নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর পবা উপজেলার নদীকান্ধা গ্রামের বাসিন্দা মুনছুর আলী। বয়স প্রায় সত্তোরের কোঠায়। এই বয়সে যেখানে অনেকেই হাঁটতেই কষ্ট পান, সেখানে মুনসুর আলী আজও দিব্যি প্রায় ৫০ ফিট উচ্চতার খেজুর গাছে উঠে রস সংগ্রহ করেন। শীতের ভোওে উঠে কাঁপতে কাঁপতে গাছে উঠেন রস সংগ্রহ করতে। আবার বিকেলে ধারালো হাসুয়া হাতে, তার কমরে দড়ি বেধে আর মাটির হাড়ি ঝুলিয়ে নিয়ে বিশাল উচ্চতার খেজুর গাছে উঠেন। শীতকালের প্রায় ৪ মাস খেজুর গাছই তাঁর সংসারের অন্যতম ভরসা। বেঁচে থাকার অবলম্বন। বাকি ৮ মাস অনেক টা কষ্টে কেটে যায় তাঁর।
নদীকান্ধা গ্রামটি জোয়াখালি নদীর পাড়েই অবস্থিত। নদীর তীরেই মুনসুর আলীর ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি। এই বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস তাঁর। ছোটবেলা থেকেই এই গ্রামেই বড় হয়েছেন মুনসুর আলী। বয়সের ভারে শরীর ঝুঁকে পড়লেও অভ্যাস আর সংসারের দায়বদ্ধতা তাঁকে থামতে দেয়নি। ফলে এখনো এই বয়সে খেজুরের রস সংগ্রহ করে সেগুলো বিক্রি করে সংসার চালান তিনি।

প্রতিদিন ভোরের আগে আগে মুনসুর আলী গাছে ওঠেন। শীতের কনকনে ঠান্ডা, কুয়াশা ভেজা গাছ সবকিছুর মাঝেই ঝুঁকি নিয়ে তিনি রস নামান গাছ থেকে। একটি ভুল পা, সামান্য অসতর্কতা যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পাওে তাঁর জীবনে। তবুও জীবনের প্রয়োজনে এই ঝুঁকি নিয়েই তাঁকে এগোতে হয়। কারণ তাঁর কাছে আর কোনো বিকল্প নেই।
মুনসুর আলীর সংসার বড় নয়, কিন্তু দায় কমও নয়। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁরা প্রত্যেকে আলাদা সংসারে ব্যস্ত। বয়সের কারণে নিয়মিত কাজ করতে না পারায় সন্তানদের ওপর স্ত্রী আকলিমাকে সঙ্গে নিয়ে পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলে নিজের সংসারের খরচ নিজেই চালানোর তাগিদ থেকেই আজও তিনি পরিশ্রম করে যান। খেজুরের রস বিক্রি করেই চলে তাঁর দিনকাল।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো-এত বছরের শ্রমজীবী হয়েও তিনি কখনো কোনো সরকারি ভাতা পাননি। স্ত্রীও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কিন্তু দুজনের কারওরোই বয়স্ক ভাতার কার্ড জোটেনি কপালে। কোনো সহায়তার তালিকায় তাঁদের নাম থাকে না।
স্ত্রী আকলিমার অভিযোগ, কতবার ছবি তুলে দিলাম বোর্ডে (ইউনিয়ন পরিষদে)। কোনো লাভ হয়নি। চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে গেলে বলে ছবি দাও আবেদন দাও। হাটের কম্পিউটারের লোকজনকে দিয়ে আবেদন করায় ছবি দিই। তাও লাভ হয় না। বাধ্য হয়ে এই বৃদ্ধ বয়সেও স্বামীকে বড় বড় খেজুর গাছে উঠে শীতের সকালে রস নামাতে (সংগ্রহ) হয়। ভয় লাগে; তো কি করবো? পেট তো চাল্যাতে হবি।’
মুনসুর আলী বলছিলেন, “কাজ না করলে পেট চলে না। শরীর আর আগের মতো নাই, গাছে উঠতে কষ্ট তো হয়। কিন্তু ভয় লাগে না। ২০-২৫ বছর ধরে ৬-৭ টা খেজুর গাছ লাগায় সংসার চালায়। প্রতিদিন ৪-৫শ ট্যাকার রস বিক্রি হয়। ওই দিয়ে শীত পার করি। তার পর ছাগল-মুরগি-টুরগি পালন করে বছরের বাকি সময় পার করি। আল্লাহ যতদিন শক্তি দেন, ততদিনই কাজ করব।”
মুনসুর আলীর জীবন গল্প নয়, বাস্তবতা। এই বাস্তবতা গ্রামবাংলার অসংখ্য প্রবীণ শ্রমজীবী মানুষের প্রতিচ্ছবি। যারা আজীবন খেটে খেয়েছেন, অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েও নিরাপত্তাহীন। মুনসুর আলীর মতো মানুষদের দিকে তাকালেই প্রশ্ন জাগে-রাষ্ট্রীয় সহায়তার হাত কি সত্যিই সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে?
স্থানীয় দর্শনপাড়া ইউনিয়নে ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মেরাজ উদ্দিন বলছিলেন, ‘মুনসুর আলী আসলেই অনেক গরিব এবং বয়স্ক মানুষ। এবারও বয়স্ক ভাতার কার্ডের আবেদন করেছেন। আগে নানা চাপের কারণে হয়নি; তবে এবার করে দিব ইনশাহআল্লাহ।’
কথা হয় ওই ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলীর সঙ্গে। তিন বলছিলেন, ‘আমি তো জানতাম না এতো বয়স্ক মানুষও এতোটা কষ্ট করেন। আমি এবার তাঁকে অবশ্যই বয়স্কভাতার কার্ড করে দিব। যত চাপই থাকুক না কেন, আমার ক্ষমতাবলে আমি করে দিব। এরকম মানুষরা যদি সরকারি সহায়তা না পান, তাহলে কারা পাবেন?’
স.আর









