রাজশাহী

রাজশাহীতে অর্থ দিলেই মেলে ভবন নির্মাণের নকশার অনুমোদন

নিউজ ডেস্ক২০ ডিসেম্বর ২০১৬৬ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীতে বাড়ছে বহুতল ভবনের সংখ্যা। গত ২০০৯ সাল থেকে রাজশাহীতে হুহু করে বাড়ছে বহুতল ভবন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই গড়ে উঠছে এসব ভবন। মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’র  (আরডিএ) এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করেই এসব ভবন গড়ে তুলছেন ভবন মালিকরা।

 

পরিস্থিতি এমন যে অর্থ দিলেই যেন মেলে বহুতল ভবনের অনুমোদন। ফলে পরিকল্পিত নগরায়ন গড়ে উঠতে যেমন একদিকে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্ঠি হচ্ছে, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে উঠছে ভবনগুলো।

 

  • আরডিএ কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে মূলত ২০০৯ সাল থেকে বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয় একের পর এক। এর আগে রাজশাহীতে ১০ তলা ভবন বলতে দাঁড়িয়ে ছিল নগরীর সিএন্ডবি মোড় এলাকায় অবস্থিত জীবন বীমা করপোরেশনের ভবনটি। কিন্তু এই কয় বছরের ব্যবধানে সেখানে ১০ তলা ভবনের সংখ্যা অন্তত ৫০টি।

 

নগর ভবন থেকে শুরু করে আশেপাশের আরো ৪টি এবং সাহেব বাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে ১০টি, আলুপট্টির মোড়, লক্ষীপুর মোড়, সাগরপাড়া, উপশহর, বর্ণালীর আমবাগান, তেরোখাদিয়া, শিপাইপাড়া কাজীহাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব ভবন। আর ১০ তলার নিচে এবং ৫ তলার উর্ধে ভবনের সংখ্যা এখন কমপক্ষে ১০০টি।

 
আরডিএ কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য আরো জানা গেছে, ২০১৩ সালে রাজশাহী নগরীতে মোট ৫১৬টি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এক তলা থেকে ৫ তলা পর্যন্ত ৫৬৫টি এবং ৬ এর অধিক তলা ভবন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৩৫টি। ২০১৪ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৫০২টি। এর মধ্যে ৪৮৬টি এক থেকে ৫ তলা ভবন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ৬ এর অধিক তলা ভবন অনুমদোন দেওয়া হয়েছে ৩৫টি।

 

  • গত ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৩৫৪টি ভবনের। এর মধ্যে এর মধ্যে ৩৩৬টি এক থেকে ৫ তলা ভবন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ৬ এর অধিক তলা ভবন অনুমদোন দেওয়া হয়েছে ৩৩টি। 

 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর প্রতিটি ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য আরডিএর’র এক অথরাইজপ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নগর পরিকল্পকসহ বিভিন্ন দপ্তরে গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা। আর টাকা দিলেই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেও মেলে নকশার অনুমোদন।

 

  • আবার মাস্টার প্ল্যান লঙ্ঘন করেও কখনো কখনো দেওয়া হয় ভবনের অনুমোদন। পরবর্তিতে সেখানে বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারকে গুনতে হয় ক্ষতিপূরণ বাবদ অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা।

 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী গৌরহাঙ্গা-সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ২০০১ সালে। এই সড়ক প্রকল্পটি ২০০৫ সালের জুনে অনুমোদিত নগরীর মাষ্টারপ্ল্যানেও উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে সড়ক পথে নতুন করে কোনো আবাসিক ও বাণিজ্যিক ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদনের সুযোগ ছিল না। কিন্তু আরডিএর অথরাইজড অফিসার এই ভবন নির্মাণের জন্য ২০০৫ সালের ২২ ডিসেম্বর ছয়তলার একটি নকশা অনুমোদন করে দেন।

 

  • পরে আরও পাঁচতলা নির্মাণ করা হয়। রাস্তাটির প্রসস্তকরণ কাজ করতে গিয়ে ২০০৯ সালে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। তবে ভবন ভাঙতে গিয়ে অতিরিক্ত চার কোটি তিন লাখ টাকা ক্ষতিক্ষূরণ দেওয়া হয় মালিককে। আবার ইমারত নির্মাণের ক্ষতিপুরণ বাবদ ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা  দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, নগরীর নগরীর সাহেব বাজার জিরোপয়েন্ট এলাকায় আটতলা ভবন নির্মাণের জন্য রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) থেকে নকশা অনুমোদন নেন জমির মালিক সাজ্জাদ হোসেন।

