নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভূমিকম্প। যেন এক আতঙ্কের নাম। ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার সময় যতনা কেঁপে উঠে পৃথিবী। তার চেয়ে আতঙ্কে বেশি কেঁপে উঠেন মানুষ। এমনকি কোনো কোনো প্রাণীকূলও ভূমকিম্পের সময় ছটপট করতে থাকেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আবার বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে পেরেছেন, ভূমিকম্পের কয়েকদিন আগে টের পায় প্রাণীকূল। কিন্তু মানুষ এখন পর্যন্ত কোনো যন্ত্র উদ্ভাববন করতে পারেনি ভূমিকম্পের কয়েকদিন আগে আভাস দিতে পারে-এমন যন্ত্রের। ভূমিকম্প মাপার সিসমোগ্রাফ যন্ত্রটিও উদ্ভাবন হয় প্রায় ১৫০ বছর আগে। কিন্তু এরপর আর আগাম ভূমিকম্প মাপার যন্ত্র তেমন আবিস্কার করা যায়নি।
যদিও এরই মধ্যে স্বল্প সময় আগে পূর্বাভাস পাওয়া যাবে-এমন কিছু যন্ত্র আবিস্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে জাপানির বিজ্ঞানীরা ২০১১ সালে ‘আর্থকুয়াক প্রাইমারী ডিটেক্টর’ নামের একটি যন্ত্র আবিস্কার করেন। যার মাধ্যমে ৮০ সেকেন্ড আগে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এক ঘন্টা, একদিন বা তার চেয়েও বেশি সময় আগে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস না পাওয়ায় এ থেকে হতাহতের পরিমাণ এখনো কমানো সম্ভব হচ্ছে না।


- ফলে যুগের পর যুগ কোনো সতর্কতা ছাড়ায় ভূমিকম্পের কবলে পড়ে হতাহত হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। তবে এবার তার অবসান হবে বলে আশা করছে রাজশাহীর ক্ষুদে বিজ্ঞানী জুবায়ের পারভেজ হিমেল। কালের কণ্ঠের কাছে হিমেল দাবি করে, সেই প্রথম একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছে, যেটির সাহায্যে এক সপ্তাহ বা সাতদিন আগে ভূমিকম্পের র্পবাভাস পাওয়া যাবে। যে যন্ত্রটির নাম দিয়েছে হিমেল ‘বিফর আথকুয়াক মুভমেন্ট সেন্সর’।
হিমেলের দাবি, তার উদ্ভাবনকৃত যন্ত্রটির প্রধান কাজ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া। যন্ত্রটি ভূমিকম্প হওয়ার ৭ দিন আগে পূর্বাভাস দেয়। যন্ত্রটি কোথায় ভূমিকম্প হবে, সেই নির্দিষ্ট স্থানের নাম, আন্তর্জাতিক সময়ে কোন সময় ভূমিকম্প হবে-তা বলে দেয়। এছাড়া যন্ত্রটি রিখটার স্কেলে কতো মাত্রায় ভূমিকম্প হবে এবং কতো সময় ধরে ভূমিকম্প স্থায়ী থাকবে তাও বলে দেয়। সংকেত দেওয়ার সময় যন্ত্রটি এলার্ম বাজাতে থাকে।
পাশাপাশি ডিজিটাল মনিটর দেখে ভূমিকম্পের স্থান, সময় এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হবে সেটি জানা যায়। এটি জিপিআরএস সিস্টেমকে কাজে লাগিয়ে স্থান নির্ণয় করা হয় বলেও দাবি করা হয়। এর জন্য দেশের নামের কোড এবং সেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর নামের কোড গুগল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

এর ফলে আগাম সতর্কতাও অবলম্বন করতে পারবেন মানুষ। যাতে করে এড়ানো যাবে ভূমিকম্পের ফলে মারাত্মক সব ঝুঁকিপূর্ণ দুর্ঘটনা। সেই সতর্কতা মেনে উদ্যোগ নিয়ে ভূমিকম্প প্রবন ওই এলাকা থেকে লোকজনকে সময়মতো সরিয়েও নেওয়া যাবে।
