নারী

তিন শতাধিক ‘সন্তানের’ জননী করুণাময়ী

নিউজ ডেস্ক১০ মার্চ ২০২৬৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

প্রায় ১৪ বছর ধরে হারিয়ে যাওয়া দেশীয় জাতের বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে খুলনার বটিয়াঘাটায় ‘গ্রামীণ বীজমেলা’র আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘লোকজ’। প্রতিষ্ঠানটির সমন্বয়কারী পলাশ দাস বললেন, ‘মেলায় বিভিন্ন গ্রাম থেকে বীজ নিয়ে হাজির হন নারীরা। তাঁদের পুরস্কৃতও করা হয়। বীজের সংখ্যা, বৈচিত্র্য, মান ও উপস্থাপন কৌশলের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্বাচনী প্যানেল বিজয়ীদের নির্বাচিত করে।

’ এবার এসেছিলেন ১৭ গ্রামের নারীরা। তবে সবাইকে তাক লাগিয়ে গত বছরের মতো এবারও সেখানে প্রথম হয়েছেন করুণাময়ী মণ্ডল। মজার বিষয় হলো, ১০ বছর ধরে এই মেলায় অংশ নিচ্ছেন করুণাময়ী। প্রতিবারই প্রথম তিনজনের মধ্যে ছিলেন তিনি।

এবার তিনি মেলায় এনেছেন ডাল, ধান, সবজি, আমসহ প্রায় ৩১৬ প্রকারের দেশি বীজ। বললেন, ‘এগুলো (বীজ) আমার সন্তানের মতো। বীজই এখন নিত্যদিনের সঙ্গী আমার। জমিতে লাগাই, আবার অন্যের সঙ্গে বিনিময়ও করি।

’

করুণার কৃষিবাড়ি

বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণকরুণাময়ী মণ্ডলের বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার শুকদাড়া গ্রামে। বয়স প্রায় ৫৪ বছর। বিয়ের পর থেকে কৃষিকাজ করেন। তখন থেকেই দেশীয় বিভিন্ন প্রকারের বীজ সংরক্ষণ শুরু করেন। নিজ গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের অনেকেই তাঁর কাছ থেকে দেশীয় বীজ নিয়ে যান।

বেশ বড় বাড়ি করুণাময়ীদের। উঠানের সামনে একচিলতে জমিতে বেগুন, কচু, ফুলকপি, গোল আলু ও হলুদ লাগিয়েছেন। ঘরের পাশে আছে মেটে আলু, টমেটোসহ নানা পদের শাক-সবজি। বৃষ্টি শুরু হলে ঢেঁড়স আর ডাঁটাশাক বুনবেন। আঙিনার চারপাশে ঝিঙে, করলা ও উচ্ছেও লাগাবেন বলে জানালেন। অবশ্য এখনই বাড়িতে এতটুকু জায়গা পতিত নেই। আঙিনাকে ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে তাতে মৌসুমভিত্তিক বিভিন্ন শাক-সবজি চাষ করেন। এবার বিলে ১৮ কাঠায় মুগ ডাল চাষ করেছেন। তরমুজ চাষ করেছেন দুই বিঘা জমিতে। পুকুরে করছেন মাছের চাষ। গরুও পালেন তিনটি। হাঁস-মুরগি আছে আটটির মতো। বললেন, ‘শেষ কবে শাক-সবজি কিনে খেয়েছি মনে পড়ে না। বাড়িতেই সব হয় আমার। নিজের সংরক্ষণ করা বীজ থেকেই শাক-সবজি লাগাই। দেশীয় জাতের বীজ থেকে হওয়া গাছে পোকা কম হয়।’ শাক-সবজিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন না। গরুর গোবর ও কেঁচো থেকে নিজেরাই উৎপাদন করেন জৈব সার।

যত্নে আগলে রাখা বীজ গ্রামের অন্য নারীদের মধ্যে আদান-প্রদানও করেন করুণাময়ী। তাঁর দেখাদেখি এখন আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের নারীরা সংরক্ষণ করছেন দেশীয় প্রজাতির বীজ। বীজ সংরক্ষণের ফলে পরিবারগুলোতে যেমন শাক-সবজির চাহিদা মিটছে, অন্যদিকে সেসব সবজি বিক্রি করে লাভবানও হচ্ছেন তাঁরা।

 

চেয়েছিলেন ডাক্তার হতে

খুলনার বটিয়াঘাটার ১নং জলমাই ইউনিয়নের কৈয়া বাজার গ্রামে জন্ম। আট ভাই-বোনের বড় পরিবার। করুণাময়ী ষষ্ঠ। বাবা ছিলেন কৃষক। করুণাময়ী চেয়েছিলেন ডাক্তার হতে। তবে কাটােঁঁছড়া সহ্য করতে পারতেন না। তাই মা বললেন, ‘অন্তত হোমিওপ্যাথির ডাক্তার তো হতে পারিস।’ খুলনার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হলেন গলনামারী হোমিওপ্যাথি কলেজে। শেষের দিকে কৈয়া বাজারে এক ডাক্তারের চেম্বারে রোগী দেখতেন। ডিপ্লোমা পাসের পর বসতে হলো বিয়ের পিঁড়িতে। স্বামীর বাড়ি এসেও প্রথম দিকে রোগী দেখেছেন। বিয়ের বছরখানেক পর কোল আলো করে এলো পুত্রসন্তান—বিপ্লব মণ্ডল। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন করুণাময়ী। টানা তিন মাস বিছানায়। সেরে ওঠার পর আর চিকিৎসা পেশায় ফেরেননি। পরে ‘রূপান্তর’, ‘নিজেরা করি’ নামে বেসরকারি সংস্থার হয়ে গ্রামে গ্রামে বাল্যবিবাহ, মাদকসহ নানা বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।

