রাজশাহী

রামেক হাসপতালে এ্যাম্বুল্যান্স সিন্ডিকেটে জিম্মি রোগীরা

নিউজ ডেস্ক৩০ জুলাই ২০২৫৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

হার্ট অ্যাটাকে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে মারা যান রাজশাহীর গোদাগাড়ীর চব্বিশনগর এলাকার জাহিদুল ইসলাম (৪০)। রাস্তায় আসার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত এই রোগীর মরদেহ কিছুক্ষণ পরেই বাড়িতে নেওয়ার জন্য হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে পার্কিং করে রাখা লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্স চালকদের কাছে যান জাহিদুলের স্বজনরা। কিন্তু এ্যাম্বুলেন্স চালকদের ভাড়া দাবি পর জাহিদুলের স্বজনরা কিছুটা সময় কিংকর্তব্যবিমুড়া (দিশেহারা) অবস্থায় পড়েন। মাত্র ২০ কিলোমিটার পথ যেতে এ্যাম্বুলেন্স চালকরা ৫ হাজার টাকা দাবি করে বসেন। অথচ একটি এসি চালিত হাইয়েস’র ভাড়াও সাক’ল্যে এ দূরেত্ব বড় জোর নেওয়া হয় দেড় হাজার টাকা।

জাহিদুলের স্বজন আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আমাদের এলাকা থেকে একটি মাইক্রো ভাড়া করে মরদেহ নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাতেও বাধা দিতে থাকেন হাসপাতালের সামনে দাঁড় করে রাখা এ্যাম্বুলেন্স চালকরা। তাঁদের কথা হলো, তাঁদের সমিতি করা আছে। সমিতির ভাড়ার বাইরে তারা ভাড়া নিতে পারবেন না। আবার সমিতির গাড়ির বাইরেও কোনো যানবাহনে লাশ পরিবহণ করতে দেওয়া হবে না। অন্য গাড়িতে লাশ নিয়ে গেলে সমিতিকে দুই হাজার টাকা দিতে হবে। না হলে লাশ তারা নিয়ে যেতে দিবেন না।’

এভাবেই নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয় জাহিদুলের স্বজনদের। শেষে বাধ্য হয়ে সাড়ে হাজার টাকা ভাড়া মিটিয়ে একটি এ্যাম্বুলেন্সে করে ওই মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বাড়িতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু জাহিদুলের লাশ পরিবহনের ক্ষেত্রেই নয়। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালে কোনো রোগী সুস্থ হয়ে বা মারা যাওয়ার পরে এ্যাম্বুলেন্স নিতে হলে হাসপাতাল ঘিরে থাকা এ্যাম্বুলেন্সেই যেতে হবে। বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্সে বা গাড়িতে রোগীকে নিয়ে যেতে দেওয়া হয় না। হাসপাতালকেন্দ্রীক গড়ে ওঠা ওই এলাকার একটি চক্র নিয়ন্ত্রণ করে এ সিন্ডিকেটটি। আর এ চক্রের মূলহোতা হলেন, হাসপাতালের সামনেই নগরীর শিপাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা স্থানীয় সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা জানে আলম জনি। এই জনি একসময় হাসপাতালের মজুরীভিত্তিক কর্মচারী ছিলেন। সেখান থেকে তিনি পুরনো মাইক্রোবাসকে এ্যাম্বুলেন্সে রুপান্তর করে ব্যবসা রোগী ও লাশ পরিবহণের ব্যবসা শুরু করেন। এর পর হাসপাতালে দৈনিক মুজরীভিত্তিক কর্মচারী সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ করতেন। এসব করেই কোটিপতি বনে যান জনি। পরবর্তি ২০১৮ ও ২০২৩ সালে দুই বার কাউন্সিলরও নির্বাচিত হোন তিনি।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত বছরের জুলাইয় আন্দোলনের পরে জনি আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু আত্মগোপনে থেকেই এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন রাজশাহী হাসপাতালের রোগী ও লাশ পরিবহনের এ্যাম্বুলেন্সের নিয়ন্ত্রণ। তাঁর এক ভাগ্নে ভাতিজা সাদ্দাম হোসেনের মাধ্যমে তিনি এ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ করেন। জনির আছে গোটা ত্রিশেক এ্যাম্বুলেন্স। সাদ্দামেরও আছে গোটা পাঁচেক। সবকটায় নিয়ন্ত্রণ করেন সাদ্দাম। সাদ্দামকে এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করেন ডালিম, জনি হোসেন, সুমান, বাদশা, ভাটাপাড়ার ইমন ও তার ভাই আঁকা। ইমন আঁকাদেরও এ্যাম্বুলেন্স আছে। বাকিরা হলেন এ্যাম্বুলেন্সের চালক। তবে মূলত নগরীর শিপাইপাড়াকেন্দ্রীক নিয়ন্ত্রণ হয় এ সিন্ডিকেটটি।

