
সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির জান্তা অনুগত সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে শত শতগুলি-মর্টারশেল সীমান্ত পেরিয়ে এসে পড়ছে বাংলাদেশে। সীমান্তের ওপারে বিকট বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে।

এদিন বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তে তাজা মর্টারশেল নিষ্ক্রিয় করার পর সন্ধ্যায় তুমব্রুর রাস্তা থেকে আরও একটি মর্টারশেল উদ্ধার করা হয়। একই দিন সীমান্তে দুটি লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন স্থানীয়রা। সব মিলিয়ে উদ্বেগ কাটেনি সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম নয়াপাড়া সীমান্তে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত কয়েকশ মর্টারশেল ও গুলি এসে পড়েছে বাংলাদেশ সীমান্তে। টেকনাফের হোয়াইক্যং কানজরপাড়া, উলুবুনিয়া ও খারাংখালী সীমান্তেও বৃহস্পতিবার রাত থেকে
ভোর পর্যন্ত মর্টার এবং গুলির শব্দ শোনা গেছে। উখিয়ার থাইংখালী রহমতের বিল সীমান্ত এলাকায় দুই অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মৃতদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়নি।
উনছিপ্রাং সীমান্তের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওপারে ঢেঁকিবুনিয়া এলাকায় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিগুলো দখল করে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি। হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারি বলেন, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মধ্যে বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি দুদিন শান্ত থাকলেও গত বৃহস্পতিবার রাতে ওপারে মুহুর্মুহু গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাওয়া গেছে; গুলির শব্দ ভেসে এসেছে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের নাফ নদ সীমান্তের ওপার থেকেও। হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল, উনছিপ্রাং, কানজরপাড়া সীমান্তের নাফ নদের ওপারে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। তবে ঘুমধুম সীমান্ত ও উখিয়ার পালংখালীর পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত।
বিজিবি জানিয়েছে, মিয়ানমার থেকে ছুটে আসা অবিস্ফোরিত মর্টারশেল ও বোমা গতকাল দুপুরে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সীমান্তের ওপার থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যে মিয়ানমারের ঢেঁকিবনিয়া এলাকায় শত শত রাউন্ড গুলিবর্ষণের শব্দ পাওয়া গেছে। এপারের লোকজনকে লক্ষ্য করেই এসব গুলি ছোড়া হয়। মুহুর্মুহু গুলিতে উপস্থিত লোকজন দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। কেউ কেউ প্রাণভয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন।
ঘটনাস্থলে থাকা বিজিবির কক্সবাজার রিজিয়ন কর্মকর্তা লে. কর্নেল আজিজ জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে দু’পক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হচ্ছে। এর জের ধরে এপারে গুলি এসে পড়ছে।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু পশ্চিমকুল এলাকার একটি ধানক্ষেতে আরেকটি মর্টারশেল পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুরে ধানক্ষেতে মর্টারশেলটি দেখতে পান স্থানীয় এক নারী। পরে স্থানীয় কিশোর ইয়াছিন আরাফাত তুমব্রু-ঘুমধুম সীমান্ত সড়কে মর্টারশেলটি রাখে। ইয়াছিন আরাফাত জানায়, জুমার নামাজ পড়ে বাড়িতে ফেরার সময় এক নারী তাকে মর্টারশেলটি দেখান। সে মর্টারশেলটি হাতে নিয়ে বিজিবি সদস্যদের দেখাতে যায়। তারা মর্টারশেলটি দ্রুত নিরাপদ স্থানে রেখে দিতে বলেন। সন্ধ্যায় তুমব্রু-ঘুমধুম সীমান্ত সড়কের পশ্চিমকূল এলাকায় মর্টারশেলটি সড়কে রাখা হয়। সেখানে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে আশপাশের ১৫-২০টি পরিবারের সদস্যদের তাৎক্ষণিকভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মেহেদী হোসেন কবীর জানান, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম-তুমব্রু সড়কের ওপর পড়ে থাকা মর্টারশেলটি গতকাল সন্ধ্যায় উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
অপরদিকে উখিয়া উপজেলার থাইংখালী সীমান্ত এলাকায় অজ্ঞাত দুটি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। তারা বিষয়টি পাশর্^বর্তী বিজিবি সীমান্তচৌকিকে অবহিত করেন। পরে বিজিবির মাধ্যমে লাশ উদ্ধারে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সীমান্তে মুহুর্মুহু গুলির কারণে পুলিশ ও বিজিবি মৃতদেহ দুটি উদ্ধার করতে পারেননি।
এ বিষয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম হোসেন বলেন, সীমান্তে দুটি মৃতদেহ পড়ে থাকার খবরটি বিজিবি জানিয়েছে। পরে পুলিশ সীমান্তে গিয়ে মৃতদেহ দুটি উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। কিন্তু সীমান্তের ওপারের গোলাগুলির কারণে মৃতদেহ দুটি উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে মৃতদেহ উদ্ধারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
গত সোমবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে তুমব্রুর জলপাইতলীতে মিয়ানমারের ওপার থেকে নিক্ষেপ করা মর্টারশেলের আঘাতে দুজন নিহত ও এক শিশু আহত হয়। মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের জেরে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
মিয়ানমারে সংঘর্ষের কারণে কয়েক দফায় বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে দেশটির ৩৩০ জন বিজিপি সদস্য, সরকারি কর্মকর্তাসহ সাধারণ নাগরিক। তাদের নিরস্ত্র করে বাংলাদেশে রাখা হয়েছে। মিয়ানমারের এসব নাগরিককে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর আগে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা শুরু হলে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ পর্যন্ত তাদের ফেরত নেয়নি মিয়ানমার।
২ রোহিঙ্গা নারীকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি
মিয়ানমারে সংঘাতের জেরে নাফ নদ দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে দুই রোহিঙ্গা নারীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি। এ নিয়ে গত দুদিনে ৪ রোহিঙ্গা নাগরিককে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলো। বিজিবির টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দীন আহমেদ জানান, গতকাল বিকাল সাড়ে তিনটায় টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের নাফ নদের লম্বাবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে দুই রোহিঙ্গা নারীকে ধরে আবার ফেরত পাঠানো হয়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার নাফ নদ হয়ে অনুপ্রবর চেষ্টাকালে আরও দুই রোহিঙ্গা নাগরিককে আটক করে স্বদেশে ফেরত পাঠিয়েছিল বিজিবি।








