রাজশাহী

খেয়াঘাটের ইজারাদারের কাছে জিম্মি চরের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ

নিউজ ডেস্ক১২ মে ২০২৬৬ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের চর আলাতুলি দুটি ইউনিয়নই চরের মধ্যে। পাশাপাশি দুটি ইউনিয়নে অন্তত ৩৫ হাজার মানুষের বসবাস। এর বাইরে রাজশাহীর পবার হরিপুর এবং হরিয়ান দুটি ইউনিয়নের আরও অন্তত ২০ হাজার মানুষের বসবাস করেন চর মাঝারদিয়াড়, চর খানপুর, চর খিদিরপুর এবং মাঝচর নামের চারটি চরে। অন্যদিকে বাঘার চক রাজাপুর, দৌলতপুর, দিয়াড় মানিক চরে আরও অন্তত ১০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এসব মানুষের পারাপারের অন্যতম মাধ্যম হলো নৌকা বাবা মোটরসাইকেল।

চারাবসি অভিযোগ করেন, যাতায়াতাতের জন্য নৌকা বা মোটরসাইকেল ভাড়া দিতে হয় চরের যাত্রীদের। কিন্তু চরের বাসিন্দারা তার পরেও খেয়া ঘাটের ইজারাদারকে বছরের পর বছর ধরে মাথাপিছু ১০ টাকা দিয়ে আসছেন পারাপারের জন্য। এর বাইরে মালামাল ও গৃহপালিত গরু পারাপার করতেও দিতে হচ্ছে ১০-এক হাজার টাকার বেশি। সবেচেয়ে বেশি টাকা আদায় হয় চরে পালিত গরু থেকে। প্রতিটি গরু এপারে বিক্রি করতে আনার পথেই খেয়াঘাটে দিতে হয় ৫০০-৬০০ টাকা। কোরবানির হাটে দেশি গরু বিক্রি করতে আনার সময়ও টাকা না দিলেই ভারতীয় গরু বলে বিজিবিকে দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখান প্রভাবশালী খেয়াঘাটের ইজারাদাররা। এসবের ফলে মূলত খেয়াঘাটের ইজারাদারদের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরের অর্ধলক্ষাধিক বাসিন্দা।

খেয়াঘাটের ইজারা স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবিও জানিয়ে আসছেন তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু কোনোই লাভ হয়নি। উল্টো দিনের পর দিনে অতিরিক্ত টাকা তাঁদের দিয়েই আসতে হচ্ছে। এবার বাধ্য হয়ে তাঁরা খেয়াঘাটের ইজারা বাতিল চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি দিয়েছেন।

এই প্রতিবেদক গত মঙ্গলবার বাঘার চর চৌমাদিয়া হয়ে কুষ্টিয়ার বাংলা বাজার চর যাওয়া সময় যে চিত্র দেখে আসেন, সেটি তুলে ধরা হলো-
কুষ্টিয়ার বাংলা বাজার চরে যাতায়াত করতে খেয়াঘাটেই দিতে হলো ২৪০ টাকা। নদীর দুইপারেই যেতে-আসতে টাকা আদায় করছে ঘাটের ইজারাদাররা (চাঁদাবাজরা)। সবেচেয়ে বেশি ডা*কাতি করছে রাজশাহীর বাঘার সীমান্তের ইজারাদার। এরা মোটরসাইকেল প্রতি নিচ্ছে ১০০ টাকা, মানুষ ২০ টাকা, অন্যান্য মালামালের জন্য ওজন হিসেবে নিচ্ছে টাকা।
কুষ্টিয়ায় ওপারে জনপ্রতি ৪০ (২০+২০) টাকা নিচ্ছে রাজশাহী থেকে যাতায়াতে। তবে মালামালের জন্য কোনো টাকা নিচ্ছেন না তারা। সেই হিসেবে গতকাল যাতায়াতেই দিতে হলো চাঁদাবাজদের ২৪০ টাকা। এর পর আছে নৌকা ভাড়া (৪০+৪০) ৮০ টাকা। নদী পার হতেই মোট ব্যয় হলো ৩২০ টাকা। যমুনা সেতু বা পদ্মা সেতু পারপার হতেও এতো টোল দিতে হয় বলে জানা নাই।
রাজশাহীর সীমান্তের ঘাটাল ইউএনওর অনুমতির দোহায় দিয়ে রীতিমতো চাঁদাবাজিতে নেমেছে চরের মানুষদের কাছে। ওপারে কুষ্টিয়ার সীমান্তে দুই জায়গায় টোল নেয় (১৫+২০) ৩৫ টাকা। চর থেকে দৌলতপুর পায়ে হেঁটে যেতেও ওই টাকা দিতে হয় চরবাসীকে।
স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল বলেন, স্বাধীন দেশে চলাচল করতেও যদি এভাবে মানুষকে জিম্মি করে চাঁদা আদায় করা হয়, তাহলে এদেশের নাগরিকদের বসবাসের অধিকার কোথায়?
শুধু এ চরেই নয়, টোলের নামে রাজশাহীসহ আশেপাশের সব জেলায় এ চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়া উচিত৷ চরবাসী এমনিতেই কষ্টে থাকেন। এরপর তাদের ধাপ ফেললেই যদি পদে পদে টাকা দিতে হয়, তাহলে তারা কেন স্বাধীন রাষ্ট্রে বাস করবে? তার চেয়ে টোলের নামে চাঁদাবাজি বন্ধ না করতে পারলে প্রতিটি চরকে আলাদা রাষ্ট্র ঘোষণা করা হোক।

