সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
দীর্ঘদিনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ‘সাঁতাও’ বানিয়েছেন খন্দকার সুমন। ছিল না অর্থের জোগান। গণমানুষের অর্থে ছবিটি বানিয়েছেন তিনি। কেউ দিয়েছেন ১০০ টাকা, কেউ ৫ হাজার—এভাবে ছোট ছোট বিন্দুকণায় জোগাড় হয়েছিল ছবির বাজেট।

টিভিতে পাক্কা দুই দশক পার করে চলচ্চিত্রে এলেন আফরান নিশো। অভিষেক ছবি ‘সুড়ঙ্গ’তে তাঁর অভিনয় দাগ কেটেছিল দর্শকমনে।
প্রায় প্রতিবছরই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘খুশি করার প্রয়াস’ লক্ষ্য করা যায়।
ওটিটির ছবিকে পুরস্কার, প্রত্যাখ্যান!
বাইরের অনেক দেশে এখন ওটিটির ছবিকে প্রেক্ষাগৃহের ছবির সঙ্গে একই ক্যাটাগরিতে রাখা হয়। তবে বাংলাদেশে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিকেই দেওয়া এত দিন দেওয়া হয়েছে পুরস্কার। এবার প্রথমবার ওটিটির ছবি ‘রক্তজবা’ পেল পুরস্কার। ছবিটির জন্য সেরা চিত্রনাট্যকার হয়েছেন এর নির্মাতা নিয়ামুল মুক্তা। ছবিটি ২০২৩ সালের ঈদুল আজহায় সরাসরি আইস্ক্রিনে মুক্তি পেয়েছিল। যদিও প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির জন্য সেন্সর ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল। এদিকে পুরস্কার পাওয়া খবর পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন মুক্তা। কারণ চিত্রনাট্য লিখেছেন তাসনীমুল হাসান। এ পুরস্কার তারই প্রাপ্য, জানিয়েছেন মুক্তা।
অপূর্ণতায় রাফী
হালের সবচেয়ে সফল নির্মাতা রায়হান রাফী। প্রেক্ষাগৃহে কিংবা ওটিটিতে তাঁর নির্মিত ছবির কদর দর্শকচাহিদার শীর্ষে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেরা পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার জিততে পারেননি। এবার সর্বোচ্চ আট বিভাগে পুরস্কার পেল তাঁর ‘সুড়ঙ্গ’। পরিচালক রাফীর পাওয়া হলো না। তবে একেবারেই খালি হাতে ফিরছেন না তিনি, পাবেন সেরা সংলাপ রচয়িতার পুরস্কার। ‘সুড়ঙ্গ’র জন্যই নাজিম উদ দৌলার সঙ্গে ভাগ করে নেবেন পুরস্কারটি।
আজীবন সম্মাননায় দুই প্রয়াত
আক্ষেপ করে অনেকেই বলেন, এ দেশে জীবিত থাকতে কেউ সম্মান পায় না। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আবারও যেন সেটাই স্পষ্ট হয়ে উঠল। এবার আজীবন সম্মাননা দেওয়া হবে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক-নির্মাতা আব্দুল লতিফ বাচ্চুকে। দুজনেই প্রয়াত। এরই মধ্যে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, অন্তত একটি সম্মাননা জীবিত কাউকে দেওয়া উচিত ছিল। জীবদ্দশায় স্বীকৃতি না দিয়ে মরণোত্তর পুরস্কারে শিল্পীর আদৌ কোনো মূল্যায়ন হয় কি না, তা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।
গানেও রইল প্রশ্ন
সংগীত বিভাগে এবারের পুরস্কার নিয়ে অধিকাংশই সন্তুষ্ট। তবু উঠেছে প্রশ্ন। সেরা গায়ক বিভাগে অনেকের চোখেই যোগ্য আকিব জামান রিয়াদ। যার দরদভরা কণ্ঠে ‘ঈশ্বর’ তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। একই গানের জন্য সেরা গীতিকার সোমেশ্বর অলি ও সেরা সুরকার হয়েছেন প্রিন্স মাহমুদ পুরস্কার, কিন্তু গায়কের ভাগ্যে জুটল না স্বীকৃতি। পুরস্কারটি যাচ্ছে বালামের ঘরে। ‘প্রিয়তমা’ ছবির ‘ও প্রিয়তমা’র জন্য তাঁকে বেছে নিয়েছে জুরি বোর্ড।
শূন্য হাতে মস্কোজয়ী আদিম
রাশিয়ার বিখ্যাত মস্কো উৎসবে একসঙ্গে দুটি পুরস্কার জিতেছিল যুবরাজ শামীমের ‘আদিম’। এরপর আরো বিভিন্ন উৎসবে স্বীকৃতি-প্রশংসা পায় ছবিটি। তবে দেশের জাতীয় পুরস্কারে জুটল না কিছু। বাস্তবের বস্তিবাসীকে পর্দায় এনে ভিনদেশিদের মনজয় করলেও দেশে যেন আড়ালেই থেকে গেল ছবিটি।
খন্দকার সুমন—পরিচালনায় সেরা [সাঁতাও]
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
১৫৫৯ জন সমর্থকের প্রতি কৃতজ্ঞ
খন্দকার সুমন, সেরা পরিচালক
