অর্থ ও বাণিজ্য

বাজারে বাড়ছে টাকার প্রবাহ

নিউজ ডেস্ক৫ এপ্রিল ২০১৯৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

বাঙালির সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। এ দিনটিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক মোহনায় মিলিত হন। তিন বছর আগে সরকার বৈশাখী বোনাস ঘোষণা করায় উৎসবে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।

কাক্সিক্ষত এ উৎসবের মাত্র ৯ দিন বাকি। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই প্রস্তুত। ইতিমধ্যে বৈশাখের হাওয়া লেগেছে দেশের অর্থনীতিতে।

উৎসবের কারণে খরচের চাহিদা যেমন বেড়েছে, পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বোনাস দেয়ায় বাজারে টাকার জোগানও বাড়বে।

ফলে বৈশাখকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি। বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক, রকমারি বাঙালি খাবার, কার্ড ও মোবাইলে শুভেচ্ছা বিতরণ, মেলা এবং হালখাতার মধ্য দিয়ে শেষ হবে উৎসব। খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশাখে বিশেষ অফার দিচ্ছে। ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ডে রয়েছে আকর্ষণীয় অফার। বৈশাখের অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট অফার নিয়ে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণা হয়নি। তবে সূত্রের হিসাবে লেনদেনের সম্ভাব্য পরিমাণ হবে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা। ফ্যাশন হাউসগুলোতে বাহারি রং ও ডিজাইনের বাঙালি পোশাকের সমারোহ। নতুন পোশাক কিনতে হাউসগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় ভাড়ছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে নামিদামি শপিংমল পর্যন্ত সবখানেই বৈশাখের ছাপ পড়েছে।

ক্রেতা আকর্ষণে বিভিন্ন কোম্পানি বিশেষ মূল্যছাড় দিয়েছে। গত তিন বছরে অনলাইনে কেনাকাটায় গ্রাহকের আগ্রহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এই উৎসবের মূল আকর্ষণ ইলিশ। বর্তমানে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও বিভিন্ন হিমঘরে (কোল্ড স্টোরেজ) মজুদ করা ইলিশ বাজারজাত শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। পিছিয়ে নেই নিত্যপণ্য, ফুল, মৃৎশিল্প এবং গহনা ব্যবসায়ীরা। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই বৈশাখ ঘিরে জমজমাট।

বাংলা নববর্ষ বরণ করতে প্রস্তুত পার্ক-উদ্যান। পাড়া-মহল্লায় হবে ছোট-বড় নানা অনুষ্ঠান। গ্রামগঞ্জে চলছে অসংখ্য মেলার আয়োজন। শহরের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে বৈশাখী তাঁতমেলা। এসব কর্মকাণ্ড ঘিরে অর্থনীতির লেনদেন বাড়ছে কয়েকগুণ। সবকিছু মিলে বৈশাখকে ঘিরে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায় উৎসব ঘিরে অর্থনীতি গতি পাবে।

 

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পুরো জাতি উৎসবে মেতে ওঠে। অর্থনীতিতে এর একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। কারণ এতে দেশে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। তার মতে, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঠিক রাখতে পারলে এই উৎসব পুরোটাই ইতিবাচক বলা যায়। তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরিজীবী এবং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীও বোনাস পেয়েছেন। বাজারে এই বাড়তি টাকা আসায় কিছু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এতে অভ্যন্তরীণ একটি চাহিদা সৃষ্টি হবে। তবে মূল্যস্ফীতিও কিছুটা বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্যান্য উৎসবের সঙ্গে বৈশাখের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, ঈদ, কোরবানি, পূজা এবং বড়দিনের উৎসব নির্দিষ্ট ধর্মের জন্য। কিন্তু বৈশাখ হল সর্বজনীন বাঙালির উৎসব। অন্যান্য উৎসবে বিদেশি পণ্যের ব্যবহার বেশি।

বৈশাখে ৯০ শতাংশই দেশের পণ্য ব্যবহার হয়। এছাড়া বৈশাখ শুধু ঘরোয়া উৎসব নয়। হোটেল রেস্তোরাঁ এমনকি পাঁচ তারকা হোটেলে জমজমাট আয়োজন থাকে। এছাড়া ঈদে মানুষ গ্রামে চলে যায়। কিন্তু বৈশাখে যে যেখানে থাকে, সেখানেই উৎসব পালন করে। ফলে এ উৎসব এককেন্দ্রিক নয়। বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন কোম্পানি বিশাল ছাড় দিচ্ছে। ব্র্যান্ডের জুতা কোম্পানি বাটা এবং অ্যাপেক্সে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেয়া হয়েছে।

ছাড় রয়েছে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যেও। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে গ্রাহককে ছাড় দিচ্ছে। নির্দিষ্ট শপিংমলে বা অনলাইনে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে সিটি ব্যাংকের আমেরিকান এক্সপ্রেস। এছাড়া ভিসা ও মাস্টার কার্ডেও ছাড় রয়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পর্যটন কোম্পানিগুলো বিশেষ ছাড় দিচ্ছে।

 

