অর্থ ও বাণিজ্য

ব্যাংক লুটেরা খেলাপিদের ‘দৃষ্টান্তমূলক’ শাস্তি দাবি

নিউজ ডেস্ক১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

অবৈধ পন্থায় ব্যাংকের টাকা লুটপাট করা ঋণ খেলাপিদের ‘দৃষ্টান্তমূলক’ শাস্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন-এফবিসিসিআই। তবে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ‘অনিচ্ছাকৃত’ খেলাপি হওয়া সৎ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে নীতিমালা শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

রোববার রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে আগামী বাজেট (২০১৯-২০২০) সামনে রেখে অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এ দাবি জানান। এফবিসিসিআই আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের সুদ হার অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। অন্য সংগঠনগুলোকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সবার কাছে বিষয়টি এফবিসিসিআই উপস্থাপন করেছে। ঋণের উচ্চ সুদ হার থাকলে কোনোভাবেই ব্যবসায়ের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি সম্ভব নয়।

শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখো কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ ব্যাপারে এফবিসিসিআই যথেষ্ট সোচ্চার রয়েছে। অবৈধ পন্থায় যারা ব্যাংকের টাকা লুটপাট করেছে তাদের ‘দৃষ্টান্তমূলক’ শাস্তি চাই। তবে অতীতের রেকর্ড দেখে অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের ক্ষেত্রে উত্তরণমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

৫০০ কোটি টাকার উপরে ঋণ খেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার সমালোচনা করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘বড় অঙ্কের খেলাপিদের জন্য আলাদা স্লাব করে ২০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়া হয়েছে। অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কোনো স্লাব নেই। ছোট উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণও দিতে চায় না।’

ভ্যাট-ট্যাক্স প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন বলেন, নতুন ভ্যাট আইনের কারণে ব্যবসায়ীরা আন্দোলন করেছেন। ঐক্যবদ্ধ থাকার কারণে এটা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নজরে নিয়েছেন এবং তার দূরদৃষ্টির কারণেই ভ্যাট আইন স্থগিত রয়েছে। তবে সব ব্যবসায়ী সঠিকভাবে প্যাকেজ ভ্যাটও দিচ্ছে না। ২৮ হাজার টাকা প্যাকেজ ভ্যাট না দিয়ে অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। যেখানে অন্যায় করা হবে, ব্যবসায়ীরা হয়রানি হবে, সেখানে এফবিসিসিআই ব্যবসায়ীদের পাশে থাকবে। কিন্তু কোনো অসৎ কাজে সমর্থন দেয়া হবে না।

নতুন আইনে ভ্যাটের একক হার ১৫ শতাংশ থাকবে না জানিয়ে তিনি বলেন, গত সপ্তাহে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের সঙ্গে নতুন আইন নিয়ে বৈঠক করেছি। তিনি একটি বিষয় মেনে নিয়েছেন, তা হল সব ক্ষেত্রে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থাকবে না। এটির বিভিন্ন হার হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন বলেন, বর্তমানে বন্দরে পণ্য খালাসে ১৪-১৫টি কাগজ লাগে। সিঙ্গাপুরে চারটি কাগজ লাগে, আমাদের সেখানে ছয়টি লাগতে পারে। এদিকেও সংস্কারের দৃষ্টি দিতে হবে। এ ছাড়া তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে প্রধানমন্ত্রী কতটা গুরুত্ব দেন, এবারের মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে তিনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের মন্ত্রী-এমপি হওয়া দেখে অনেকে হিংসা করেন, কষ্ট পান। অথচ রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। একজন ব্যবসায়ী যে, রাজনীতি করতে পারেন, এটা অনেকে বুঝতে চান না। ব্যবসায়ী যদি সৎভাবে ব্যবসা করেন ওটাই সব থেকে বড় সমাজসেবা। তিনি আরও বলেন, অসৎ ব্যবসায়ী, অনৈতিক মানুষকে আমরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দেখতে চাই না। আমরা দেখতে চাই, রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ফিরে আসুক। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ে স্বচ্ছতা ফিরে আসুক। দুই একজন ব্ল্যাকশিপের (কুলাঙ্গার) জন্য সব ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ভুগতে পারে না।

এর আগে বাজেট সুপারিশ তুলে ধরে বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানেনি অধিকাংশ ব্যাংক। সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দেয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো ব্যাংক তা বাস্তবায়ন করেনি। কয়েক দিন সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দিলেও পরে আবার চিঠি দিয়ে ডাবল ডিজিটে সুদ দেয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে। মূলত খেলাপি ঋণের কারণে সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা সম্ভব না। ঋণ খেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এক অঙ্কে দেয়া সম্ভব।

ক্রোকারিজ ও মেলামাইন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনির হোসেন বলেন, ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেয় না। এখন ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। তার পরও ঋণ পাওয়া যায় না। যারা ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়, ব্যাংক তাদের ঋণ দেয় না। সৎ ব্যবসায়ীদের মূল্যায়ন করা হয় না। আর যারা ব্যাংকের টাকা লুট করে তাদের ঋণ দেয়। খেলাপি ঋণ আদায় করা গেলে ৮-৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এর জবাবে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এফবিসিসিআই’র জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, এফবিসিসিআই ঋণ খেলাপিদের পক্ষে নয়। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এয়ারকন্ডিশন ইক্যুইপমেন্ট ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লুৎফর রহমান বলেন, সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণের সুদ হার বাস্তবায়নে শরিক হয়েছিলাম। এ আন্দোলনে ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের নেতারাও ছিল। কিন্তু আমি ব্যাংক থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিলেও ১৩ দিন পর চিঠি দিয়ে তা ১৪ শতাংশ করা হয়। তবে ওই সংগঠনের এক নেতা ঠিকই অন্য ব্যাংক থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণে নিয়েছে এবং সেটি এখনও ৯ শতাংশই আছে। আমি এর বিচার চাই।

পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব হাজী মো. আবুল কাশেম বলেন, সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর কথা বলা হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সেটা ভোগ করতে পারেনি। এখন ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। এ বিষয়ে এফবিসিসিআইকে শক্ত ভূমিকা নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, যারা ভ্যাট-ট্যাক্স দেয়, কর কর্মকর্তারা শুধু তাদের ট্যাক্স দিতে বলে। আর যারা দেয় না, তাদের কিছু বলেও না। পাইকারি ব্যবসায় ১ শতাংশ মুনাফা না হলেও ১৫ শতাংশ ভ্যাট দাবি করা হয়।

এর জবাবে শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, সরকারি ব্যাংক ছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলো সিঙ্গেল ডিজিটে ব্যাংক ঋণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেনি। এ ব্যাপারে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। আগামীতে এর স্থায়ী সমাধান করা হবে।

এগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মোল্লা শামসুর রহমান শাহীন বলেন, ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ পায় না। অথচ পিকেএসএফ বানানো হয়েছিল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার জন্য। এখন পিকেএসএফ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টাকা না দিয়ে বিভিন্ন এনজিওকে টাকা দিচ্ছে। আর ছোট ব্যবসায়ীরা চড়া সুদ দিয়েও ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছে না।