সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো. মনজুরুল ইসলাম লিটনের প্রকাশ্য শত্রু যে জামায়াত-শিবির, এই কথা গাইবান্ধার সবারই জানা। কিন্তু তার গোপন শত্রু কারা? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিজ বাসভবনের বৈঠকখানায় দুর্বৃত্তের গুলিতে খুন হওয়ার পর এ প্রশ্নই এখন মুখে-মুখে ঘুরছে।

এ প্রসঙ্গে এমপি লিটনের ছোট বোন তাহমিদা বুলবুল কাকলী বলেন, ‘জামায়াত-শিবির তার প্রকাশ্য শত্রু। এছাড়া আরও কোনও স্বার্থন্বেষী মহল এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা, তাও খুঁজে বের করা দরকার। আশা করি, তদন্তকারীরা প্রকৃত খুনিকে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবেন।’
এদিকে এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত-সংশ্লিষ্টরাও তার গোপন-শত্রুর সন্ধানে নেমেছেন। এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিউর রহমান বলেন, ‘এজাহারে জামায়াতকে সন্দেহ করা হয়েছে। আমরাও সন্দেহ করছি। কিন্তু সন্দেহের এখানেই শেষ নয়। আরও সন্দেহের নানা দিক আছে। আমরা সব দিকই তদন্ত করে দেখছি।
মোটিভ স্পষ্ট হতে আরও সময় লাগবে। কারণ কারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, বিষয়টি আমরা এখনও নিশ্চিত নই। নিশ্চিত হলেই মোটিভ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। বিষয়টি এত কাঁচা নয়। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তারা পরিকল্পিভাবে করেছে। সুতরাং তাদের সহজে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।’
এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে গাইবান্ধায় কাজ করছেন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এসব সংস্থা ও বাহিনীর কয়েকজন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে অনেক আগে থেকেই জামায়াত-শিবির এমপি লিটনকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। ১৯৯৮ সালে গাইবান্ধার সুন্ধরগঞ্জের বামনডাঙ্গা কলেজ মাঠে জামায়াত নেতা গোলাম আজমের সমাবেশ ঠেকানোর পর থেকেই এই হুমকি ছিল লিটনের ওপর।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর সুন্দরগঞ্জে ৪ পুলিশ সদস্য ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকেও হত্যা করে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা। তখন এমপি লিটন জামায়াত-শিবিরের দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হন। এসব কারণে জামায়াত-শিবির লিটনের ওপর ক্ষুব্ধ। সুযোগ পেলেই ছোবল মারতে পারে, এমন আশঙ্কার কথা কাছের মানুষদেরও জানিয়েছিলেন লিটন।
এমপি লিটনকে খুনের মাধ্যমে জামায়াত-শিবির পথের কাঁটা সরিয়েছে বলে মনে করেন স্বজন ও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে আরও কোনও স্বার্থান্বেষী মহল এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা, সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন তারা। এছাড়া শিশু সৌরভের পায়ে গুলি লাগার পর যারা তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে, তার নিজ দলের সেসব নেতাকর্মী এমনকি স্বজনদের মধ্যেও দুই একজনকে তদন্তকারীরা সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন। সবদিক যাচাই-বাছাই করে পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে ওইদিকে হাত বাড়াতে চান না তারা।
২০১৫ সালের ২ অক্টোবর ভোরে এমপি মানজুরুল ইসলাম লিটনের গুলিতে আহত হয় শিশু শাহাদত হোসেন সৌরভ। এ ঘটনার পর পুলিশ তার লাইসেন্স করা অস্ত্র জব্দ করে। ক্ষোভের বশে এমপি লিটনও সেই অস্ত্র আর ফেরত নেননি। হত্যাকাণ্ডের দিন তার সঙ্গে কোনও অস্ত্রও ছিল না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে নিরস্ত্র করে রাখার বিষয়টিও রহস্যজনক বলে মনে করেন কেউ কেউ।
তার স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রতিদিন বিকালে অনেক নেতাকর্মী বাড়িতে থাকতেন। কিন্তু সেদিন কোনও নেতাকর্মীই বাড়িতে ছিলেন না। বাড়িতে শুধু তিনি তার ভাই সৈয়দ বেদারুল আহসান বেতার, ভাগ্নি শিমু, চাচি স্মৃতি বেগম ও বাড়ির কেয়ারটেকার ইসমাইল, ইউসুফ ও সৌমিত্র ছিল। ইউছুফকে মুরগি আনতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু গুলির শব্দ শুনে ইউছুফ আবার ফিরে আসে। সৌমিত্র বাড়ির অদূরেই ছিল। এছাড়া দুই নারী গৃহকর্মী ছিল রান্নাঘরে।’ এর আগে মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘১৯৯৮ সালে গোলাম আযমের জনসভা পণ্ড করে দিয়েছিলেন লিটন। তখন থেকেই জামায়াত-শিবির লিটনকে যেকোনও মূল্যে হত্যার টার্গেট করে রেখেছিল।’
তার বাড়ির কেয়ারটেকার শাহ আলম বলেন, ‘সব মিলিয়ে আটজন ওই বাড়ির কর্মচারী হিসেবে কাজ করি। তবে আমি বাড়ির দায়িত্বে নয়, পাশের একটি মাছের প্রজেক্টের দায়িত্বে ছিলাম। বাড়ির কেয়ারটেকারের দায়িত্বে শুধু ইউছুফ ও সৌমিত্র ছিল।’
বুধবার এমপি লিটনের বাড়িতে গেলে দেখা হয় গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সবদিক মাথায় রেখেই এমপি লিটনের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত বলার মতো কোনও অগ্রগতি হয়নি।’
একই স্থানে উপস্থিত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) বিশেষ পুলিশ সুপার আহসান হাবিব পলাশ বলেন, ‘এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে কাজ চলছে। সময় হলে সবকিছুই জানানো হবে।’
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন









