রাজশাহী

বোন ও বন্ধুর সম্পর্ক মানতে পারেনি রনি

নিউজ ডেস্ক৪ মার্চ ২০১৭৪ মিনিট পড়া

শাহিনুল ইসলাম আশিক:
‘লিজা অনেক ভালোবাসতো বিপ্লবকে। লিজা রাঙামাটির একটি ক্লিনিকে নার্সের কাজ করে। বিপ্লবের জন্য লিজা এক বা দুই হাজার করে টাকাও পাঠাতো। কিন্তু ভাই রনির ভয়ে লিজা বাড়িতে আসলে দেখা করতে পারতো না বিপ্লবের সঙ্গে। কারণ রনি তার বাবা মাকেও মারধর করতো। যদি বিপ্লবকেও মারধর করে এই ভয়ে। হয় তো বা রনি ছোট বোন ও বন্ধুর সম্পর্ক মানে নিতে পারেনি।’

রাজশাহী মহানগরীর কাজলার কেডি ক্লাব এলাকায় গতকাল শুক্রবার ছুড়িকাঘাতে নিহত বিপ্লবের ভাতিজা মো. মিটুল আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিল্কসিটিনিউজকে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমি (ভাতিজা মো. মিটুল) অনেক দিন কাকাকে (বিপ্লব) কাজলা মোড়ের সেফালী ফটোকপির দোকান থেকে টাকা তুলে এনে দিয়েছি। রাজশাহীতে আসলে লিজা লুকিয়ে দেখা করতো বিপ্লবের সঙ্গে। লুকিয়ে বিপ্লবের বাড়িতে দুপুর বা সন্ধ্যায় আসতো রাতে চলে যেতো।

এদিকে নিহত বিপ্লবের বড় ভাই মো. বকুল আলী সিল্কসিটিনিউজকে বলেন, ‘বিপ্লব বিয়ের পরে তেমন কাজ করতো না। তখন লিজা এসএসসি পরীক্ষাও দেয়নি। লিজার শ^শুর এরশাদ আলী টাকা পয়সা খরচ করে এসএসসি ও এইচএসসি পারীক্ষায় পাস করায়। পরে ছেলের বৌ লিজাকে নার্সিংএ ভর্তি করে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, লিজা সেখানে লেখাপড়া শেষে রাঙামাটিতে একটি হাসপাতালে নার্সের চাকরি করে। এর আগে বিপ্লবকে মোটরসাইকেল কিনে দেয়ার জন্য লিজা এক লাখ টাকা দিয়েছিলো। তখন বিপ্লব ‘ওয়াং’ নামের একটি মোটরসাইকেল কিনেছিল। পরে লিজার টাকার প্রয়োজন হলে বিপ্লব সেই মোটরসাইকেল ও একটি মোবাইল বিক্রি করে টাকা ফেরত দিয়েছিলো বলে আমি শুনেছিলাম।

অন্যদিকে, নিহত বিপ্লবের ভাতিজা মো. মিটুল সিল্কসিটিনিউজকে বলেন, রনি ও বিপ্লব খুব ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলো। তারা প্রায় সব সময় এক সঙ্গে থাকতো। বন্ধুত্বের সুবাদে রনির বাড়িতে যাওয়া আশা করতো বিপ্লব। এই যাওয়া আশার মধ্যে বিপ্লব আর লিজার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক দিকে বিপ্লব ও লিজার সম্পর্ক গাড়ো হয় ও অন্যদিকে বিপ্লব ও রনির মধ্যোকার বন্ধুত্বর সম্পর্ক নষ্ট হতে বসে।

তিনি সিল্কসিটিনিউজকে বলেন, যখন লিজা আর বিপ্লবের প্রেমের সম্পর্ক শুরু হয় তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়তো লিজা । আর অগ্রণী মহাবিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতো বিপ্লব। তাদের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক তেমন কেউ জানতো না। এর মধ্যে তারে তিন থেকে চার বছরের প্রেমও হয়। এক দিন লিজা ও বিপ্লব সবার অজানতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পালিয়েও যায় তারা।

মিটুল বলেন, পালানোর কয়েকদিন পরে বিপ্লব লিজাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। এতে লিজাকে বিপ্লবের পরিবারের সদস্যরা মেনে নেয়। কিন্তু রনির পরিবারের লোকজন তা মেনে নেয়নি। বিয়ের কয়েকদিন পরে এক সন্ধ্যায় লিজার বাবা মো. হাবিব বোরকা পড়ে লিজার শ্বশুর বাড়িতে হাজির হয়। লিজাকে  জোর করে তার বাড়িতে নিয়ে যাবেন। কিন্তু লিজা যেতে চায়নি বাবার সঙ্গে। লিজার ভাই রনি বিপ্লবকে বিভিন্ন ভাবে মারধরের চেষ্টা করতো। এমনকি কয়েকবার মারধরও করেছে।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি সিল্কসিটিনিউজকে জানায়, লিজা ও বিপ্লবের মধ্যে প্রায় আট বছর আগে বিয়ে হয়। বিয়ের পরে লেখাপড়ায় ভালো না হওয়া তাকে বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তখন সংসার জীবনে আসে লিজা। বিয়ের কয়েক মাস পরেও বিপ্লবের সংসারে তেমন আগ্রহ না থাকায় নিজের জীবনকে বদলাতে লেখাপড়া শুরু করে লিজা। এর মধ্যে বিপ্লব লিজাকে ছাড়ার কথা বললো। লিজা বিপ্লবকে ছাড়েনি। কারণ লিজা বিপ্লবকে অনেক ভালোবাসতো। তাদের টানা পড়নের মধ্যে চলতে থাকে মাসের পর মাস।

এর মধ্যে লিজা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা ভাবনা শুরু করে। তাই তার পরের বছর রাজশাহী মহানগরীর বিসিএসআইআর ল্যাবরেটরী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। সেখানে লিজা এসএসসি পরীক্ষা পাশ করে। পরে অন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি পাশ করে সংসার জীবনেই। এই সংসার জীবনে লিজা ও বিপ্লবের একটি মেয়ে সন্তান হয়। তার নাম অর্পিতা (৭)। নার্সের পড়াশোনাও শুরু করে লিজা। এর মধ্যে লিজার বাবার বাড়ির সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিলো না। তবে লুকিয়ে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করতো লিজার মা।

এর মধ্যে লিজার নার্সের পড়াশোনা শেষ হলে মা ও লিজা রাঙামাটিতে চলে যায়। লিজা একটি ক্লিনিকে নার্সের কাজ করে ও মা বাড়িতে থাকেন। মাঝে মধ্যে রাজশাহীর বাড়িতে আসতো মা ও লিজা। তখন বিপ্লবের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করতো লিজা। লিজা বর্তমানে রাঙামাটিতে মায়ের সঙ্গে থাকেন।

তবে আজ শনিবার বেলা ১২টার দিকে রনির বাড়িতে গেলে কাউকে পাওয়া যায়নি। তাই এই বিষয়ে পারবারের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাজশাহী মহানগরীর কেডি ক্লাব এলাকায় ভগ্নিপতিকে ছুরিকাঘাত করে। পরে তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। এ হত্যাকাণ্ডের পরে ঘাতক রনি পলাতক রয়েছে।

স/আ