মোস্তাফিজ মিশু:
দীর্ঘদিন পর অবশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ৮ ডিসেম্বরের সম্মেলনকে ঘিরে শীর্ষ পদ প্রত্যাশীরা দৌড়-ঝাঁপ করছেন। নানা কর্মকাণ্ডে বির্তকিতরাও পদ পেতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে এবার যোগ্য ও ত্যাগীদের নেতৃত্বে আনার দাবি উঠেছে।
- বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রাঞ্জু বলেন, সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল ক্যাম্পাসে এসে সিভি সংগ্রহ করেছেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের বিপরীতে প্রায় ৭০জন সিভি জমা দিয়েছেন।

তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবাস বাংলাদেশ মাঠে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি থাকবেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। এতে কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতারাও থাকবেন।
ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাস। পদপ্রত্যার্শীদের মধ্যে অর্ধশতজন বেশি দৌড়-ঝাঁপ করছেন। ক্যাম্পাসে শোডাউন, কর্মীদের সাথে মতবিনিময়, বিভিন্ন চত্বরে জড়ো হয়ে চলছে নিজ নিজ অবস্থান জানান দেওয়ার প্রচেষ্টা।
আবার অনেকে ঘুরছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও রাজশাহীর আওয়ামী লীগের নেতাদের দ্বারে দ্বারে। দুঃসময়ে দলের পাশে থাকাসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরছেন নেতাদের সামনে।
- সভাপতি ও সম্পাদক পদে সাতজনের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। এরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু, সহসভাপতি মেহেদী হাসান রাসেল, যুগ্ম-সা.সম্পাদক শাহানুর শাকিল, ছাত্রলীগ নেতা মিনারুল ইসলাম, সদস্য সাকিবুল হাসান বাকি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব হোসেন।
এদের মধ্যে গোলাম কিবরিয়া ভাষা বিভাগের মার্স্টাসের শিক্ষার্থী। ২০১৪ সালের ১৬ জুন ক্যাম্পাসে দিনদুপুরে শিবির নেতা রাসেলের পা কর্তন মামলার তিন নম্বর আসামী তিনি। কিবরিয়া বলেন, ‘শিবিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ক্যাম্পাসে টিকে আছি। এই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন। এবার শিবিরের সঙ্গে আপোসহীন, ত্যাগী ও যোগ্য প্রার্থীকে মূল্যায়ন করা হবে বলে বিশ্বাস করি।’
কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের রুনু ছাত্রত্ব হারিয়েছেন। তিনিও শিবির নেতা রাসেলের পা কাটার মামলার দুই নম্বর আসামী। বিভিন্ন সময় প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে দেখা যায় তাকে।
- রুনু বলেন, দুঃসময়ে রাজনীতি করতে গিয়ে ছাত্রত্বের সমস্যা হয়েছে। এখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্সে এমবিএ করছি।’ সাহসিকতার সাথে শিবিরকে প্রতিহত করারসহ ছাত্রলীগে অনেক অবদান রয়েছে কিবরিয়া ও রুনুর।
চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী রাসেল বছর খানেক আগে পড়াশোনা শেষ করেছেন। বাগেরহাটে বাড়ি রাসেলের কর্মী রয়েছে হাতেগোনা। লোক-প্রশাসন বিভাগের শাকিলের বাড়ি বগুড়ায়। বেশির ভাগই সময়ই তাকে ক্যাম্পাস দেখতে পাওয়া যায় না। সম্মেলনে তারিখ ঘোষণার পর থেকে তাকে ক্যাম্পাস দেখা যাচ্ছে।
আর আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী মিনারুলের বর্তমানে কোনো পদ নেই। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের থেকে কয়েকমাস আগে পড়াশোনা শেষ করেন। তার বাড়ি ঝিনাইদহে। তবে সম্প্রতি তিনি একটি কোর্সে ভর্তি হয়েছেন বলে দাবি করেন মিনারুল।
