নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর আম সারাদেশের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। এই চাহিদার ওপর ভর করেই দিনের পর দিন এই অঞ্চলে আম উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবারও আশা করা হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন হবে রাজশাহীতে। এরই মধ্যে সরকারি নির্দেশনা মেনে রাজশাহীর বাজারগুলোতে জমতে শুরু করেছে আমের বাজার। বাজারে এখন আমের রাজা গোপাল ভোগসহ আঠি জাতের বিভিন্ন আমের পশরা বসতে শুরু করেছে।
রাজশাহীর এই আমগুলো যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
আম কেনা-বেচায় ব্যস্ততা বেড়েছে চাষী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শ্রমিকদেরও। যারা আম বাগান থেকে পাড়া থেকে শুরু করে বাজারজাত, প্যাকেটিংসহ নানাকাজে জড়িত।সেইসঙ্গে ইফতারী, অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে পাতে পাতে দেখা মিলছে আম আর আম। যেন আম্রময় হয়ে উঠেছে রাজশাহী।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহীর বানেশ্বর বাজারে প্রতিদিন সকাল থেকেই এখন আম আসছে। বেচা-কেনা চলছে বিকেল পর্যন্ত। এই বাজারের ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের দুই পাশে বানেশ্বর বাজারের মাঝখানে জমে আমের পশরা। এই আমই এখন বানেশ^রের বাজারের মূল আকর্ষণ। প্রতিদিন এই বাজারে এখন অন্তত অর্ধকোটি টাকার আমের কেনা-বেচা চলছে। কয়দিন বাদে ছেড়ে যাবে কোটি টাকা। তখন বাজারে ধাপ ফেলারো যেন জায়গা থাকবে না। এই আম যাচ্ছে, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর থেকে শুরু করে দেশেরে বিভিন্ন প্রান্তে। এখানেই থেমে থাকছে না। দেশের গ-ি পেরিয়ে বানেশ^র বাজারের এই আম ছড়িয়ে পড়ছে বিদেশের মাটিতেও।
ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারি নির্দেশণা মেনে গত ২০ মে থেকে বানেশ্বর বাজারে আম কেনা বেচা শুরু হয়। এখন দেশের সবচেয়ে বড় আমের হাট বসছে পুঠিয়ার বানেশ^রে। এই হাটে এখন যেসব আম বেচা-কেনা চলছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গোপালভোগ ও আঠিজাতের আম। কয়দিন বাড়েই আসতে শুরু করবে
লোকনা, ল্যংড়া, দুধস্বর ও হিমসাগর জাতের আম। এই আমগুলো আসে জেলার পুঠিয়া, বাঘা, বাগমারা, দুর্গাপুর, পবা, মোহনপুর থেকে। এর বাইরেও কিছু আম আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর থেকে।
হাটের আম বিক্রি করে আসা আমচাষি মুনসুর আলী জানান, এবার প্রতিমণ গোপালভোগ আম এখন বিক্রি হচ্ছে ১৫-১৮ শ টাকা, এবং গুটি জাতের আম ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এবার রাজশাহীতে ঝড় এবং কয়েক দফা শিলার দেখা মিললেও রাজশাহীতে আমের খুব একটা ক্ষতি হয়নি। ফলে গতবারের চেয়ে রাজশাহীতে এবার আমের ফলন অনেক বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমা বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়া সঙ্গে গাছ থেকে আম পাড়া ও বাজারে বিক্রি করা এ নিয়েই চরম ব্যস্ততায় সময় কাটাতে হচ্ছে এখানকার আমচাষি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। আমের কল্যাণে এখন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতিও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আমকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য পাল্টে দিয়েছে এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতি। রাজশাহী অঞ্চলের দুটি বড় আমের মোকাম রাজশাহীর বানেশ্বর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট বাজার মিলে প্রতিদিন বেচাকেনা হচ্ছে অন্তত এক কোটি টাকার আম। আমের কারবার নিয়ে রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানও হয়েছে। গাছের আম নামানোর কামলা থেকে, আম পরিবহণ, আম চালানের ঝুড়ি বানানো এবং বাজারগুলোয় আম সংশ্লিষ্ট নানা কাজে এসব মানুষ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আমকেন্দ্রীক হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ফলে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে গ্রামীণ অর্থনীতিও। বেড়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও লেন-দেনের পরিমাণ।
বানেশ্বর বাজারে আম বিক্রি করতে আসা দুর্গাপুরের নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সাত সকালে উঠেই গাছ থেকে আম নামানো শুরু হয়। এরপর ঝুড়িতে করে আবার দুপুরের মধ্যেই নিয়ে আনতে হয় বানেশ্বর বাজারে। কারণ দুপুর পার হলে তখন আর আমের তেমন দাম পাওয়া যায় না। দুপুরের মধ্যেই পাইকারী ব্যবসায়ীর আম কেনা শেষ করেন। হয়তো তিনটা থেকে সাড়ে তিনটা বাজে পাইকারীদের আম কেনার সময়টা। কিন্তু কখনোই সেভাবে বিকেল পর্যায়ে গড়ায় না। তাই দুপুরের মধ্যেই আম নিয়ে আসতে হয় এ বাজারে।
