রাজশাহী

রাজশাহী হাসপাতালে ৬০ ওয়ার্ডের ২১টিতেই শূন্য অধ্যাপক পদ, ব্যাহত চিকিৎসাসহ প্রশিক্ষণ

নিউজ ডেস্ক২২ জুলাই ২০২৫৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৬০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২১টি ওয়ার্ডেই শূন্য বিভাগীয় প্রধান বা অধ্যাপক (বিশেষজ্ঞ) চিকিৎসক। এতে রোগীদের চিকিৎসা সেবা এবং ইন্টার্নদের শিক্ষণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বলা যায় মারাত্মক সঙ্কটের মুখে পড়েছে চিকিৎসাসেবা। এ পদগুলো পূরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে একাধিবার চিঠি দেওয়া হলেও সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে হাসপাতালের রোগী ও চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাঝেও রয়েছে অসন্তোষ। এছাড়াও আরও দুটি ওয়ার্ডে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দুজন অধ্যাপক অবসরে যাবেন। তখন এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২৩ জনে। সর্বশেষ গতকাল অবসরে গেছেন হাসপাতালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ড কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্র মতে, উত্তরবঙ্গের চিকিৎসা ক্ষেত্রে রাজশাহী একটি অন্যতম হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত। এমনকি দক্ষিণ বঙ্গেরও, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা জেলা থেকেও রাজশাহী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন হাজার রোগী। প্রতিদিন গড়ে এ হাসপাতালে বর্হিবিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয় ৫ হাজার রোগীকে। আর ভর্তিকৃত রোগী থাকে গড়ে তিন হাজার। কাগজে-কলমে এ হাসপাতালটি ১২শ শয্যার হলেও সেখানে জনবল রয়েছে ৫০০ শয্যার। এতে করে এমনিতেই চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসব নার্সদের। এরই মধ্যে ৬০টি ওয়ার্ডের ২১টিতেই বিভাগীয় প্রধান বা অধ্যাপক পদ শূন্য থাকায় চিকিৎসাসেবা আরও চরম সঙ্কটের মুখে পড়েছে।

হাসপাতাল সূত্র মতে, রামেক হাসপাতালের সার্জারি, ইউরোলজি, বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি, নিউরো সার্জারী, শিশু সার্জারী, ক্লিনিক্যাল নিউরো সার্জারী, অর্থ্যােপেডিক সার্জারী, চক্ষু, নাক-কান-গলা ও নেক সার্জারী, রিউমোটলজি, হেমাটলজি, হেপাটলজি, গ্যাস্ট্রএন্টারোলজি, নিউরো মেডিসিন, ফিজিক্যাল মেডিসিন, মানসিক ব্যাধি, ডার্মাটলজি, নিওনেটলজি, পেডিয়াটিক হেমাটলজি এ্যান্ড অনকোলজি ও রিমোভেবল অর্থোপেডিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বা অধ্যাপক পদ শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এরই মধ্যে গতকাল রবিবার সর্বশেষ অবসরে গেছেন কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক পদ শূন্য হয়।

এছাড়াও আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর অবসরে যাবেন রেডিও থেরাপী এবং ৩০ ডিসেম্বর অবসরে যাবেন রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের অধ্যাপক। ফলে আরও দুটি পদ শূন্য হবে দ্রুতই। কিন্তু এসব পদ পূরণে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে সর্বশেষ গত ১৫ মে চিঠি দিয়ে এসব পদ পূরণের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফএম শামীম আহমেদ। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। ফলে অধ্যাপক শূন্য হওয়া ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসাসেবা এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এমনকি এফসিপিএস কোর্স সম্পন্ন করতেও মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

রামেক হাসপাতাল সূত্র আরও জানায়, ইন্টার্ন চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ ছাড়াও এখানে রয়েছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও মিডলেভেল চিকিৎসদের জন্য এফসিপিএস কোর্স। এ দুটি বিষয়ে সার্বক্ষণিক ৩০০ জন চিকিৎসক অংশ নেন। কিন্তু ২১টি ওয়ার্ডে শূন্য রয়েছে অধ্যাপক পদ শূন্য থাকায় তাঁদের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করতে পারছেন না ঠিকমতো।

হাসাপাতালের নিউরো মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসারত রোগীর স্বজন আসগর আলী বলেন, ‘বড় স্যাররা তো দিনে একমাত্র একবার আসেন। রোগীর চিকিৎসা ঠিকমতো হয় না। যা করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা করেন।’

হাসপাতালের নিইরো সার্জারি ওয়ার্ডের রোগীর স্বজন আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আমার রোগীর অপারেশন লাগবে। গত সপ্তাহে হবে বলেছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু হয়নি। এখন বলছেন সামনে সপ্তাহে করাবেন। সিরিয়াল নাকি পাইনি আমার রোগী।’

জানতে চাইলে এ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফএম শামীম আহমেদ বলেন, ‘আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর পরেও ২১টি ওয়ার্ডে অধ্যাপক বা বিভাগীয় প্রধান শূন্য থাকায় চিকিৎসাসেবাতেও মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। এর ওপর জুনিয়র এবং মিডলেভেলের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ এবং এফসিপিএসের সঙ্কট তৈরী হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে অবগত করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ফলাফল আসেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিজ্ঞ চিকিৎসক। অধ্যাপকগণদের জ্ঞানের ভান্ডার জুনিয়র বা মিডলেভেলের চিকিৎসকদের চেয়ে অবশ্যই ভালো হবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে মুমূর্ষু রোগীদের সেবার ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এসব পদই যদি শূন্য থাকে, তাহলে উন্নতমাণের চিকিৎসাসেবা সঠিকভাবে হবে না এটাই বাস্তবতা। তার পরেও আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।