সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মানবদেহে বাসা বাঁধতে পারে ২০০টিরও বেশি ধরনের ক্যান্সার। বিশ্বের মোট ক্যান্সার রোগীর মধ্যে সংক্রমণের হার অনুযায়ী ত্বক ক্যান্সারের অবস্থান ১৭তম। দূষণ ও তীব্র রোদের অতিবেগুনি রশ্মিই ত্বক ক্যান্সারের মূল কারণ। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, আমাদের দেশেও এর হার নেহাত কম নয়।
দেশে ত্বক ক্যান্সার নিয়ে তেমন গবেষণা হয়নি, তাই আমাদের দেশে বাৎসরিক আক্রান্তের হারের সঠিক পরিসংখ্যান করা মুশকিল। তবে ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে আক্রান্তের হার।

কেন হয় ত্বক ক্যান্সার
ত্বক ক্যান্সারের প্রধান কারণ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি। এটি ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে ডিএনএ বা আরএনএ বদলে দিতে সক্ষম।
এর ফলে কোষের মধ্যে তৈরি হয় মিউটেশন, যা সহজেই ম্যালিগন্যান্ট টিউমার বা ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পরে। যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে রোদে কাজ করেন, তাঁদের ত্বক ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যাঁরা কৃষিকাজ করেন, তাঁদের মধ্যে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া আরো কিছু কারণে ঝুঁকিতে রয়েছেন যাঁরা—
► যাঁদের ত্বক অতিরিক্ত ফরসা
► মধ্যবয়স্ক বা প্রবীণ যাঁরা।
বয়সের সঙ্গে ত্বকের গঠন বদলে যায়, তাই বাড়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি
► তামাকসেবী
► হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণ
► আয়োনাইজিং রেডিয়েশন, এক্স-রে, আর্সেনিক, হেভি মেটাল জাতীয় যৌগ প্রভৃতির সান্নিধ্যে থাকা, অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ বা দূষিত পরিবেশে বসবাস করেন যাঁরা
► পুরনো ও জটিল ঘা বা ক্ষতের সময়মতো চিকিৎসা না নিলে
► পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস রয়েছে যাঁদের
► রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায় এমন ওষুধ গ্রহণ করছেন যাঁরা।
ধরন
ত্বক ক্যান্সারকে মোটাদাগে দুই ভাগ করা যায়—মেলানোমা ও নন-মেলানোমা ক্যান্সার। মেলানোমা ক্যান্সার ম্যালিগন্যান্ট, অর্থাৎ প্রাণঘাতী হতে পারে। দুটি ক্যান্সারের মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি ধরন। এর মধ্যে আছে—
ব্যাসাল সেল কারসিনোমা : রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ব্যাসাল সেল কারসিনোমা বা বিসিসি।
অত্যন্ত ধীরে বাড়ে এই রোগ। নডিউলার বিসিসিতে আক্রান্তের হার বেশি, সংক্রমণের স্থানে শুরুতে এটি গুটির মতো দেখা দেয়। ধীরে ধীরে সেখানে সৃষ্টি হয় ক্ষত এবং ত্বকের গভীরে দেবে যায়। বয়স্করাই বেশি আক্রান্ত হন, ৮৫-৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে মাথা ও ঘাড়ে হয় এটি। চোখের পাতা, গাল, কপাল, ওপরের ঠোঁটে বেশি দেখা যায়। এটি দেহে সহজে ছড়ায় না, তাই চিকিৎসা বেশ সহজ।
স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা : সংক্রমণের হারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা বা এসিসি। এটিও বয়স্কদের বেশি হয়, আক্রান্তদের গড় বয়স ৬৫ বছর। মুখ, হাত, বুক, পিঠ ও পায়ে বেশি দেখা যায়। শুরুতে লালচে ফুসকুড়ির মতো মনে হয়, পরে বড় ফুলকপির মতো আকৃতি ধারণ করে। এই রোগটি দ্রুত বাড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যে শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। লসিকা গ্রন্থি, ফুসফুস, লিভার, হাড় ও মস্তিষ্কে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাই দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা জরুরি।
ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা : ত্বকের ক্যান্সারের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ধরন ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা। মোট ত্বক ক্যান্সার রোগীর মাত্র ৪ শতাংশের দেহে এটি দেখা দেয়, ৭৫ শতাংশ রোগীই মারা যান। ত্বকের মেলানোসাইট কোষ থেকে এর উৎপত্তি। ধড়, হাত, গোড়ালি, মাথা ও চোখে এটি বেশি হয়। পুরনো তিল, জন্মদাগ বা ত্বকের অন্যান্য দাগ থেকে এটি তৈরি হয় বেশি।
উপসর্গ ও নির্ণয়
ত্বক ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ সহজে দৃষ্টিগোচর হয় না। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত নিয়মিত ত্বক পরীক্ষা করা। যেসব জিনিসে লক্ষ রাখতে হবে—
► মুখমণ্ডলের ত্বকে চাকা দেখা দেওয়া
► পুরনো চাকায় হঠাৎ ব্যথা বা ক্ষতের সৃষ্টি
► কয়েক মাসেও ত্বকের কোনো ক্ষত না শুকানো
► তিল বা আঁচিল হঠাৎ খুব দ্রুত বড় হয়ে যাওয়া, রং বা আকৃতি পরিবর্তন, ব্যথা, অতিরিক্ত চুলকানো এবং এর ফলে রক্তপাত।
এসব উসপর্গ দেখা দিলে দ্রুত ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ত্বকের টিস্যু বায়োপসি করে ক্যান্সার নির্ণয় করা সম্ভব। বায়োপসি করে ক্যান্সারের ধরন এবং সেটি কোন পর্যায়ে আছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
চিকিৎসা
ত্বক ক্যান্সার নির্ণয়ের পর মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। ক্যান্সার নির্মূলে সার্জারির মাধ্যমে টিউমার অপসারণের পাশাপাশি কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ক্রায়োথেরাপি বা ইলেকট্রোকিউরেটেজের মতো চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে। ক্যান্সারের ধরন, অবস্থান ও রোগীর সার্বিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে সঠিক পদ্ধতি নির্বাচন করবেন চিকিৎসক।
প্রতিরোধে করণীয়
► যতটা সম্ভব সরাসরি রোদে থাকা পরিহার করা জরুরি। বিশেষ করে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সূর্যের তাপ বেশি প্রখর থাকে, সে সময় ছায়ায় থাকার চেষ্টা করতে হবে।
► বাইরে যাতায়াত বা কাজের সময় সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। কমপক্ষে এসপিএফ৩০ মানের লোশন ব্যবহার করতে হবে, যেটি সূর্যের ক্ষতিকর আলট্রাভায়োলেট রশ্মিকে বাধা দিতে সক্ষম।
► রোদে যেতে হলে শরীর ভালোভাবে ঢাকতে হবে, যাতে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ ক্ষেত্রে ভালো মানের সানগ্লাস, হ্যাট ও ছাতা ব্যবহার করা যেতে পারে।
► রেডিয়েশন জোনে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে গগলস, শিল্ড ব্যবহার করতে হবে।
► আর্সেনিকমুক্ত পানি পান ও ব্যবহার করতে হবে।
► হেভি মেটালের সংস্পর্শে থাকতে হয় এ রকম পরিবেশে যাঁরা কাজ করেন, যেমন—রঙের ফ্যাক্টরির কর্মীদের অবশ্যই গ্লাভস ও প্রটেক্টিভ গিয়ার ব্যবহার করতে হবে।
► জটিল ও পুরনো ক্ষতের চিকিৎসায় বিলম্ব করা যাবে না।
► সর্বোপরি নিজের ত্বকের যত্ন নিতে হবে। ত্বকে কোনো ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
লেখক : প্লাস্টিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল









