রাজশাহী

রামেক হাসপাতাল: ৫৩০ শয্যার জনবল দিয়ে চিকিৎসা চলছে দুই হাজার রোগীর

নিউজ ডেস্ক৩ মার্চ ২০১৭৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: চরম জনবল সঙ্কটে ব্যাহত হচ্ছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসক, নার্স এমনকি কর্মচারীদেরও সঙ্কট রয়েছে চরমে। প্রায় চার বছর হলো আর্থিকভাবে উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ এই হাসপাতালটিকে ৫৩০ থেকে ১২ শ শয্যায় রুপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু এখনো ১২ শ শয্যার জন্য কোনো জনবল নিয়োগ দেয়নি মন্ত্রণালয়। ফলে দিনের পর দিন এ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।

 

আর গড়ে প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নেওয়া দুই হাজার রোগীকে চিকিৎসাবেসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ কর্তৃপক্ষকে।

 

  • এরই মধ্যে ঘটছে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের এবং তাদের স্বজনদের সঙ্গে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা। রাগে-ক্ষোভে ইন্টার্ন চিকিৎসকরাও কখনো কখনো হাসপাতালে চিকিৎসা ফেলে ধর্মঘটে যাচ্ছেন। পরে আবারো কাজে যোগ দিচ্ছেন রোগীদের কথা বিবেচনা করেই।

 

রামেক হাসপাতাল সূত্র মতে, ১৯৫৮ সালে ৫৩০ শয্যার রামেক হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই উত্তরাঞ্চলের প্রধান হাসপাতাল হিসেবেই চিতিৎসাসেবা দিয়ে আসছে এ প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে এখানকার রোগীদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ২০১৩ সালে ৫৩০ শয্যা থেকে উন্নীত করে হাসপাতালটিকে ১২ শয্যায় রুপান্তর করা হয়। এর জন্য অবকাঠামো নির্মাণসহ আর্থিক ব্যায়ও নির্ধারণ হয়ে আসছে।

 

  • এখানে সংযুক্ত হয়েছে বার্ন ইউনিট, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ), পূর্ণাঙ্গ রক্ত সঞ্ছালন বিভাগ, ক্র্যাজুয়ালিটি বিভাগসহ আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা। আবার ৩১টি ওয়ার্ডের স্থলে এখন হয়েছে ৫৭টি ওয়ার্ড। কিন্তু এসব নতুন নতুন বিভাগ আর রোগীদের জন্য নতুন নতুন সেবা চালু হলেও এখন পর্যন্ত এখানে নতুন করে জনবল নিয়োগ কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ফলে ৫৩০ শয্যার জনবল দিয়ে এর চার গুন রোগীর সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে দায়িত্বরত চিকিৎসক নার্স এবং কর্তৃপক্ষকে।

রামেক কলেজ হাসপাতালের প্রধান অফিস সহকারী জানান, রাজশাহী হাসপাতালে বর্তমানে মোট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন ২৫০ জন। ইন্টার্নি ডাক্তার রয়েছেন ২৩১জন। নার্স ১১৩০জন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ১১৮জন এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আছেন ৩০৭জন। তবে ৫৩০ শয্যা হাসপাতাল চালাতে যে জনবল প্রয়োজন সেখানেও চিকিৎসক শূন্য পদ রয়েছে ২০ জন, নার্স শূন্য রয়েছে ৪৬ জন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী পদ শূন্য রয়েছে ১৭ জন এবং হাসপাতাল পরিস্কার করার কাজে নিয়োজিত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদ শূন্য রয়েছে ১২৪ জন। অথচ এই জনবল দিয়েই প্রতিদিন হাসপাতালের ৫৭টি ওয়ার্ডে ১৮ শ থেকে দুই হাজার রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্র মতে, বর্তমানে রামেক হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে সেই হিসেবে এখন জনবল প্রয়োজন আগের চেয়ে আরো চার গুন। কিন্তু সেখানে ৫৩০ শয্যার জনবলেও সঙ্কট রয়েছে। অথচ চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে ১২ শ শয্যার হিসেবে।

এর ওপর রয়েছে বর্হিবিভাগের চিকিৎসা। সেখানেও গড়ে প্রতিদিন অন্তত দুই-আড়াই হাজার রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

  • এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালের অর্থপেডিক ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, এখানে ৩০ টি শয্যার স্থলে রোগী ভর্তি আছে ৫৭ জন। আর সেখানে নার্স রয়েছেন মাত্র ২ জন। শিক্ষানবিশ নার্স রয়েছেন আরো ৩ জন। ফলে গড়ে একজন অভিজ্ঞ নার্সকে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে প্রায় ২৯ জনকে। অন্যদিকে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৫ জন।

একই অবসস্থা হাসপাতালের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই। আর এ তীব্র জনবল সঙ্কটের কারণেই হাসপাতালের চারিদিকে যেমন নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে, তেমনি চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়েও হিমশিম ক্ষেতে হচ্ছে এখানকার কর্মরত চিকিৎসক, নার্সসহ কর্মকর্তাদের।

  • জানতে চাইলে হাসপাতালের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকজন ইন্টার্নি চিকিৎসক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্যারেরা সকাল নয়টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে চলে যায়। এরপর রাতদিন হাড় খাটুনি খাটতে হয় হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক আর নার্সদের। কিন্তু হাসপাতালে রোগীর স্বজনরা এসে ইন্টার্নি চিকিৎসক আর নার্সদের ওপরই ক্ষোভ ঝাড়তে থাকেন। কখনো রোগীর স্বজনদের হাতে মারপিটেরও শিকার হচ্ছেন ‘

 

তিনি আরো বলেন, এসব কারণেই অনেক ইন্টার্নি চিকিৎসকও হয়তো রাগের মাথায় রোগী বা সজনদের সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করেন। আর তাতেই বেধে যায় সমস্যা। কখনো কখনো মারপিটের মতো ঘটনা ঘটে। এি নয়ে একাধিকবার হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে ইন্টার্নরা ধর্মঘটও করেছেন। কর্তৃপক্ষের কাছে ইন্টার্ন চিকিৎসক বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবি জানিয়েছেন কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।’

  • হাসপাতালের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বরত একজন নার্স বলেন, ‘যেখানে সার্বক্ষণিক অন্তত ৭ জন নার্স প্রয়োজন হবে, সেখানে পাওয়া যায় দুই-তিন জন। এতে করে চিকিৎসাসেবা দিতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু তারপরেও রোগীদের কথা বিবেচনা করেই হাড়খাটুনি খাটতে হয়।’

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালকের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘৫৩০ শয্যার জনবল দিয়ে ১২ শ শয্যার হাসপাতাল চালাতে গেলে তো কষ্ট করতেই হবে। তেমনটিই হচ্ছে আমাদের। এতো রোগীর চাপে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ায় স্বাভাবিক। তারপরেও আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি এখানকার সার্বিক পরিবেশ স্বাবাবিক রাখার জন্য।
স/আর