সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
ডিজিটাল পরিসর বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিঃসন্দেহে বর্তমান যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী মতপ্রকাশের মঞ্চ। এখানে একটি ভিডিও কিংবা ছবি যেমন হাজারো মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, তেমনি একটি গুজব বা ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট মুহূর্তেই ছড়িয়ে দিতে পারে ঘৃণা ও বিদ্বেষ। ভয়ংকর বিষয় হলো; এসব অপপ্রচার কেবল অসচেতনতা থেকে নয়, বরং সচেতনভাবে, বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতা থেকে চালানো হয়। ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে আজ অনেক মানুষ এমনভাবে অন্যকে ভাইরাল করে দিচ্ছে—যা তার জন্য বাস্তব জীবনে সামাজিক মৃত্যুর শামিল।
এমন কর্মকাণ্ডের পেছনে নানা উদ্দেশ্য কাজ করে: কেউ চায় অল্প সময়ে খ্যাতি অর্জন করতে, কেউ চায় নিজের পেজের ভিউ বাড়াতে, কেউ আবার প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে বা হিংসার আনন্দে ডুবে থাকতে। এজন্য তারা মিথ্যা তথ্য প্রচার করে, বিকৃত ছবি ও ভিডিও ছড়ায়, গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেয়, কিংবা অভিযোগের নামে অন্যের চরিত্রকে পুরোপুরি কলুষিত করে ফেলে।

এসব কাজের পেছনে কোনো বিবেক কাজ করে না। ভাবা হয় না এই অপবাদে কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে, সামাজিকভাবে একঘরে হচ্ছে, সংসার ভাঙছে, চাকরি হারাচ্ছে, এমনকি ধর্মীয়ভাবেও নিজেকে কলুষিত মনে করে আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
যদিও আত্মহত্যা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কঠোরভাবে হারাম ও চিরস্থায়ী গুনাহ।
ইসলাম এসব অপবাদ ও চরিত্রহননের বিরুদ্ধে এক বিশুদ্ধ নীতিমালা দিয়ে রেখেছে। ইসলামি শরিয়তে কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছোট করা, সম্মানহানি করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া কবীরা গুনাহ।
গিবত বা পরনিন্দার ব্যাপারে সাবধান করে পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে—‘তোমাদের কেউ যেন অপরজনের গিবত না করে।
তোমাদের কেউ কি চায়, সে তার মৃত ভাইয়ের মাংস খাবে? নিশ্চয়ই তা তোমাদের কাছে ঘৃণিত।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২) গিবত হলো এমন কথা বলা যা কাউকে অপমান করে, যদিও তা সত্য। অথচ এখন সামাজিক মাধ্যমে সত্য বা মিথ্যার যাচাই ছাড়াই পরনিন্দামূলক পোস্ট অহরহ করা হচ্ছে।
তোহমত বা অপবাদ বিষয়ে কোরআনুল কারিমের সুরা নূরের ২৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘যারা সচ্চরিত্র নারীদের অপবাদ দেয়… তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশাপ এবং কঠিন শাস্তি।’ যখন কাউকে এমন কোনো দোষে অভিযুক্ত করা হয়, যা সে করেনি, তখন তা হয় তোহমত।
এটি গীবতের চেয়েও ভয়াবহ।
বুহতান বা মিথ্যা অপবাদ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের মান-ইজ্জতের ক্ষতি করার জন্য এমন কথা বলে যা সত্য নয়, সে জাহান্নামে স্থান পাবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৮১)
বর্তমানে কিছু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টদের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে ধর্মীয় আলেম, দ্বিনি সংগঠন বা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো। উদ্দেশ্য মানুষের মন থেকে তাদের ভালোবাসা কমানো, দ্বিনি প্রভাবকে দুর্বল করা। অথচ এইসব কাজকে তারা ‘পরামর্শ’ বা ‘সচেতনতা’ বলেই চালিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। যেন এতে কোনো গুনাহ নেই। বাস্তবে এটি ইসলামি নীতিমালার চরম লঙ্ঘন। অথচ কাউকে উপদেশ বা পরামর্শ দেওয়ার কোরআনী ও নববী পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১২৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কারো কোনো দোষ জানতে পারতেন, তিনি নাম প্রকাশ না করে বলতেন, ‘কী হয়েছে সেইসব লোকদের, যারা এমন কথা বলে?’ (মুসলিম, হাদিস : ৩০০৪)
কাজেই আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে- ১. সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেওয়ার আগে যাচাই করা যে ‘এটি সত্য কিনা?’ ২. কাউকে অপবাদ দিতে দেখলে—তাকে বোঝানো, কারণ এটা দুনিয়া ও আখিরাতে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। ৩. কারো যদি বদনামের শিকার হওয়ার কথা জানতে পারি—তাকে সহানুভূতি ও সহযোদ্ধার মনোভাব দেখানো, যেন সে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে। ৪. সন্তান, বন্ধু ও পরিচিতজনদের শেখানো— ‘মানুষের সম্মান নষ্ট নয়, রক্ষা করাই ধর্মীয় দায়িত্ব।’
সম্মানহানি নয়, সম্মান রক্ষা হোক আমাদের চরিত্রের পরিচয়। সোশ্যাল মিডিয়া হোক কল্যাণের মাধ্যম—কুৎসা, ঘৃণা আর তাচ্ছিল্যের নয়। নববী আদর্শ হোক আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ বিনির্মাণের আয়না। আল্লাহ আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com









