সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
অলিগলির বেড়াজালে পুরোটাই আবদ্ধ পুরান ঢাকার ব্যবসা বাণিজ্য। কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ না থাকায় সেখানকার ব্যবসা বাণিজ্য এখন মুখথুবড়ে পড়েছে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, যানজট, জলাবদ্ধতা, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, ঘিঞ্জি এলাকা- এসব কারণে পদে পদে বাধাগ্রস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য। এর যে কোনো একটি উপসর্গ দেখা দিলেই ব্যবসায় নেমে আসে স্থবিরতা। কয়েক সপ্তাহ এর প্রভাব থাকে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড।
সম্প্রতি রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুরিহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর চকবাজার তো বটেই, এর আশপাশের এলাকার ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে নাজিরাবাজার, বংশাল, চকবাজার, উর্দু রোড, নাজিমউদ্দিন রোড, কাপ্তানবাজার, বাংলাবাজার, মৌলভীবাজার, রায়সাহেববাজার, ধোলাইখাল- এসব এলাকার ব্যবসাপাতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। এতে ব্যবসা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর আগে পুরান ঢাকার নিমতলীতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে জানমালের হানি হয়ে সব ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছিল।

পুরান ঢাকার অন্যতম এক সমস্যা সরু অলিগলি। ভোগ্যপণ্যের রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার মৌলভীবাজার, কাপড়ের বড় পাইকারি বাজার হচ্ছে ইসলামপুর, চুড়ি, স্বর্ণালংকার, মনিহারি সামগ্রীর বড় পাইকারি বাজার চকবাজার। চাল ও ফলের পাইকারি বাজার বাবুবাজার, ওষুধের বড় পাইকারি মার্কেট মিটফোর্ড, গাড়ি, সাইকেল ও মোটর যন্ত্রাংশের বাজার বংশাল, ভোজনরসিকদের খাবারের হোটেল নাজিরাবাজার- এ রকম প্রায় সব পণ্যের পাইকারি বাজার রয়েছে পুরান ঢাকায়। কিন্তু এসব বাজারে যাতায়াতের রাস্তাগুলো অত্যন্ত সরু। যে কারণে একটি ট্রাক বা পিকআপ ভ্যান বাজারে ঢুকলে অন্য গাড়ি চলাচলের সুযোগ থাকে না। লেগে যায় যানজট। এ কারণেও পুরান ঢাকার ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্কে আছি। আমরা সব সময় আতঙ্ক নিয়ে কাজ করি। এখানকার মার্কেটগুলোর এমন অবস্থা যে, অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো কিছু ঘটলে মনে হচ্ছে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে বের হতে পারব না। তিনি বলেন, এ ঝুঁকি থেকে আমরা এখন মুক্তি চাই। এজন্য সরকারি উদ্যোগ অনেক জরুরি। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব।
এই এলাকার মার্কেটগুলোর একটি আরেকটির সঙ্গে লাগানো। ভবনের অধিকাংশ সিঁড়ি অপ্রশস্ত। খুপরি ঘরের মতো ছোট্ট দোকানের প্রতিটি পণ্যসামগ্রীতে ঠাসা। বিভিন্ন মার্কেটের ভেতরে হাঁটাচলার রাস্তাগুলোও অপ্রশস্ত। এক সঙ্গে দু’জনের চলাচল করার মতো জায়গা নেই। এছাড়া সেখানকার গা-ঘেঁষা বাড়িগুলো যেন একেকটি মৃত্যুর ফাঁদ। উপরে মানুষ বসবাস করলেও নিচতলা বা আন্ডারগ্রাউন্ডে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল ও মালামালের গোডাউন।
টানা বৃষ্টি হলে পুরান ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় পানি জমে যায়। এতে মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে বাধাগ্রস্ত হয় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড।
মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, যুগ যুগ ধরে মৌলভীবাজার, বেগমবাজার ও চকবাজারে পাইকারি বাজার গড়ে উঠেছে। পুরনো ভবনগুলোর মধ্যেই ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে। সেখানে নেই কোনো অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা। পার্কিংয়ের জন্য নেই পর্যাপ্ত খোলামেলা জায়গা। এছাড়া বেগমবাজার এলাকায় এমন ভবনও আছে, যেখানে কেউ মারা গেলে মরদেহ দড়ি দিয়ে নামাতে হয়। তিনি আরও বলেন, ভবনের ভূগর্ভস্থ তলাগুলো বেআইনিভাবে দোকানপাট ভাড়া দিচ্ছেন মালিকরা। যেখানে রাখা হচ্ছে প্লাস্টিক, কেমিক্যালসহ নানা ধরনের দাহ্যপদার্থ। এতে যে কোনো সময় ভয়ানক পরিস্থিতি ঘটতে পারে। ইতিমধ্যে চুরিহাট্টার ঘটনা পুরান ঢাকাবাসীর চিন্তায় টনক নাড়িয়ে দিয়েছে।
মার্কেটের সামনে জায়গা না থাকায় রাস্তার উপরেই মালামাল লোড ও আনলোড করা হয়। এতেও লাগে যানজটন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মনিহারি বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নাছের বলেন, সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের বলেছি, যাতে তাদের মালামাল নিজ প্রতিষ্ঠানে রাখে ও রাস্তায় মালামাল ওঠানামা করাতে অহেতুক যানজট তৈরি না করে। এছাড়া আমরা কয়েকবার ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় অগ্নিনির্বাপণ মহড়া করেছি। কিন্তু অধিকাংশ ব্যবসায়ী নিয়মকানুন মানতে চান না। তাই আমরা সমিতির পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপে যাব।
অন্যদিকে পুরান ঢাকার বাবুবাজার সেতুর বিপরীত পাশ ঘেঁষে শুরু হয়েছে রাজধানীর বৃহৎ চালের বাজার বাদামতলী। নয়াবাজার থেকে বাদামতলী যাওয়ার রাস্তার শুরুতেই সারি সারি চালের দোকান। দোকানের ভবনগুলো বেশ জরাজীর্ণ। মাথার ওপর ঝুলছে বিদ্যুৎ ও কেবল সংযোগের তার। সেখানকার চাল ব্যবসায়ী মো. আমিরুল বলেন, বাদামতলীতে প্রায় ২শ’ চালের আড়ত আছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে চাল আনা হয়। পরে তা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। তিনি বলেন, ঘিঞ্জি এলাকায় সরু গলি, সারা দিন যানজট লেগেই থাকে। এছাড়া প্রয়োজনীয় অগ্নি নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
চালের আড়ৎ থেকে একটু সামনের দিকে গেলে বাদামতলী ফলের আড়ৎ। বুড়িগঙ্গা নদী ঘেঁষা এসব আড়তে দেশ ও বিদেশ থেকে সব ধরনের ফল আমদানি করা হয়। পরে তা এখান থেকে সরবরাহ করা হয়। সেখানকার জান্নাত ফলের আড়তের কর্মকর্তারা যুগান্তরকে বলেন, এখানকার আড়ৎগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি লাগানো। তাছাড়া বৈদ্যুতিক তার ছড়িয়ে ছিটিয়ে জটলা আকার ধারণ করেছে। আল্লাহ না করুক- একটি আড়তে আগুন লাগলে এখানকার সবটিতে লেগে যাবে। এছাড়া এখানকার রাস্তাগুলোতে সব সময় যানজট লেগে থাকে। কারণ মালামাল ওঠানামা করার কারণে রাস্তার দুই ধারে গাড়ির জটলা হয়।
এদিকে নয়াবাজার এলাকায় রয়েছে কাগজ ও প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবসা। সেখানেও কারখানাগুলোর একই অবস্থা। একটির সঙ্গে আরেকটি লাগানো। আর বৈদ্যুতিক তার এমনভাবে এক কারখানা থেকে আরেক কারখানায় নেয়া হয়েছে, যেন একটি কারখানায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হলে মুহূর্তেই একসঙ্গে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, রমনায় (ফুলবাড়িয়া) হেডকোয়ার্টার ও পলাশী, সদরঘাট, লালবাগ, পোস্তাগোলা, হাজারীবাগসহ পুরান ঢাকায় ছয়টি স্টেশন রয়েছে। তবু এখানে কোথাও আগুন লাগলে সরু গলির কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে অনেক সময় নষ্ট হয়। অনেক দূরে গাড়ি রেখে যাওয়া ছাড়া গতি থাকে না। তার ওপরে নেই প্রয়োজনীয় পানির জোগান।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এখন জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখের মতো থাকে পুরান ঢাকাতেই। আবার দিনের বেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে আনুমানিক আরও দ্বিগুণ মানুষের সমাগম ঘটে এসব এলাকায়।









