নিজস্ব প্রতিবেদক:
১৭১ বছরের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহীর লোকনাথ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়মবহির্ভূতভাবে আকঁড়ে ধরার অভিযোগ উঠেছে আব্দুস সোবহান নামের অবসরপ্রাপ্ত এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তার এই পদ আঁকড়ে থাকা পাবলিক সার্ভেন্টস রিটয়ারমেন্ট অ্যাক্ট ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক পরিপত্র এমনকি হাইকোর্টের নির্দেশের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
অবৈধভাবে তিনি এক্সটেনশন পাওয়ায় রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাকে অনুমোদনও দেয় নি। স্কুলের সম্পদ থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য তিনি পদটি জোর করেই দখল করে রেখেছেন বলে একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন।

১৯৭৪ সালের পাবলিক সার্ভেন্টস রিটয়ারমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী অবসরের পর পুনর্নিয়োগ পাবেন না’। ২০১১ সালের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত পরিপত্র অনুযায়ী, ‘শুন্যপদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সহকারী প্রধান শিক্ষক অথবা সিনিয়র কোনো শিক্ষক।’ এছাড়া ১১ জুন ২০০৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে ‘৫ বছরের এক্সটেনশনও বাতিল’ করা হয়েছে।

কিন্তু এতসব আইন অমান্য করে অবসরে যাওয়া প্রধান শিক্ষক আব্দুস সোবহানকে ২০১২ সালের ৪ জানুয়ারি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকপদে ৫ বছরের জন্য নিয়োগ দেয় স্কুল পরিচালনা পর্ষদ। সেই অবৈধ এক্সটেনশনের মেয়াদও শেষ হয়েছে চলতি বছরের তিন জানুয়ারি। এরপর তার মেয়াদ আরো ছয় মাসের জন্য বৃদ্ধি করেছে ম্যানেজিং কমিটি যা দ্বিতীয় বার একাধিক আইনের লঙ্ঘন।
স্কুল ম্যানেজিং কমিটি নতুন করে মেয়াদবৃদ্ধি করলেও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন মিলে নি। ফলে কোনো ধরনের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়ায় আব্দুস সোবহান প্রধান শিক্ষকের পদ আঁকড়ে বসে আছেন। গতকাল শনিবারও তাকে স্কুলে প্রধান শিক্ষকের আসনে দেখা গেছে।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের স্কুল ইন্সপেক্টর দেবাশীষ রঞ্জন রায় বলেন, ৬০ বছরের পর কাউকে এক্সটেনশন কোনো বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি দিলেও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড তা ‘অ্যালাও’ করে না। এটি না করার জন্য মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ রয়েছে। ফলে বোর্ড সেই নির্দেশ মানতে বাধ্য।’ লোকনাথ স্কুলের বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা কিছু কাগজপত্র সরবরাহ করে নিশ্চিত করেন, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীন চারটি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে নিয়মবহির্ভূতভাবে এক্সটেনশন দিয়েছিলো সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি। সেই এক্সটেনশনগুলো শিক্ষা বোর্ড বাতিল করে দিয়ে চিঠি প্রদান করেছে। কিন্তু লোকনাথ স্কুলের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ- স্কুল কর্তৃপক্ষ অনেক সময় চালাকির আশ্রয় নেয়। আব্দুস সোবহানকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে বোর্ডে দেখায় না তারা। অন্য শিক্ষককে দেখিয়ে কাগজপত্র জমা দেয়। আবার আবদুস সোবহান এক সংসদ সদস্যের আত্মীয়। ফলে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করছেন।
এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির বৈধতা দেয় শিক্ষা বোর্ড। সেই কমিটি যদি আইন-লঙ্ঘন করে কাউকে এক্সটেনশন দেয় তাহলে সেটা দেখার দায়িত্ব শিক্ষা বোর্ডের। এক্ষেত্রে শিক্ষা অধিদপ্তরের কিছুই করার নেই। আবদুস সোবহানের মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার (এমপিও) বাতিল হয়ে গেছে। ফলে তিনি এখন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোনো বেতন-ভাতাও পান না। তিনি যদি অবৈধভাবে স্কুলে চাকরি করেন তাহলে তা দেখার দায়িত্ব শিক্ষা বোর্ডের।
কিন্তু কেনো এই পদ আঁকড়ে থাকা? অনুসন্ধানে জানা গেছে, লোকনাথ স্কুলের প্রতিমাসে প্রায় দুই লাখ করে বছরে ২০ লাখেরও বেশি টাকা আয় হয়। দোকান ঘর ভাড়া, স্কুলের শ্রেণিকক্ষ কেচিং সেন্টারকে ভাড়া দেয়া, পুকুর থেকে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা আদায় হয়। যদিও স্কুলের খাতায় জমার পরিমাণ গড়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। ফলে এখান থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ থাকে। এ কারণেই প্রধান শিক্ষকের পদটি আব্দুস সোবহান আঁকড়ে ধরে আছেন প্রায় ৫ বছর ধরে- এমন দাবি করেছেন স্কুলের বেশ কয়েকজন শিক্ষক।
লোকনাথ স্কুলের সম্পদ থাকার কারণে এর আগেও প্রধান শিক্ষকের পদ আঁকড়ে থাকার ঘটনা ঘটেছে। মেজবাহ উদ্দিন নামের এক প্রধান শিক্ষকও এক্সটেনশন নিয়ে ছিলেন ৫ বছর। তবে ২০০৮ সালে আবারো এক্সটেনশন নিতে গেলে তৎকালীন জীববিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক আব্দুস সোবহানের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন শিক্ষক হট্টগোল পাকান এবং স্কুলে তালা ঝুলিয়ে দেন।
ফলে মেজবাহ উদ্দিনকে স্কুল থেকে বিদায় নিতে হয়। তখন সহকারী প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানকে বাদ দিয়ে প্রশাসনকে ব্যবহার করে দায়িত্ব নেন জীববিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক আব্দুস সোবহান। যে আব্দুস সোবহান ২০০৮ সালে মেজবাহ উদ্দিনের এক্সটেনশনকে ‘অবৈধ’ দাবি করে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তিনিই এখন সেই ‘অবৈধ’ কাজটি করছেন বলেও একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন।
এ ব্যাপারে আবদুস সোবহানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি আমাকে এক্সটেনশন দিয়েছে আমি কাজ করছি। এটা অবৈধ কি না তা ম্যানেজিং কমিটি জানে। এ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।’
স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আবদুস সোবহান স্কুলের অনেক উন্নয়ন করেছেন। এ কারণে তাকে বারবার এক্সটেনশন দেয়া হচ্ছে। এতে আইন লঙ্ঘন হচ্ছে কি না তা আমার জানা নেই।’
স/শ