গতকাল সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বর্হিবিভাগের সামনে ও বাইরে অন্তত ৩০-৩৫টি লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা এ্যাম্বুলেন্স দাঁড় করানো আছে। প্রতিটি এ্যাম্বুলেন্সের সামনেই এক থেকে দুই-তিনজন করে চালক করে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো চালক হাসপাতালের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও রোগীর স্বজনদের জিজ্ঞেস করছেন, ‘এ্যাম্বুলেন্স লাগবে লাগবে এ্যাম্বুলেন্স লাগবে, গাড়ি লাগবে।’ এভাবে। ২৪ ঘন্টায় তাঁরা এভাবে এ্যাম্বুলেন্স দাঁড় করে রেখে রোগী ও লাশ পরিবহন করেন। অথচ এসব গাড়ীর অন্তত ৯৫ ভাগেরই কোনো ফিটনেস নাই। বহু পুরনো মাইক্রোবাসকে অ্যাম্বুলেন্সে পরিণত করা হয়েছে এগুলো।

গতকাল দুপুরেও সাদ্মাম হোসেনকে হাসপাতালের সামনে একটি চা দোকানে বসে থেকে এ্যাম্বুলেন্স চালকদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দেখা যায়। একটি কলাপাতা রংয়ের প্রাইভেট কার নিয়ে এসে এখানেই প্রতিদিন বসে থাকেন তিনি। তবে কয়েকটি এ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা স্বীকার করলেও সিডিকেটের সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলেও দাবি করেন এমনকি তাঁর চাচা জনির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নাই বলেও দাবি করেন।

তবে আত্মগোপনে থাকা জানে আলম জনির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
পাবনার ঈশ^রদী এলাকার হাবিবুর রহমান জানান, তিনি তাঁর রোগীকে ইশ^রদী থেকে আসা একটি এ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু হাসপাতালের ভিতরে বাইরের কোনো জেলা বা উপজেলার এ্যাম্বুলেন্স, কার বা মাইক্রোবাসে করে রোগী পরিবহন করতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দিতে থাকেন স্থানীয় এ্যাম্বুলেন্স চালকরা। শেষে বাধ্য হয়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় তাঁর রোগীকে নিয়ে বাড়ি যান। অথচ ইশ^রদী থেকে যাওয়া ওই এ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে গেলে তার মাত্র দেড় হাজার টাকা খরচ হতো। কারণ ওই এ্যাম্বুলেন্সটি আরেকটা রোগী নিয়ে ঈশ^রদী থেকে রাজশাহী হাসপাতালে গেছিল।

জানতে চাইলে রামেক হাসপাতালের পুলিশ বক্সের ইনচার্জ এএসআই আকরাম হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। বিষয়গুলো নিয়ে কিছুই জানি না।’
হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বাইরের এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটটা এতোটাই শক্তিশালী যে এখানে আমরাও চেষ্টা করেও কিছু করতে পারিনি। এদের কাছে বাইরে থেকে আসা রোগীর স্বজনা জিম্মি হয়ে পড়েন। আবার অতিরিক্ত ভাড়াও আদায় করা হয়। অনেকেই আমাদের কাছেও অভিযোগ করেন। এসব নিয়ে আমি নিজেও পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সিন্ডিকেটের কাছে পেরে উঠেনি।’

হাসপাতালের একজন চিকিৎসক আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আমার দাদা মারা যায় এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। এর পর আমার গাড়ীতে করেও সেই লাশ নিয়ে যেতে পারেনি এই সিন্ডিকেটের দাপটের কারণে। তাদের গাড়িতেই নিয়ে যেতে হয়েছে। কিছু করার ছিল না আমার। অসহায়ের মতো তাদের লক্কড়-ঝক্কড়মার্কা গাড়িতেই করেই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে দাদা লাশ নিয়ে যেতে হয়েছে। এর লাগাম টানা জরুরী। সুস্থ বা ঢাকায় নিতে গেলেও রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে এরা। এতো সাহস পায় কোথা থেকে এরা?’

জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম শামীম আহমেদ বলেন, ‘এই সিন্ডিকেটটি খুবই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমিও ব্যবস্থা নিচ্ছি। দ্রুতই এর একটা ব্যবস্থা হবে আশা করি।’

স.আর