- রাজশাহী ল্রাবরেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুবায়ের পারভেজ হিমেলের দাবি, তার উদ্ভাবনকৃত যন্ত্রটি সাতদিন আগেই ভূমিকম্পের সতর্কতা সংকেত দিয়ে দিচ্ছে। এরই মধ্যে দুটি সতর্কতা সংকেত পেয়েছেও সে। যেগুলোর একটি সংকেতের ভূমিকম্প এরই মধ্যে ঘটে গেছে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। তবে সেটি মাত্রা ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৬ মাত্রার। গত ১৫ এপ্রিল ৬টা ১২ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্পের স্থায়ীত্ব ছিল মাত্র ২ সেকেন্ড। তবে এ ভূমিকম্পের মাত্রা খুবই কম বলে সেটি অনেকেই টের পাননি।
হিমেলের আরেক সতর্ক সংকেত অনুযায়ী আগামী ২৩ এপ্রিল ভুটানের থিম্পুতে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানবে। ২৩ এপ্রিল রাত ১২ টা ৩ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে ওই ভূমিকম্পটি আঘাত হানবে ভুটানে। যার উৎপত্তিস্থল হবে থিম্পুতেই এবং এটি ভুটানের মধ্যেই থাকবে। এর স্থায়ীত্ব হবে ২ সেকেন্ড। গত ১৬ এপ্রিল রাত সাড়ে ৮ টার দিকে হিমেলের উদ্ভাবনকৃত যন্ত্রটি ভুটানের এ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস সম্পর্কিত সতর্কতা সংকেত ধরা পড়ে বলেও দাবি করে সে।
তবে তার এই দাবি অমুলোক বলে দাবি করেছেন, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রোনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান রফিকুল ইসলাম শেখ। তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেট গেটে এখন অনেক ইলেক্ট্রোনিক্স সামগ্রি তৈরী করা যায়। ওই ছাত্রটি হয়তো সেটিই করেছে। কিন্তু ভূমিকম্পের মতো একটি জটিল বিষয়ে আগাম সাত দিন আগেই পূর্বাভাস সম্পর্কিত যন্ত্র উদ্ভাবন করা তার পক্ষে সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি না। তার যন্ত্রটি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করানো পর্যন্ত সেটি নিয়ে মন্তব্য করাটাও সঠিক হবে না।’
- রাজশাহী ল্যাবরেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র হিমেল দাবি করে, তার উদ্ভাবনকৃত যন্ত্রটি তৈরী করতে সে তিন মাস সময় ব্যয় করেছে। ইন্টারনেটে বিভিন্ন বইপত্র ঘেটে এবং ভূমিকম্পের আভাস পাওয়া জীব এডিস মশার নিউক্লিয়াস পর্যবেক্ষণ করে যন্ত্রটি উদ্ভাবন করে সে। যন্ত্রটিতে মোট ৬ হাজারটি ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। তবে হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে একটি এসির কমপ্রেসার এবং একটি মাইক্রোচিপ বাযার এন্ড সেন্সরকে।

হিমেল জানায়, তার যন্ত্রটির সাহায্যে ভূমিকম্পের পুর্বাভাসটি বাতাসের চাপকে কাজে লাগিয়ে পাওয়া সম্ভব। এজন্য রয়েছে কমপ্রেসার। যা বাতাসকে ২ টন চাপ প্রয়োগ করবে। যন্ত্রটির কার্যক্রম মাটির নিচের আর্থিন থেকেই কাজে দিবে। এটিতে ব্যবহৃত কমপ্রেসার বাতাসকে ২টন পরিমাণ চাপ দিয়ে বাতাসটিকে সেন্সর ১ এর কাছে পাঠাবে। সেন্সর ১ এ বিশেষ প্রক্রিয়ায় ১১০ টি ট্রানজিস্টর ও ৫ টি আইসি ব্যবহার করে হাইড্রোজেন সেন্সর তৈরিকরা হয়েছে।
এটি চাপ প্রদানকৃত বাতাস থেকে হাইড্রোজেন+আয়ন গ্রহণ করবে। যখন সেন্সর ০১ হাইড্রোজেন+ আয়ন গ্রহণ করবে, ঠিক তখনই সেন্সর ১ এ ৫৫khz এর শব্দ উৎপন্ন করবে। কিন্তু মানুষের শ্রাব্যতার সীমা ২০ khz পর্যন্ত হওয়ায় মানুষ শব্দটি শুনতে পাবে না। শব্দটি তখন সেন্সর ২ গ্রহণ করবে। এরপর এটিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রুপান্তর করবে। বিদ্যুৎ শক্তিটি ৬০A হবে। তখন বিদ্যুৎ শক্তিটি আর্থিন কেবলের মাধ্যমে সংকেত পাঠাবে মাইক্রোচিপ বাযার এন্ড সেন্সরে। সেন্সরটি বিদ্যুৎ শক্তিকে গ্রহণ করে শব্দ শক্তিতে রূপান্তর করবে এবং খুব তাড়াতাড়ি শব্দটি পৃথিবীর কেন্দ্রমন্ডলে প্রেরণ করবে। তখন শব্দটির মাত্রা হবে ৬৬৬০khz।