 

২০১২ সালে এ নকশা অনুমোদন করা হয়। এতে শর্ত ছিল ভবনের সামনে এক দশমিক ৫০ মিটার এবং পেছনে ও উভয় পার্শ্বে এক মিটার করে জায়গা ছেড়ে নির্মাণ কাজ করতে হবে। তবে ভবন মালিক সাজ্জাদ হোসেন ভবনের সামনে এক মিটার জায়গাও ছাড়েননি। আরডিএর নিদের্শনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অনুমোদিত নকশার বিচ্যুতি ঘটিয়ে একেবারে ফুটপাত ঘেঁষে একে একে আট তলার স্থানে তিনি ১১ তলা অট্টলিকা গড়ে তোলা হয়।

 

২০১৩ সালের ২৩ জুনের মধ্যে অবৈধ নির্মাণকৃত অংশটি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলার জন্য নির্দেশ দেয় আরডিএ। কিন্তু অদ্যবধি এই অবৈধ অংশটি ভেঙে ফেলা হয়নি আরডিএর অসাধু কর্মকর্তাদের কারণেই। মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে এই ভবনটি পরে বৈধকরণ করা হয় বলেও নিশ্চিত করেছেন আরডিএর একাধিক সূত্র।

 

  • একই কায়দায় নগরীর শত শত ভবন মালিকের নিকট থেকে উৎকোচ আদায় করে অবৈধ অংশের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 
এর বাইরে নিয়মবর্হিভ’তভাবে দেওয়া হয়েছে নকশার অনুমোদন। বিধিমালা মতে, যেখানে তিন তলার ওপরে ভবন নির্মাণের সেখানেও দেওয়া হয় ৭-৮ তলা ভবনের অনুমদোন। আবার আড়াই কাঠা মাটিতেও দেওয়া হয়েছে ১২ তলা ভবনের অনুমোদন।

 

  • বহুতল ভবনে বাধ্যতামূলক বাড়ির নিচ অংশে গ্যারেজ থাকার নিয়ম থাকলেও সে নিয়ম লঙ্ঘন করেও গড়ে উঠেছে শতশত ভবন। এসবের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি আরডিএকে। তবে নোটিশ দেওয়ার পরে আরডিএর অসাধু কর্মকর্তারা শুধু নিজেদের পকেট পূরণের ব্যস্ত থেকেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকেই।

 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর উপশহর এলাকার বাসীন্দা বলেন, তার পৌনে কাঠা জমির ওপরে ১০ তলা ভবনের নকশার অনুমোদন চাইতে গেলেই আরডিএ’র অতরাইজড কর্মকর্তা আবুল কালাম আজদ মোটা অংকের অর্থ দাবি করে বসেন। এতে তিনি রাজি না হওয়ায় দিনের পর দিন তাঁকে ঘুরাতে থাকেন ওই কর্মকর্তা। শেষে প্রায় দুই লাখ টাকার বিনিময়ে জোটে ভবনের নকশার অনুমোদন।

 
নগরীর দরিখোরবনা এলাকার আরেক ব্যক্তি বলেন, তার বাড়ির পাশে রাস্তা দিয়ে গাড়ী যাতায়াতে জায়গা না থাকায় ৭ তলা ভবনের নকশা অনুমদোনে বাধ সাধেন আরডিএ’র অথরাইজড কর্মকর্তা। পরে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ওই নকশাটির অনুমোদন করে নেন তিনি। দবে ওই অর্থের পরিমাণ জানাতে চাননি ভবন মালিক।

 

  • সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ওই ভবনটির পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে কোনো মতে রিকশা-ভ্যান চলাচল করতে পারে। অথচ ৮ ফিটের নিচের রাস্তার পাশে তিন তলার ওপরে ভবনে নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার কথা নয় আরডিএ’র। কিন্তু এই নিয়ম লঙ্ঘন করে নগরীতে অন্তত শতাধিক ভবনের অনুমোদন দিয়েছেন আরডিএ’র অথরাইজড কর্মকর্তা।

 
এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অথরাইজড কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘নিয়মের মধ্য থেকেই ভবনের নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো অনিয়ম আমরা করিনি। তবে ভবন মালিকরা পরে ভবন করতে গিয়ে হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন। আমরা সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মামলাসহ নোটিশও করেছি।’

 
আরডিএর’র চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ জানান, ‘কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে সেটি তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কাউকে ভবন নির্মাণের সঙ্গে অনিয়মে জড়িত দেওয়া হবে না।’

স/আর