রাজশাহী

বাড়ির চারদিকে পানি, তবুও ভিটে ছাড়তে নারাজ চারখিদিরপুরের বাসিন্দারা

নিউজ ডেস্ক১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:


পদ্মা নদীর মিডিলচর। অথৈই পানিতে নিমজ্জিত চারপাশ। চরের বেশির ভাগ বাড়িতে কোমর পানি। যে বসতবাড়িগুলোতে পানি ওঠেনি সেগুলো চরের সমাতল থেকে চার-পাঁচ ফুট উঁচু। বাড়ির সামনে বাঁশের মাচায় বসে একে অপরের সাথে কথা বলছেন তাহাজান বিবি ও নুরুল ইসলাম দম্পতি। পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। শেষ সম্বলটুকু তলিয়ে গেলে কোথায় যাব, কী করব— এমন চিন্তায় দিন কাটছে এই দম্পতির।

তাহাজান বিবি বলেন, এই চরে সবাই চুলায় রান্না করে। সব ডুবে যাওয়ায় সেই জায়গা নেই। আমাদের গবাদি পশুগুলো শহরে (লোকালয়ে) পাঠিয়ে দিয়েছে। সেখানে অন্যদের গবাদি পশুর সঙ্গে রয়েছে। এই চরে অনেক কষ্ট করে জীবন-যাপন করতে হয়। এখন খাবার পানির খুব অভাব। সব টিউবওয়েলে বানের পানি ঢুকে গেছে। কোনরকম জীবন নিয়ে আছি।

চর খিদিরপুরের এই মিডিলচরে ১৫০ পরিবারের বসবাস। এই চর মিনি সুইজারল্যান্ড হিসেবেও অনেকের কাছে পরিচিত। পদ্মার পানি বাড়ার কারণে এই চরের অধিকাংশ ঘর-বাড়িতে পানি উঠেছে। তাতে করে থাকার জায়গা নেই। এমন পরিস্থিতিতে হাতেগুনা কয়েকটি পরিবার ছাড়া সবাই চর ছেড়েছে। যারা চর ছাড়েনি সেই পরিবারগুলোর সঙ্গে রয়েছে কুকুর-বিড়ালেরা। তাদের অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে।

রাজশাহী পানি উন্নয় বোর্ডের গেট রিডার এনামুল হক বলেন, শুক্রবার (১১ সেপ্টম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় রাজশাহীর বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২৬ মিটার। যা বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৭৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

৫৫ বছর বসয়ী আসাবুদ্দিন বসবাস করেন চরখিদিরপুরে। এই চরে তিনি সাত বছর ধরে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, আগে খিদিরপুর বিএসএফ ক্যাম্পের পাশে বাংলাদেশের সীমান্তে বাড়ি ছিল। সেই চরের বয়স ৫৬ বছর। সেখানে ২৫ বছরের বেশি সময় বসবাস করেছি। সেই চর ভেঙে যাওয়ার পরে তালাইমারী বিজিবি ক্যাম্পের পাশে নদীর চরে বসবাস করেছি। এরপর সাত বছর মিডিল চরে বসবাস করছি।

বাড়ির সামনে চৌকিতে নাতিকে ঘুমপাড়াচ্ছেন সিমা বেগম। তিনি বলেন, এ বছর প্রচুর পানি বেড়েছে। অনেকের ঘরের মেঝেতে উঠে গেছে। ঘরের মধ্যে সাপ ও ব্যাঙ ঢুকে যাচ্ছে। কোথায় তিল ধরনের ঠাঁই নেই। বাড়িতে থাকার কোনো পরিবেশ নেই। আমরাও আগামীকাল চর থেকে লোকালয়ে চলে যাব। গত রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় আমার নাতি আলিফ আলী বেড়া ভেঙে পানিতে পাড়ে গিয়েছিল। পানির ছোট ছোট ঢেউয়ের তোরে মাটি কেটে যায়।

রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের চরখিদিরপুরে ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০০ পরিবারের প্রায় ৭০০ মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। এখানে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুগুলোর খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। মানুষ চর ছাড়ছে। অনেকেই রয়েছে। এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্ধ রয়েছে।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, পদ্মার পানি বাড়লেও রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে এখনো কোনো ঝুঁকি নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজশাহী শহরের পাশে পদ্মার ওপারে ভারত সীমান্তঘেঁষা চরখিদিরপুর ও খানপুরের বেশির ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে খাদ্যসহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধেও উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।