 

এখন তিনি উদাহরণ

স্বামী প্রবাস মণ্ডল কৃষক। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। স্বামীকে বেশির ভাগ সময় বাইরে কাটাতে হয়। ঘরকন্না সামলানোর দায়িত্ব পড়ে করুণময়ীর কাঁধে। বাবার বাড়িতে থাকতে করুণা দেখেছেন, মা-দিদিরা মৌসুমে লাউ, কুমড়া বা শিমের বিচি সংরক্ষণ করতেন। পরে সেগুলো বপন করতেন। করুণাময়ীও বসতভিটার চারপাশে সবজি চাষ করবেন বলে ঠিক করলেন। নিজেদের তিন বিঘা জমিতে ধান চাষও শুরু করলেন। মৌসুমভিত্তিক আলু, টমেটো, বেগুন, কুমড়া, বরবটি, ফুলকপি, মুলা, শিম, লালশাক, পালংশাক, লাউ, পুঁইশাক, শসা, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি চাষ করছেন।

শুধু তা-ই নয়, বসতভিটার চারপাশে কলা, নারকেল, পেয়ারা, আমড়া, লেবু, বেল, ডুমুর, নিম, লিচু, জলপাইসহ নানা গাছের চারা লাগিয়েছেন। এলাকার লোকজন এখন একনামে চেনে করুণাময়ীকে।

 

ভাণ্ডারে তাঁর বিবিধ রতন

করুণময়ীর বাড়ি গেলে দেখবেন, ছোট ছোট কৌটায় লাউ, মিষ্টিকুমড়া, পুঁইশাক, ঢেঁড়স, ঝিঙে, সরিষা, মসুরসহ হরেক রকমের সবজি, শস্য ও ফলের বীজ। আছে ধানের বীজও। সবই স্থানীয় জাতের। আপনার কাছে মোট কত প্রজাতির দেশি বীজ আছে? ‘দাঁড়াও, খাতাটা দেখি।’ পরে একটা খাতা বের করলেন তিনি। যেখানে কোন প্রজাতির কত বীজ সংগ্রহ করেছেন তা লিখে রেখেছেন। সেখান থেকে জানা গেল, এ পর্যন্ত ৩১৬ প্রজাতির বীজ সংরক্ষণ করেছেন করুণাময়ী। শস্য, সবজি থেকে শুরু করে সফেদা, আম, জাম, পেঁপেসহ বিভিন্ন ফলের বীজও আছে। শুধু ধানের বীজই আছে ৩৩ প্রজাতির। তরমুজের বীজ আছে ১৩ রকমের। ফুল ২৭ রকমের। ফল ও সবজির বীজ ৫০ রকমের করে। অর্জুন, থানকুনি, জার্মানি লতা, রক্তমূল, শজনে, পাথরকুচিসহ ঔষধি গাছের বীজ ৩৮ রকমের। ডাল ও আম ১৫ রকমের করে। আদা, হলুদ, কচু, আলুসহ মাটির নিচে হয় এমন সবজি ও মসলা ১৯ রকমের।

 

আগলে রাখেন পরম যত্নে

বীজ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের কাজ নিজেই করেন করুণাময়ী। ছোট ছোট প্লাস্টিকের কৌটা ও পানীয়র বোতলে বীজ সংরক্ষণ করেন। এ রকম ২০০ কৌটা আছে করুণময়ীর কাছে। স্থানীয় সংস্থা লোকজ থেকে বীজ সংরক্ষণের কলাকৌশল ও সুফল সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন।

দেশীয় জাতের শাক-সবজি, ফল ও শস্যের পরিপুষ্ট দানা থেকে বীজ সংগ্রহ করে। এরপর পরিষ্কার করে রোদে শুকান। শুকনা বীজ কৌটা ও বোতলে ভরে রাখেন। মাঝে মাঝে বীজগুলো রোদে শুকিয়ে আবার কৌটায় ভরে রাখেন। কৌটার ওপর আঠা দিয়ে কাগজ লাগিয়ে তাতে লিখে রাখেন কোনগুলো কোন জাতের বীজ। তিনি বলেন, ‘সারা বছর ধরে নানা উপায়ে নতুন নতুন বীজ সংগ্রহ করি। রোদে শুকানোর পর কৌটায় ভরে রাখি। দেশীয় জাতের বীজ সহজে নষ্ট হয় না। ফলনও ভালো হয়।’

 

জিম্মি হব কেন?

কেন বীজ সংরক্ষণ করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়লেন করুণাময়ী ‘আমরা বীজ কম্পানির কাছে জিম্মি হব কেন?’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘বাবা, বাড়ির বেগুন আর হাটের বেগুনে অনেক তফাত। রান্নায় কমে না। স্বাদও আলাদা। তাছাড়া সব বীজ তো হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা জিম্মি হয়ে পড়ছি বীজ কম্পানির কাছে। প্রতিবছর বীজ কিনতে হয়। খরা, বন্যা হলে দেশি বীজ ঘরে থাকলে দরকারমতো একাধিকবার বপন করা যায়। দেশি বীজের সবজির স্বাদ বেশি। দীর্ঘদিন থাকে। মানে জীবনকাল অনেক বেশি। নিজের থাকতে তাই পরের কাছে হাত বাড়াব কেন?’