আলো-আঁধারের দুনিয়ায় ‘সাঁতাও’ চেষ্টা করেছে স্বল্প আলোর গ্রামগুলোকে অধিক আলোতে দৃষ্টি হারানো মানুষের দৃষ্টি-সীমানায় ফিরিয়ে আনতে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা ছবিসহ চারটি পুরস্কার সেই চেষ্টাকেই নতুন করে দৃশ্যমান করল। জুরি বোর্ডের প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞ আমাদের ১৫৫৯ জন সমর্থকের প্রতি, যারা আজ থেকে প্রায় আট বছর আগে চলচ্চিত্রটি ভ্রূণ অবস্থায় থাকতেই বিশ্বাস করেছিলেন, ‘সাঁতাও’ আমাদের চলচ্চিত্র। টিমের সকল কলাকুশলীদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ।
আক্ষেপ করলে আল্লাহ নারাজ হবে
রায়হান রাফী, সেরা সংলাপ রচয়িতা
সেরা পরিচালক না হলেও আমি তো পুরস্কার পাচ্ছি—সেরা সংলাপ রচয়িতার। তা ছাড়া আমার ছবি সর্বোচ্চ পুরস্কার পাচ্ছে, এটা তো আমারই প্রাপ্তি। আর ‘সুড়ঙ্গ’র জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার মানুষের ভালোবাসা, সেটা অঢেল পেয়েছিল। ব্লকবাস্টার হিট এই ছবি। বাণিজ্যিক ঘরানার ছবির এত পুরস্কার জয়—এটাও তো বিরল ঘটনা। মজার ব্যাপার হলো, আমার ছবিতে প্রধান চরিত্রে তিনজন পুরুষ অভিনেতা [আফরান নিশো, শহীদুজ্জামান সেলিম ও মনির আহম্মেদ শাকিল]—তিনজনই পুরস্কার পাচ্ছেন। এর পরও যদি আক্ষেপ করি, আল্লাহ নারাজ হবে। এর আগে আমার ‘পরাণ’ সেরা ছবির পুরস্কার পেয়েছিল, এবার সংলাপের জন্য পাচ্ছি, সামনে হয়তো পরিচালকের পুরস্কারও পাব।
তারেক মাসুদের প্রকৃত পুরস্কার তাঁর কাজেই নিহিত
প্রসূন রহমান, তারেক মাসুদের শিষ্য
তারেক মাসুদ বেঁচে থাকতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাঁর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। জীবনের শেষ দিকে তিনি এ পুরস্কারের জন্য আর কাজ জমা দিতেও আগ্রহী ছিলেন না। তিনি দেখেছেন, জাতীয় পুরস্কার বেশির ভাগ সময় রাজনৈতিক বিবেচনা ও বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবে বিলি বণ্টন হয়েছে। সে কারণেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারকে তিনি ‘জাতীয় তিরস্কার’ বলতেন। এ বছর অন্যান্য পুরস্কার নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম সমালোচনা হলেও, মরণোত্তর সম্মাননা বাস্তবে প্রাপকের কোনো কাজে আসে না। তবু আমরা একে স্বাগত জানাই, আর মনে রাখি, তারেক মাসুদের প্রকৃত পুরস্কার তাঁর কাজ ও আদর্শের মাঝেই নিহিত। তাঁকে দেওয়া মরণোত্তর আজীবন সম্মাননা আসলে দেরিতে হলেও আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।
এক নজরে
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩
আজীবন সম্মাননা—
তারেক মাসুদ ও আবদুল লতিফ বাচ্চু
সেরা চলচ্চিত্র—সাঁতাও
সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র—মরিয়ম
সেরা প্রামাণ্য চলচ্চিত্র—
লীলাবতী নাগ : দ্য রেবেল
সেরা চলচ্চিত্র পরিচালক—
খন্দকার সুমন [সাঁতাও]
সেরা অভিনেতা—আফরান নিশো [সুড়ঙ্গ]
সেরা অভিনেত্রী—আইনুন পুতুল [সাঁতাও]
পার্শ্বচরিত্রে সেরা অভিনেতা—মনির আহাম্মেদ শাকিল [সুড়ঙ্গ]
পার্শ্বচরিত্রে সেরা অভিনেত্রী—নাজিয়া হক অর্ষা [ওরা সাত জন]
খল চরিত্রে সেরা অভিনেতা/অভিনেত্রী—
আশীষ খন্দকার [অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন]
সেরা কৌতুক অভিনেতা/অভিনেত্রী—শহীদুজ্জামান সেলিম [সুড়ঙ্গ]
সেরা শিশুশিল্পী—
মো. লিয়ন [আম কাঁঠালের ছুটি]
শিশুশিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার—আরিফ হাসান আনাইরা খান [আম কাঁঠালের ছুটি]
সেরা সংগীত পরিচালক—ইমন চৌধুরী [অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন]
সেরা নৃত্য পরিচালক—
হাবিবুর রহমান [লাল শাড়ি]
সেরা গায়ক—বালাম [প্রিয়তমা]
সেরা গায়িকা—অবন্তী সিঁথি [সুড়ঙ্গ]
সেরা গীতিকার—সোমেশ্বর অলি [প্রিয়তমা]
সেরা সুরকার—প্রিন্স মাহমুদ [প্রিয়তমা]
সেরা কাহিনিকার—ফারুক হোসেন [প্রিয়তমা]
সেরা চিত্রনাট্যকার—নিয়ামুল মুক্তা [রক্তজবা]
সেরা সংলাপ রচয়িতা—রায়হান রাফী ও সৈয়দ নাজিম উদ দৌলা [সুড়ঙ্গ]
সেরা সম্পাদক—মো. সালাহ উদ্দিন আহমেদ বাবু [ওরা সাতজন]
সেরা শিল্প নির্দেশক—শহীদুল ইসলাম [সুড়ঙ্গ]
সেরা চিত্রগ্রাহক—সুমন সরকার [সুড়ঙ্গ]
সেরা শব্দগ্রাহক—সুজন মাহমুদ [সাঁতাও]
সেরা পোশাক ও সাজসজ্জা—
বীথি আফরীন [সুড়ঙ্গ]
সেরা মেকআপম্যান—সবুজ [প্রিয়তমা]









