সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
তারা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান, আদিবাসী জনগণের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের কাছে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন।
বুধবার (২৯ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ৫ মাস : পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির মূল্যায়ন’ শীর্ষক মতবিনিময়সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় লিখিত বক্তবে নাগরিক নেতা জাকির হোসেন বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। গত ৩ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে আহ্বান জানানো হলেও গত ৫ মাসে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী বহাল থাকায় সরকার আগের নীতির ধারাবাহিকতাই বজায় রাখছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এ সংশয় নিরসনে ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন তিনি। দাবিগুলো হচ্ছে—পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন পাহাড়িকে পূর্ণমন্ত্রী নিয়োগ ও অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহার, উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন, সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি পুনর্গঠন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর এবং পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপ শুরু।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাইফুল হক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনা ও বৈষম্য চলছে।
সেখানে এক ধরনের অঘোষিত সামরিক শাসন বিদ্যমান। নিরাপত্তার অজুহাতে অতিমাত্রায় সামরিকীকরণে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ সরকার পাঁচ মাস পার করলেও চুক্তি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অংশীজনদের সম্পৃক্ত করতে একটি জাতীয় কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।
জাসদ নেতা নাজমুল হক প্রধান বলেন, প্রতিটি জাতির ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অধিকার রয়েছে।
সেই বাস্তবতা থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ ২৪ বছরের সশস্ত্র আন্দোলনের পর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও চুক্তির মৌলিক ধারাগুলোর বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
বাসদের নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির তিন দশক পূর্ণ হতে চললেও বাস্তবায়নের দাবিতে এখনো আন্দোলন করতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। আদিবাসী, উপজাতি ও নৃগোষ্ঠী পরিচয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে মূল সমস্যাগুলো আড়াল করা হচ্ছে।
সিপিবির নেতা আব্দুল্লাহ আল ক্বাফি রতন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। স্বাধীনতার পরও এ অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি। দীর্ঘ সংঘাতের পর শান্তিচুক্তি হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার আলোকে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। বর্তমান সরকার তাদের ঘোষিত ৩১ দফায় বহুজাতিক ও বহুত্ববাদী ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি।
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কোনো একক রাজনৈতিক দলের কৃতিত্ব নয়। জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার ফলেই এই চুক্তি হয়েছিল। বর্তমান বিএনপি সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের অন্যতম সদস্য দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফি রতন, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, এএলআরডি নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন প্রমুখ।









