারণে এই টাকা গোচ্চা যাচ্ছে। যাত্রীরা টিকিট না কেটে চলাচলের কারণে ট্রেনের দায়িত্বরত টিটি, গার্ডসহ অন্যরা সেই টাকার অধিকাংশই ভাগ-বাটোয়ারা করে নিচ্ছেন। এভাবে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সব ট্রেনেই টিকিটহীন যাত্রীদের অধিকাংশ টাকা চলে যাচ্ছে ওই সিন্ডিকেটের পকেটে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আনসার আলী বলেন, ‘যাত্রীদের অসচেতনতার কারণেই টিকিট থেকে আমরা পর্যাপ্ত আয় করতে পারছি না। বিশেষ করে লোকাল ও মেইল ট্রেনগুলোতে যাত্রীরা টিকিট কাটতেই চান না। ফলে আরও ১১টি ট্রেনকি আমরা বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ট্রেন একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এখানে লাভ-লোকসানের চেয়ে বড় হিসেব হয় সেবার মাণ। আমরা সেটি ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’
স.আর