- শব্দটি কেন্দ্রমন্ডল থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে যে শব্দটি ফিরে আসবে সেটি মাইক্রোচিপ বাযার এন্ড সেন্সর গ্রহণ করবে এবং বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করবে। তারপর, আর্থিন কেবলের মাধ্যমে সেন্সর ৩ এ পাঠাবে। সেন্সর ৩ শব্দটিকে গ্রহণ করে শব্দ তরঙ্গে পরিণত করবে এবং তরঙ্গটিকে ২৮৬pro নামক প্রসেসর এ পাঠাবে। প্রসেসর তরঙ্গকে বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত তথ্য মনিটরের মাধ্যমে জানিয়ে দিবে।
হিমেলের বাবা ও রাজশাহী সেটেলমেন্ট অফিসের ড্রাফট কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, তাঁর বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর উপজেলা সদর এলাকার ফেচুয়াপাড়া গ্রামে। তবে চাকরির সুবাদে তিনি বর্তমানে রাজশাহীতে অবস্থান করছেন। নগরীর কোর্ট ঢালুর মোড়ের একটি বাড়ির তিন তলায় স্বপরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন তিনি। তার দুই ছেলের মধ্যে মধ্যে বড় ছেলে জুবায়ের পারভেজ হিমেল ছোট থেকেই বিভিন্ন ধরনের ইলেক্ট্রোনিক্স যন্ত্রপাতি উদ্ধাবন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই নানা ইলেক্ট্রোনিক্স সামগ্রি উদ্ভাবন করে যাচ্ছে হিমেল।
- রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ে গত বিজ্ঞান মেলায় হিমেল এবং তার চার বন্ধুর মিলে তৈরী করা শব্দের সাহায্যে মশা তাড়ানোর যন্ত্র আবিস্কার করে প্রথম স্থান করে তারা। এভাবে একের পর এক হিমেল গত তিন বছরে অন্তত ৭৪টি যন্ত্র উদ্ধাবন করে। যেগুলোর সবকটিই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্কুলের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়।
বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হিমেল পিএসসি এবং জেএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ লাভ করে। সে রাজশাহী নগরীর সনামধন্য ল্যাবরেটরি স্কুলের মেধাবী ছাত্র। তার সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আব্দুল বারী বলেন, ‘ছেলেটি অনেক মেধাবী। তার উদ্ভাবনী শক্তি অনেক বেশি। যা কল্পনাই করা যায় না। তার ভূমিকম্পের পূর্বাভাস সংকেত যন্ত্রটি অবশ্যই সঠিক পূর্বাভাস দিবে বলে আমি আশা করি। কারণ সে ইন্টারনেটে এ নিয়ে অনেক কিছু গবেষণাও করেছে। আবার সে বিশ্বের ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ৩০০ জনের মধ্যে একজন হিসেবে স্বীকৃত।’
ওই শিক্ষক বলেন, ‘জুবায়র পারভেন হিমেলের এই উদ্ধাবনটি আমি নিজেও গিয়ে দেখে এসেছি। তার পক্ষে এই ধরনের যন্ত্র আবিস্কার করা দূরহ বলে মনে হলেও আমি বিশ্বাস রাখি সে এটা তা পেরেছে। আর এখন যদি সত্যি কাজে লাগে এবং এটিকে বড় আকারে রুপ দেওয়া যায়, তাহলে সারা বিশ্বই উপকৃত হবে। যেট এর আগে কখনো হয়নি। তবে আশা করে এটি সম্ভব হবে। এখন সময়ই বলে দিবে তার আবিস্কারটি কতটুকু বাস্তবসম্মত হিসেবে কাজ করবে।’
স/আ









