নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রাজশাহী অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্সের বড় একটা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন সদ্য সাবেক সহকারী পরিচালক (এডি) আব্দুর রশিদ। তাঁর কথামতো ঘুষ লেনদেন না হলেই তিনি আবেদনকারীর ফাইল আটকে রাখতেন। পরে টাকা দিলে সেই ফাইল ছাড় হতো। না দিলে পড়ে থাকতো। এ নিয়ে রীতিমতো তাঁর সঙ্গে অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে একটা বিরোধও তৈরী হয়েছিল ভিতরে ভিতরে। শেষ পর্যন্ত তিনি রাজশাহী থেকে সিলেট বিআরটিএ’র বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি হয়ে চলে গেলে ভেঙ্গে যায় সেই সিন্ডিকেট। তবে এখনো আছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি। এখনো অর্থ না দিলে মেলে না ড্রাইভিং লাইসেন্সের সনদ বা স্মার্ট কার্ড। গত কয়েকদিন ধরে রাজশাহী বিআরটিএ অফিসে সরেজমিন অনুসন্ধানে এমন সব তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজশাহী বিআরটিএ সূত্র মতে, এ অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্স, লাইসেন্স নবায়ন, গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন, রেজিস্ট্রেশন, রেজিস্ট্রেশন নবায়ন, ফিটনেস নবায়নসহ যানবাহন সংক্রান্ত নানা সেবা দেওয়া হয়। শুধুমাত্র গড়ে প্রতিদিন অনলাইনে একশ আবেদন জমা পড়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য। এর বিপরীতে সপ্তাহে এক থেকে দুইদিন পরীক্ষা নেওয়া হয়। আবেদনকারীদের মোবাইলেই পরীক্ষার দিন ধার্য করে দেওয়া হয়। এর পর আবেদনকারীরা পরীক্ষা দিতে এলে প্রথমে তাঁদের বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করা হয়। এরপর লিখিত পরীক্ষা শেষে প্র্যাক্টিকেল (গাড়ি চালিয়ে) ও ভাইভা নেওয়া হয়। এই পরীক্ষায় টিকে গেলেই মেলে গাড়ি চালানোর সনদ। তবে এখানেই যতসব বাধার শিকার হতে হয় চালকদের। ঘুষ না দিলে এই পরীক্ষায় বার বার অকৃতকার্য দেখানো হয়। অথবা কাগজপত্রে ত্রুটি আছে বলে ফাইল আটকে রাখা হয়। আর এর জন্য বড় একটি সিন্ডিকেট কাজ করে রাজশাহী বিআরটিএতে। আগে সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহাদত আলী শাহুর নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেটটি কাজ করত। এখন বিআরটিএ অফিসের সামনে সরকারি খাস জায়গাতে গড়ে ওঠা তিনটি কম্পিউটার দোকান থেকে নিয়ন্ত্রণ হয় এই সিন্ডিকেটের ব্যবসা। এমনকি এখানেই মেলে চিকিৎসকদের সত্যায়ন।

বিআরটিএ সূত্র মতে, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার জন্য ৫ সদস্যের একটি পরিচালনা বোর্ড আছে। এই বোর্ডের সভাপতি হলেন রাজশাহী জেলা প্রশাসকের মনোনীত প্রতিনিধি। সদস্য সচিব বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক এবং তিন সদস্য হলেন সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি, রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপারের একজন প্রতিনিধি ও রাজশাহী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের পাওয়ার বিভাগের ইন্সট্রাক্টর। পরীক্ষা শেষে এই পাঁচ সদস্যের কমিটি অনুমোদন দেওয়ার পরে মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স।
বিআরটিএ সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল রাজশাহীতে সহকারী পরিচালক (এডি) হিসেবে যোগদান করেছিলেন আব্দুর রশিদ। তিনি আসার পর থেকেই আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর শাহাদত আলী শাহুর ছত্রছায়ায় ওই কমিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে বিআরটিএ’র নীতিমালা অনুযায়ী যেহেতু কমিটির কোনো পদেই সহকারী পরিচালক থাকতে পারবেন না, সে কারণে পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হোন আব্দুর রশিদ। কিন্তু কমিটির অনুমোদন থাকলেও অনলাইনে আবেদনকারীর সমস্ত ফাইল পর্যবেক্ষণ করে পাশ করার দায়িত্ব থাকে সহকারী পরিচালকের ওপর। আর সেখানেই তখন তিনি খবরদারি করতে শুরু করেন।
বিআরটিএ সূত্র মতে, যেসব আবেদনকারীর অর্থ আব্দুর রশিদ পেতেন না সেসব ফাইল তিনি কখনো ইচ্ছে করে আবার কখনো নিয়মের মধ্যে থেকেই আটকে দিতেন। তবে টাকা পেলে সব ফাইলই তিনি ছেড়ে দিতেন। আর এ নিয়ে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে রীতিমতো দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অফিসের উচ্চমাণ সহকারী ফরিদ উদ্দিনকে দিয়ে ঘুষ-বাণিজ্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার পরেও সুবিধা করতে না পেরে এক পর্যায়ে আব্দুর রশিদ নিজেই তদবির করে সিলেট বিআরটিএ অফিসের সহকারী পরিচালক হিসেবে বদলির চেষ্টা করেন। তবে তাঁকে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে বদলি করা হয় গত ডিসেম্বরে। যেহেতু বিভাগীয় অফিসে তেমন কোনো কাজ নাই বা ঘুষ-বাণিজ্য তেমন নাই, সে কারণে আব্দুর রশিদ বদলি হওয়ার পরেও রাজশাহীতেই পড়ে থাকেন।
শেষ পর্যন্ত গত ২২ এপ্রিল অনেকটা জোর করেই রাজশাহী থেকে বিতাড়িত করা হয় আব্দুর রশিদকে। বিআরটিএর রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচারকের নির্দেশে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আব্দুর রশিদের স্থলে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় মোটরযান পরির্দশক আবুল কালাম আজাদকে।
একাধিক বিশ^স্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাজশাহীতে থাকাকালীন সহকারী পরিচালক আব্দুর রশিদ ভারি যানবাহনের ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ৮-১০ হাজার, হালকা লাইসেন্সের জন্য ৫-৮ হাজার এবং মোটরসাইকেল চালানোর লাইনেন্সের জন্য দেড় থেকে তিন হাজার টাকা ঘুষ আদায় করতেন। একটি সিন্ডিকিটের মাধ্যমে এই অর্থ আদায় হতো। এর অন্যতম নিয়ন্ত্রণ ছিল সাবেক কাউন্সিলর শাহাদত আলী শাহু। তবে এখন ওই সিন্ডিকেটটি ভেঙে নতুন করে আরও কয়েকটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করেন একাধিক দালালচক্র। রাজশাহী বিআরটিএ অফিসের সামনে কম্পিউটারের দোকান খুলে অধিকাংশ ঘুষ-বাণিজ্য লেন-দেন করে এসব দালাল চক্র। এর বাইরেও আরও কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি জড়িত আছে এ চক্রের সঙ্গে। তাদেরকে অর্থ দিলেই চিকিৎসকের নিকট থেকে যে সত্যায়ন করতে হয়, সেটিও ওইসব কম্পিউটারের দোকানে বসেই করা হয়।
আবু বাক্কার নামের একজন জানান, তিনি বিআরটিএতে তার পরিচিত এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসন্সের জন্য আবেদন করে পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন। তার পরেও তার ফাইল আটকে রেখেছিলেন সাবেক সহকারী পরিচালক আব্দুর রশিদ। সামান্য একটা কাগজে ভুল ধরে তিন মাস তার ফাইল আটকে রাখা হয়েছিল। পরে তিন হাজার টাকা দিয়ে সেই ফাইল ছাড় করান তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাক চালক বলেন, ‘আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। টাকা ছাড়া ফাইল কোনোভাবেই পাশ করানো যায়নি। আমরা গরিব মানুষ এতো টাকা দিতে ধার-দেনা করতে হয়েছে। ট্রাক-বাস চালকদের নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স বা নবায়ন করতে ৫-১৫ হাজার টাকা ঘুষ না দিলে কোনো ফাইলই পাশ হয় না।’
তবে এসব বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাবেক সহকারী পরিচালক আব্দুর রশিদ বলেন জানতে চাইলে সাবেক সরকারি পরিচালক আব্দুর রশিদ বলেন, আমি শাহু নামের কোন কাউন্সিলরকে চিনি না। তার সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। আমি রাজশাহীতে যোগদান করার কিছু দিন পরে আন্দোলন শুরু হয়। এরপর আমি অফিসটাকে একটা সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। আমি কোন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। বিগত এক বছরের কল লিস্ট বা মেসেজ লিস্ট এই ধরনের কোন কিছুতেই আমার কারো সঙ্গে যোগাযোগেন কোন প্রমাণ পাওয়া যাবে না।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন পরীক্ষার বিষয়টি আরো স্বচ্ছতা আনার জন্য আমি বরং উর্দ্বধন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখেছি। কাজেই পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণ বা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টার অভিযোগটি সঠিক নয়।
স.আর