এ বাজারের আম ব্যবসায়ী হোসেন আলী বলছিলেন, বাজারে মূলত আমের কেনা-বেচা শুরু হয় দুপুর ১২টার মধ্যে। এরপর চলে বিকেল সাড়ে তিনটা নাগাদ। আর আম কেনার পরে সেগুলো ঝুড়ি করা থেকে শুরু করে ট্রাকে উঠানো পর্যন্ত। প্রতিদিন তিনিই অন্তত ৩ লাখ টাকার আম কেনেন। তার মতো এ বাজারে অন্তত দেড় শ পাইকারী ব্যবসায়ী আসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। ফলে সব ব্যবসায়ী মিলে প্রতিদিন অন্তত অর্ধ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে এ বাজারে। কয়দিন পর বাজারে যখন হিমসাগরসহ অন্যান্য জাতের আম আসতে শুরু করবে, তখন কোটি টাকার লেনদেন ছাড়িয়ে যাবে আমকেন্দ্রিক।
অপর ব্যবসায়ী আকবর হোসেন জানান, ভোররাত থেকে আমচাষিরা ভ্যান, ভটভটি, নসিমন, করিমনসহ স্থানীয় বাহনে করে আম নিয়ে বাজারে উপস্থিত হচ্ছেন। ফড়িয়ারা এসব আম কিনে জমা করেন আড়তে। আড়ত থেকে পাইকার ও চালানি ব্যাপারীরা আম কিনে ট্রাকে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। তিনি আরো বলেন, ‘আমচাষির হাত থেকে পাইকারী ব্যবসায়ী এবং সেখান থেকে আম যায় আড়তে। আড়ৎ হয়ে পরে উঠে ট্রাকে। এভাবে ধাপে ধাপে আমের দাম ও খরচও বাড়ে। এসব কাজে কয়েক হাজার মানুষ জড়িত হয়ে পড়ে। ফলে তারাও কিছু না কিছু আয়-উপার্জন করছেন।’ আবার অনেকেই সরাসরি আম বাগান থেকে কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছেন বলেও জানান ব্যবসায়ীরা।

]রাজশাহীর ফল গবেষণা কার্যালয় সূত্র মতে, আমের রাজধানী রাজশাহীতে বেড়েই চলেছে আমের চাষ। গত কয়েক বছর ধরে রাজশাহীতে অব্যাহতভাবে বেড়েছে আমচাষ। এক হিসেব মতে, গত ছয় বছরে রাজশাহীতে আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে দ্বিগুন। সেইসঙ্গে উৎপদানও বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। পাশাপাশি বাড়ছে অর্থনীতির গতিও। এবারও রেকর্ড পরিমাণ আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে। স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এ বছর। চলতি বছর রাজশাহীতে আমের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে। যা এর আগে এতো পরিমাণ জমিতে আমচাষ কখনোই হয়নি। এ বছর ওই পরিমাণ জমি থেকে আম উৎপদানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৬৪ মেট্রিক টন। এটিও স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যমাত্রা। আমগাছে যে পরিমাণ মুকুল এসেছে-তাতে এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়ে রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন হবে বলেও আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজশাহী ফল গবেষণাগার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৯৬১ হেক্টর জমিতে আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে চাষ হয় ১৭ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে। যা গত বছর ছিল রাজশাহীতে সর্বোচ্চ আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা। এর আগের বছর ২০১৬ সালে রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সেখান থেকে আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৭৯ মেট্রিক টন। সেখানে উৎপাদন হয় এক লাখ ৮১ হাজার ১০৭ মেট্রিক টন। গত বারের উৎপাদনই এবারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এবার গতবারের চেয়ে আম বেশি উৎপাদন হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। কারণ গতবারের চেয়ে এবার বেড়েছে লক্ষ্যমাত্রা।
ওই সূত্রটি আরো জানায়, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ হাজার ৫১৯ হেক্টর জমিতে। সেখানে চাষ হয়েছিল ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে। এর আগের বছর ২০১৪ সালে রাজশাহীতে আমচাষের জন্য ১৪ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে রাজশাহীতে আমের লক্ষমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৯৮৬ হেক্টর জমিতে। তবে সেখানে হয়েছিল ১৪ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আব্দুল আলীম জানান, হেক্টর প্রতি গড়ে ১৫ দশমিক ৫৮ মেট্রিক টন হারে আম উৎপাদন হবে বলেও এবারও আশা করা হচ্ছে। সেই হিসেবে এবার আমের উৎপাদন গতবারের চেয়ে অনেক বাড়বে। যা হবে সবচেয়ে বেশি আমের উৎপাদন। এবার গাছগুলোতে ব্যাপক পরিমাণ মুকুল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে এবারও রাজশাহীতে সর্বোচ্চ আম উৎপাদন হবে।
স/আর