কিন্তু আগে এই উৎসব ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। গত এক যুগে তা ব্যাপকভাবে শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। আর তিন বছর আগে সরকার বোনাস ঘোষণা করে এই উৎসবের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২৫ শতাংশ বোনাস পাচ্ছে। এই বোনাসের কয়েকশ’ কোটি টাকা আসবে বৈশাখের বাজারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান নববর্ষের বোনাস দিচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বছরে যেসব কেনাকাটা হয় তার ২০ শতাংশই বৈশাখে। দুই ঈদে মিলে ৬০ শতাংশ। বাকিটা সারা বছর। বৈশাখে শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং ফতুয়া বেশি বিক্রি হয়। এশিয়ার বৃহত্তম মার্কেট যমুনা ফিউচার পার্ক ঘুরে দেখা গেছে, বিপণিবিতানগুলোতে অভিজাত ও মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের জন্য সব ধরনের বৈশাখী সাজ ও পোশাক কিনতে ব্যাপক ভিড়। ব্যস্ত নামিদামি ব্র্যান্ডের শোরুমগুলো। বিশেষ করে আড়ং, অঞ্জনস, দেশীদশ, নবরূপা, মেট্রো, জেন্টালপার্ক, ইনফিনিটি, ক্যাটস আইসহ দেশের শীর্র্ষ ব্র্যান্ডগুলো বৈশাখী পোশাকের পসরা সাজিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের পোশাকে ৫ থেকে ৫০ শতাংশ মূল্যছাড়ে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি দোকানে ঘুড়ি, মুখোশ ও লাল-নীল বাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। এসব শোরুমে ক্রেতারা তাদের পছন্দসই পোশাক কিনতে ভিড় করছেন। যমুনা ফিউচার পার্কে বেচাকেনায় আমেজ চলছে। মেয়েদের জন্য রঙবেরঙের থ্রিপিস, কুর্তি, শাড়ি ও ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবি, ফতুয়া বেশি বিক্রি হয়। আর শিশুদের জন্যও রয়েছে দারুণ সংগ্রহ। গতবারের তুলনায় এবার পোশাকের দাম বেশি হবে না।

রাজধানীর শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন রং ও বাহারি ডিজাইনের পোশাকের পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। রয়েছে মেয়েদের বাঙালিয়ানা সাজের গলার মালা, দুল ব্রেসলেট, চুড়ি ও কারুকাজের হাতব্যাগও। ছেলেদের পোশাকে রয়েছে বিভিন্ন রঙের পাঞ্জাবি, লুঙ্গি ও গামছা। শিশুদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ রাখা হয়েছে ধুতি ও রঙবেরঙের পাঞ্জাবিতে।

ফ্যাশনপ্রেমীদের মার্কেট রাজধানীর বেইলি রোড। সেখানে ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা চরম ব্যস্ত। ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণে সেখানকার সব ক’টি ফ্যাশন হাউস রঙিন করে তুলছেন নানা রঙের বৈশাখী পোশাক দিয়ে। বাহারি রঙের আলপনা করছে নিজ নিজ দোকানের সামনে। কেনাকাটা করতে আসা একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, এই উৎসবটিই ঈদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ঈদের মতো বাজেট করেছেন তিনি। ব্যবসায়ীরা জানান, লাল-সাদা শাড়ি এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লেডিস গ্রাউন্ডের দাম ২ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। তারা বলছেন, আগামী সপ্তাহে মূলত বেচাকেনা হবে। তবে এখনও চলছে। তারা বলছেন, দেশজ বৈশিষ্ট্য ও ধারা বজায় রেখে লাল-সাদার পাশাপাশি উজ্জ্বল রঙের পোশাক উপস্থাপন করা হয়েছে এবার।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সূত্রে জানা যায়, দেশে ছোট-বড় প্রায় ২৬ লাখ দোকান রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার বুটিক ও ফ্যাশন হাউস। বৈশাখকে ঘিরে এরই মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। বুটিক ও ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন ডিজাইনের পোশাক নিয়ে হাজির। দেশের উচ্চবিত্ত শ্রেণী বৈশাখী পোশাকের জন্য বুটিক ও ফ্যাশন হাউসে ভিড় করছেন। অনলাইনে এসব পণ্য ব্যাপক হারে বিক্রি হচ্ছে। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি চাহিদা হচ্ছে ইলিশের। ঢাকার বাজারে এই মাছের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

এদিকে মৃৎশিল্পের বিশেষ কারুকাজ, সরা আঁকা, মিছরির মিষ্টি বানানো, খৈ তৈরি, কাপড় বোনা ইত্যাদি অর্থনৈতিক কাজ উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে। উৎসুক জনতা শহরের পথে পথে বেড়ানো মেলায় ঘোরাঘুরি, মিছরি-মুড়কি, শুকনো সন্দেশ কেনাকাটায় সবার অংশগ্রহণ হয় এক কাতার থেকে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বসেছে বৈশাখী তাঁতবস্ত্রের মেলা। পার্লার ও সোনার দোকানে ভিড়। কিছু প্রতিষ্ঠানের নতুন মিউজিক ভিডিও বাজারে এসেছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এ উপলক্ষে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। রঙিন ম্যাগাজিন এরই মধ্যে বাজারে এসেছে। প্রবাসী স্বজনদের কাছে তাদের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী নববর্ষের উপহার এরই মধ্যে পাঠানো হয়েছে। ফুল ব্যবসায়ীদের মুখে এবার হাসি ফুটবে। কারণ পহেলা বৈশাখে তাজা ফুলের চাহিদা বাড়বে।