সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
সবার যে ঘুম আসে না, সেটা সত্যি নয়। অনেকেই ঘুমাচ্ছেন নাক ডেকে। লুঙ্গিকেই চাদর হিসেবে বুক পর্যন্ত তুলে অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। একজনের পায়ের কাছে আরেকজনের মাথা, পাশের জনের গায়ের ওপর পা তুলে রয়েছেন অন্যজন।

শেরপুরের আমিনুর রহমানের ঘুম আসে না। একটার পর আরেকটা সিগারেট ধরান। মগবাজারের আমবাগানের ভেতরে লেদু মিস্ত্রির রিকশার গ্যারেজে আরো একটা রাত এভাবেই পার হয় আমিনুরের।

গ্যারেজের রিকশাগুলোকে মাথার সঙ্গে মাথা মিলিয়ে রাখা হয়। এতে জায়গার অপচয় হয় না। জায়গার আরো সদ্ব্যবহার করতে রিকশার ওপরেই কাঠের পাটাতন দিয়ে দোতলার মতো করে তৈরি করা হয়েছে থাকার স্থান। চাল এবং বেড়া টিনের।
বাঁশ দিয়ে বানানো হয়েছে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। আমিনুরের পেছন পেছন উঠে বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে পাটাতনের ফাঁক দিয়ে মুখ তুললেই ঘুমিয়ে থাকা নিথর শরীরগুলো চোখে পড়ে। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীরের শিরাগুলো তখন নিস্তেজ হয়ে আছে। শরীরের শুকিয়ে যাওয়া ঘাম আর তেল চিটচিটে ভ্যাপসা গন্ধে সেখানে তৈরি হয়েছে অসুস্থ পরিবেশের। বৈদ্যুতিক পাখা না থাকায় অনেকেই ঘুমের ঝিমুনিতে শক্ত কাগজ দিয়ে ধীর লয়ে হাত নেড়ে বাতাস দেয়ার চেষ্টা করছেন।
তখন রাত ২ টা। এই রুমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন থাকেন। অনেকেই ঘুমিয়েছেন আবার কয়েকজন আয়োজন করছেন। এখানে কেউ স্থায়ী রিকশাওয়ালা নেই। যখন যারা লেদু মিস্ত্রির রিকশা চালান, তারাই থাকতে পারেন।
আমিনুর বলেন, কাঠের পাটাতনে ছারপোকা ভর্তি। তাই অনেকে শুধুই পলিথিন বিছিয়ে ঘুমান। এর ওপর ছারপোকা হাঁটতে পারে না। তবে ঘুমের পর আর কিছুই খেয়াল থাকে না। আবার অনেকেই ছারপোকা ভর্তি বালিশ বা কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে পারেন। অভ্যাস হয়ে গেছে। আর যারা এভাবে ছারপোকার কামড়েও ঘুমে মগ্ন থাকেন, তাদের জন্যে ভন ভন করা মশার কামড় তো নস্যিই বটে।

দোতলার এই রুমে জানালা একটি। সেখান থেকে গ্যারেজের আরো রিকশা দেখা যায়। রিকশা পাহারা দেয়ার কাজটিও হয়ে যায় এখান থেকে।
দোতলার এই শোবার ঘরটি ছাড়াও নিচে আরো কয়েকটি ঘর রয়েছে। দু’টি গ্যারেজ মিলে এখানে প্রায় দেড় শতাধিক রিকশা রয়েছে। আর নিচের ঘরগুলোকে মেস বলা হয়। এখানে যারা থাকেন দুপু্র এবং রাতের খাবার তারা এখানেই করেন। দৈনিক খাবারের খরচ ১০০ টাকা এবং রিক্সা ভাড়া পুরো দিনের জন্যে ১২০ টাকা। রাতে ঘুমের বিষয়টি এই খরচের ভিতরেই অন্তর্ভুক্ত। মেসের একটি বড় রুমে প্রায় ২০ জনের মতো রয়েছেন। ফরিদপুরের আমিনুল জানালেন, তিনিও লেদু মিয়ার রিকশা চালান। প্রায় ৭ বছর ধরেই এই গ্যারেজের সঙ্গে রয়েছেন তিনি।
বললেন, ভাই এখানে পলিথিন ওঠালে দেখতে পারবেন কিসের ওপর শুয়ে আছি। ছারপোকার কামড়ে ঘুম আসে না। অনেক সময় সারা রাত না ঘুমিয়েও সকালে রিকশা নিয়ে বের হতে হয়। শীতকালে ছারপোকার যন্ত্রনা একটু কম হয়।
দুটি টয়লেট রয়েছে এখানে। তার দশ হাত দূর দিয়ে যেতে চাইলেও দুর্গন্ধ এড়ানো যায় না। আর ছোট কুয়ার মতো ইট দিয়ে ট্যাংকি বানানো হয়েছে। সেখান থেকে মগ কেটে পানি নিয়েই চলে গোসল এবং প্রাত্যহিক কাজ সারা। একটি বাঁশের ওপর ঝুলে আছে লোটা এবং পানি তোলার জন্যে কাটা গ্যালন।

আমিনুর দীর্ঘদিন ধরে কোমড়ের ব্যথায় ভুগছেন। তার প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয়, খরচ বাদ দিয়েই। তবে বড় মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে। বিয়ের খরচ একেবারে কম হবে না। এরপর দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ে। শরীরের এই অবস্থা আরো বেশি দিন গেলে রিকশা চালানো সম্ভব নাও হয়ে উঠতে পারে।
রাত পেরোতে থাকে। দোতলার পাটাতনের ওপর মাথা ঠেকালেও ঘুম আসে না আমিনুরের। লেদু মিস্ত্রির রিকশার গ্যারেজে আরেকটা রাত এভাবেই কেটে যায় আমিনুরের।
সূত্র: বাংলা নিউজ









