ধর্ম

ইকরিমা (রা.) ইসলামের শত্রু থেকে পরম বন্ধু

নিউজ ডেস্ক৪ অক্টোবর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ গোত্রের বনু মাখজুম শাখার সন্তান ইকরিমা (রা.)। তিনি ছিলেন আমর ইবনে হিশাম ওরফে আবু জাহেলের ছেলে। তাঁর পিতা আবু জাহেল ইসলাম ও নবীজির চরম শত্রু ছিল। সে-ও ছিল মাখজুম গোত্রের নেতা।

বদর যুদ্ধে মারা যাওয়ার পর সে নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী হন পুত্র ইকরিমা। ইকরিমা মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে পিতার ন্যায় তিনিও ছিলেন ইসলামের চরম শত্রু। ইসলাম গ্রহণের পর হয়ে গেলেন ইসলামের পরম মিত্র।

(আল-ইসাবাহ : ৪/৪৪৩ পৃ., ক্র. ৫৬৫৪; তাহজিব : ৭/২৫৭ পৃ.)
ইসলাম গ্রহণের পূর্ব জীবন

রাসুল (সা.) যখন দাওয়াতের কাজ শুরু করেন, তখন ইকরিমা (রা.)-এর বয়স ৩০-এর কাছাকাছি। তাঁর পিতা ছিল মক্কার সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী, ইসলামবিদ্বেষী। তার জুলুম-নির্যাতনের জাঁতাকলে মুসলমানরা ছিল নিষ্পেষিত। তার সন্ত্রাসী তাণ্ডবে শান্তিকামী মুসলমানদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছিল।

পিতার অনুসরণে ইকরিমাও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর, নির্দয় ও কঠোর। তাঁর পিতা বদরের যুদ্ধে বড় দম্ভের সঙ্গে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং বড় গলায় বলেছিল, মুসলমানদের একটা কিছু দেখিয়েই মক্কায় ফিরবে। কিন্তু তার সব দম্ভ মাটির সঙ্গে মিশে গেল। মুসলমানদের দুটি বাচ্চার হাতে প্রাণ হারাল বড় অসহায় অবস্থায়। ছেলে ইকরিমা এসব সচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

সর্বশেষ বাবার মরদেহটিও বদরের মাটিতেই ফেলে ফিরতে হয়েছে তাঁকে। শোচনীয় পরাজয় তাঁকে পিতার মরদেহটি দাফন করার সুযোগও দেয়নি।
পিতার মৃত্যুর পর ইসলামের সঙ্গে ইকরিমার শত্রুতা নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করল। তিনি যেকোনো মূল্যে মুসলমানদের ওপর পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প করলেন। উহুদ, খন্দক ইত্যাদি যুদ্ধেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ চালালেন।

সর্বশেষ অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় তাদের নেতাদের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইকরিমা (রা.) একদল সৈনিক নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তিনি সেখানেও পরাস্ত হন। (আসহাবে রাসুলের জীবনকথা : ১/২০৩—২০৪ পৃষ্ঠা)

ইসলাম গ্রহণ ও তার পটভূমি

মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও চারজন পুরুষ ও দুজন মহিলাকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। পুরুষ চারজনের একজন ছিলেন ইকরিমা ইবনে আবুজাহল। অপর তিনজন হলো আব্দুল্লাহ ইবন খাতল, মিক্বয়াস ইবনে সুবাবাহ ও আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ।

(উসদুল গাবাহ : ৩/ ৫৬৮পৃ., ক্র.৩৭৩৫)

ইকরিমা (রা.) এ খবর শুনে জীবন বাঁচানোর তাগিদে মক্কা ছেড়ে ইয়েমেনের পথ ধরলেন। তাঁর স্ত্রী (যিনি চাচাতো বোনও) উম্মে হাকাম বিনতে হারেস ইবনে হিশাম মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি খুব দ্রুত রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে স্বামীর পক্ষে প্রাণভিক্ষা চেয়ে তাঁর নিরাপত্তা কামনা করলেন। রাসুল (সা.) তা মঞ্জুর করলেন। এরপর তার স্ত্রী ইয়েমেনের উদ্দেশে ছেড়ে চলা জাহাজ থেকে তাঁকে ফিরিয়ে এনে ইসলাম গ্রহণ করান। এবং তিনি মহানবী (সা.)-এর অতীতের শত্রুতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

কোনো কোনো বর্ণনামতে, তিনি জাহাজে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সাগরের মাঝখানে যখন উত্তাল তরঙ্গ শুরু হয় তখন সবাই এক আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগল, আর তিনি ডাকতে লাগলেন ‘লাত’ ও ‘উজ্জ’ দেবীকে। নৌযানের লোকেরা বলল, এখানে (সাগর পথে) এক আল্লাহ ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাদের কথা তাঁর অন্তরকে দারুণভাবে ধাক্কা দিল। তিনি অকপটে বলে ফেললেন, মুহাম্মদ তো আমাদের সেই সত্তার দিকেই আহ্বান করে। তাহলে ফিরে চলো, মুহাম্মদের নিকট গিয়ে মুসলমান হয়ে যাই। যেমন কথা তেমন কাজ। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন রাসুল (সা.)-এর দরবারে। বিবাহের নবায়ন ছাড়াই পূর্বের বিবাহের ওপর তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল রাখা হয়েছে। (আল-মুজামুল

কাবির : ১৭/৩৭২, আল-ইসাবাহ : ৪/৪৪৪)

ইকরিমা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করার পর মুসলমানরা তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলত ‘এ আল্লাহর দুশমন আবু জাহেলের ছেলে’। এটা তাঁর কাছে খুব খারাপ লাগত। তিনি রাসুল (সা.)-এর নিকট অভিযোগ করলেন। রাসুল (সা.) স্বীয় সাহাবিদের বললেন, তোমরা তার বাবাকে গালি দিয়ো না। মৃত ব্যক্তিকে গালি দিলে জীবিত ব্যক্তির কষ্ট হয়।

(উসদুল গাবাহ : ৩/৫৬৮)

ইন্তেকাল

খলিফা উমর (রা.)-এর খিলাফত আমলে ১৫ হিজরির রজব মাসে সংঘটিত হয় ইয়ারমুকের যুদ্ধ। সে যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন হজরত ইকরিমা (রা.)। তীর, তলোয়ার ও বর্শার ৭০টিরও বেশি জখম তাঁর শরীরে দেখা গেছে।

(আল-ইসতিআব : ৩/১০৮৫)