আষাড়িয়াদহ ছাত্র-কর্মজীবী জোটের উদ্যোগে দেওয়া ওই খোলা চিঠিতে বলা হয়, নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষিকাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন চলাচলের একমাত্র ভরসা খেয়াঘাট। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ঘাট ইজারা দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে, যা চরের মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরবাসীকে রীতিমতো জিম্মি করে টাকা আদায় খেয়া ঘাটের ইজারাদার।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, চরের মানুষ নিজেদের অর্থ, শ্রম দিয়ে নিজেদের উদ্যোগেই চরে পারাপারের জন্য রাস্তা নির্মাণসহ নানা কার্যক্রম করে। তারপরও প্রতিদিন পারাপারের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হওয়া অত্যন্ত কষ্টকর ও অন্যায্য।

চর আলাতুলি গ্রামের বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, চরের মানুষ এমনিতেই নদীভাঙন, বন্যা, দারিদ্র্য ও অবহেলার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে। জরুরি চিকিৎসা, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত কিংবা কৃষকের ফসল পরিবহনের সময় ঘাটের টাকার কারণে মানুষকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। যেখানে আমরা নিজেরাই নৌকা দিয়ে পারাপারের ব্যবস্থা করি, নিজেরাই রাস্তা তৈরি করি, সেখানে কেন সাধারণ মানুষকে ঘাটে টাকা দিতে হবে?

চর আষাড়িয়াদহ এলাকার নাজমুল হোসেন বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরে চরের মানুষ পারাপারের জন্য ঘাটে টাকা ছাড়াই পারাপার করে আসছিলো। এখন আবার নতুন করে ঘাট ইজারার নামে চর বাসীকে জিম্মি করার চক্রান্ত চলছে।

চর আষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়নের কলেজ ছাত্র সুজন আলী জানান, আষাঢ়িয়াদহ চর আলাতুলি পাশাপাশি দুটি ইউনিয়নের চরে অন্তত ৩৫ হাজার মানুষের বসবাস। এই দুটি চরের বাসিন্দা সবাই গোদাগাড়ীর বিভিন্ন চর দিয়ে উপজেলা বা জেলা সদরে যাতায়াত করেন। আর তাদের যাতায়াতে মাথাপিছু খেয়াঘাটের জন্য ১০ টাকা এবং মালামালের জন্য পরিমাণ অনুযায়ী এক হাজার বা তারও বেশি টাকা আদায় করা হয়। অথচ নৌকা ভাড়া করেই চরবাসীকে পারপার হতে হয়।

চার মাঝারদিয়াড় এলাকার বাসিন্দা আনছার আলী বলেন, চরের মানুষ প্রচুর পরিমাণে গরু পালন করেন। প্রতিটি বাড়িতেই অন্তত ১০ টা গরু-মহিষ-ছাগল ভেড়া থাকে। এসব পশু কোরবানির সময় বেশি বিক্রি হয়। ফলে এখন কোরবানির হাটে গরু-মহিষ ও ছাগল এবং ভেড়া বিক্রি করতে নিয়ে যাওয়ার সময় গরু-মহিষ প্রতি ৫০০-৬০০ টাকা এবং ছাগল-ভেড়ার জন্য ৫০ টাকা করে নেয় ঘাটের ইজারাদার। এর পর রয়েছে নৌকা ভাড়া। হাটে পশু বিক্রি না হলেও তাঁদের টাকা দিতে হয়। এটি রীতিমতো জুলুম করে আদায় করেন ঘাটের ইজারাদাররা। টাকা না দিলেই চরের পালন করা গরু ভারতীয় গরু বলে বিজিবিকে দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখানো হয়।’

এই চরের বাসিন্দা মাজদার হোসেন বলেন, নতুন কিছু পারাপারের জন্য খেয়াঘাটের ইজাদার আরও বেশি টাকা চেয়ে বসেন। নতুন মোটরসাইকেল কিনে আনার সময় দিতে হয় এক হাজার টাকা, সাইকেল কিনে আনার সময় দিতে ৫০০ টাকা। খাট বা বড় কিছু মালামাল কিনে আনার সময়ও ৫০০-এক হাজার টাকা আদায় করা হয়।’
জানতে চাইলে রাজশাহীর টিবাধ খেয়াঘাটের ইজারাদার আশরাফ আলী বলেন, ‘ইজারা নিয়ে সরকারকে টাকা দিতে হয়। সেখান থেকে নির্ধারিত যে টাকা সেটিই আদায় করা হয়। কারও নিকট বেশি আদায় করা হয় না।’

খেয়াঘাটের ইজারাদারদের এই জিম্মি বাণিজ্য নিয়ে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এই ধরনের অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নাই। অভিযোগ পেলে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’