- ক্যাম্পাসে জনপ্রিয় লোকপ্রশাসন বিভাগের বাকি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। রাজশাহীতে বাড়ি বাকির বিরুদ্ধে রয়েছে সিট বাণিজ্য ও চাঁদা দাবিতে শিক্ষার্থী ও দলীয় কর্মীকে মারধরের অভিযোগ। এ বিষয়ে বাকি বলেন, ক্যাম্পাসে আমার নামে চাঁদাবাজি ও সিট বাণিজ্যের অভিযোগ নেই। এর জেরে কাউকে মারধরের ঘটনাও ঘটেনি। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।
অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র রাজিব একই বিভাগের ছাত্রী শাহনাজ জাহান বন্ধনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় নিবার্চনের আগে ছাত্রদল করতেন তিনি। গেল বছরের ৬ ডিসেম্বর তুচ্ছ ঘটনায় তার অস্ত্রবাজির ছবি এসেছে গণমাধ্যমে।
- আলোচিত সাতজনের মধ্যে যাদের বাড়ি রাজশাহী তারা আরো বেশি এগিয়ে আছেন। বিগত কমিটিগুলোতে স্থানীয়দের প্রাধান্য দেওয়ার নজির আছে। স্থানীয়দের প্রাধান্য দেওয়ার ঘটনায় বাইরের জেলার নেতারা হতাশ হয়ে পড়েন। বাইরের জেলার নেতাদের মুল্যায়নের দাবি তাদের।
এছাড়া আরো যারা নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে আছেন, তন্মায়ান্দ অভি (অছাত্র), শরিফুল ইসলাম সাদ্দাম (অছাত্র), টগর মোহাম্মদ সালেহ, আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, তাসকিন পারভেজ শাতিল, আতিকুর রহমান সুমন (ছাত্রত্ব শেষ), দেলোয়ার হোসেন ডিলস। প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাঞ্জুও। এছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান, আখতারুল ইসলাম আসিফ, শহীদ শামসুজ্জোহা হলের সাধারণ সম্পাদক বরজাহান আলীও প্রার্থী হয়েছেন।
নেতাকর্মীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে নেতৃত্বে আনার ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব রাখেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। লিটনকে যে ম্যানেজ করতে পারবেন- সেই নেতৃত্বে আসবেন।
- জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের অভিভাবক হিসেবে কাজ করি। নেতৃত্ব বাছাইরের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে সহযোগিতা করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাস্তানি, গুন্ডামির অভিযোগ নেই, ছাত্রলীগে অবদান আছে, ধারাবাহিকভাবে সু-সময়ে-দুঃসময়ে রাজনীতি করে আসছে ও যাদের পরিবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আলোচনার মাধ্যমে এবার তাদের নেতৃত্বে আনা হবে।’
এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন,‘ নেতৃতে আসতে হলে অবশ্যই নিয়মিতছাত্র, বয়স ২৯ বছরের মধ্যে ও অবিবাহিত হবে। এছাড়া বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া চলবে না। এসব দিক ঠিক থাকলে আরো অন্যান্য পজিটিভ গুনাবলি দেখে নেতা নির্বাচন করা হবে।’
প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ২৪তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মিজানুর রহমান রানাকে সভাপতি ও তৌহিদ আল হোসেন তুহিনকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীকে মারধরের ঘটনায় ২০১৪ সালের ২৯ আগস্ট তুহিনকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পান খালিদ হাসান বিপ্লব।
চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সভাপতির পদ থেকে রানাকে বহিষ্কার করে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় রাশেদুল ইসলাম রাঞ্জুকে। দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে ছাত্রলীগ। এতে ভেঙে পড়েছে ছাত্রলীগের চেইন অব কমান্ড। নতুন নেতৃত্ব এক সময়ের শিবিরের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের ঝিমিয়ে থাকা রাজনীতিতে গতি আনবে।
স/আর









