রাজশাহী

রাজশাহীতে ডিম সিন্ডিকেটের হাতিয়ার কন্ট্রাক্ট ফার্মিং

নিউজ ডেস্ক১৪ আগস্ট ২০২৩৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক :

 রাজশাহীতে ডিম সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে বাজার অস্থিতিশীল। সপ্তাহখানেক ধরে বাড়তি দামেই ডিম বিক্রি হচ্ছে। এরই মধ্যে খাদ্য তালিকা থেকে অনেকেই ডিম বাদ দিয়েছেন। করপোরেট সিন্ডিকেটের কারণেই ডিমের দাম বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিষয়টি এখন সবার কাছেই ওপেন সিক্রেট। এ বাস্তবতায় শুধু ভোক্তাই নয়; স্থানীয় প্রশাসনও অসহায়।

রোববার সকালে রাজশাহীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিপিস সাদা ব্রয়লার মুরগির ডিম ৪৫ থেকে ৪৮ এবং লাল ডিম ৫২ থেকে ৫৪ টাকা হালি বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে এ দামেই বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে শুক্রবার সাহেববাজারে অভিযান চালিয়ে তিনি খুচরা ডিম ব্যবসায়ীকে ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তবে তাদের এই অভিযানকে বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনে করছেন না ভোক্তারা। তারা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আরও কঠোর হতে হবে।

নগরীর শিরোইল এলাকার আলিফ আহমেদ বলেন, ডিমের দাম এক সপ্তাহ আগে থেকে বাড়তি। অধিদপ্তরের অভিযান সিন্ডিকেট ভাঙতে কোনো ভূমিকা রাখছে বলে মনে হয় না। কারণ রোববারও ওই ৫২ টাকা দিয়েই এক হালি ডিম কিনতে বাধ্য হয়েছি। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম জানান, অভিযানের পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঢাকা অফিস যোগাযোগ করছে। আজকেও (রোববার) তাদের নিয়ে সভা আছে। প্রান্তিক পর্যায়ে থেকে তাদের করণীয়টা তারা করছেন।

রাজশাহীর প্রান্তিক খামারিরা বলছেন, ডিম ও মাংসে দাম এখন আর তারা নির্ধারণ করেন না। সবই এখন করপোরেটের সিন্ডিকেটের দখলে। খামারিরা নামমাত্র লাভ পাচ্ছেন। আর যখন খুশি ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে ফায়দা লুটছে করপোরেট সিন্ডিকেট। আর করপোরেট সিন্ডিকেটের মূল হাতিয়ার হিসাবে কাজ করছে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং। পোলট্রি খাতে ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ নামে গড়ে ওঠা চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় খামারিদের বাচ্চা, খাবার ও ওষুধ সরবরাহ করে করপোরেট প্রতিষ্ঠান। মুরগি বিক্রির উপযোগী হলে ও ডিম দেওয়া শুরু করলে খামারিদের থেকে চুক্তিবদ্ধ মূল্যে কিনে নেয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। এরপর তারা ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করে তা আড়তদারদের সরবরাহ করে। এরপর আড়তদাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। এর ফলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পরোক্ষ চাপে ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত খামারগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর একচ্ছত্রভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এই সিন্ডিকেট। এভাবেই করপোরেট কোম্পানিগুলোর নির্ধারিত মূল্যে ভোক্তা মাংস ও ডিম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

রাজশাহী পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যে জানা গেছে, জেলায় ২ হাজারের বেশি ডিমের খামার রয়েছে। এর ৪০ শতাংশের বেশি এখন কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের অধীনে চলে। পরিস্থিতি এমন তৈরি করা হয়েছে, খামারিরাও কন্টাক্ট্র ফার্মিংয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। পুঁজি কম থাকায় খামার পরিচালনার জন্য তাদের অগ্রিম অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। অন্যথায় খামার বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। আর এ সুযোগে এখন সিন্ডিকেটের দখলে পুরো বাজার ব্যবস্থা।

পবার রনিহাটি গ্রামের খামারি শফিকুল ইসলাম জানান, মুরগির খাবার ও ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে প্রান্তিক অনেক খামারি ডিম উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা উৎপাদনে আছেন, তাদের বেশিরভাগই কন্ট্রাক্ট ফার্মিং সিস্টেমের মধ্যে আছেন। এর ফলে খামারিরা লাভবান হচ্ছেন না। লাভবান হচ্ছেন কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

পবার মুরারিপুরের খামারি আরিফ হোসেন জানান, ৭-৮ বছর ধরে তিনি ডিমের মুরগি লালনপালন করছিলেন। এ বছরের মাঝামাঝিতে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। সবকিছুই এখন সিন্ডিকেটের দখলে। তাদের সঙ্গে সাধারণ খামারিরা টিকে থাকতে পারছেন না। কারণ খামারিরা তাদের কাছে অগ্রিম টাকা নেন। নেন মুরগির বাচ্চাসহ ওষুধের সরবরাহ।

রাজশাহী পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক জানান, আগে ডিমের দাম ১০ থেকে ২০ পয়সা করে বাড়ত। এখন ২ থেকে ৩ টাকা বাড়ে। কেন বাড়ে? এই প্রশ্নের উত্তর সবার জানা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক তৎপরতা না থাকায় সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করছে। পাশাপাশি তারা প্রান্তিক খামারিদের শোষণ করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ডিমের দাম বছর ঘুরে প্রতিপিস ২০ টাকা হতে সময় লাগবে না। এ অবস্থার উত্তরণ জরুরি। আর তা না হলে পোলট্রি শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে রাজশাহী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. জুলফিকার মো. আখতার হোসেন জানান, নীতিগত সিদ্ধান্ত বা বাজারে গিয়ে বাজার মনিটরিংয়ের কাজটা তারা করতে পারেন না। দাম যেন না বাড়ে সেজন্য তারা সচেতন করতে পারেন। কিন্তু নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা তারা নন। আর কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বা করপোরেটের আগ্রাসন নিয়ে তাদের কিছু করার নেই। তবে প্রাণিসম্পদ দপ্তর তাদের সুপারিশগুলো সব সময় তুলে ধরে।

ট্যাগ: