নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার এক গ্রামে হুজুরের ‘ফুঁ’ নিতে লক্ষাধিক মানুষের ভিড় লেগে যাচ্ছে। জাহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার তালঘড়িয়া হাফিজিয়া ও ফুরকানিয়া মাদ্রাসায় বসে তেল-পানিতে ‘ফুঁ’ দেন। তাই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন।
জহিদুল ইসলামের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার আবদানপুর গ্রামে। তিনি পার্শবর্তী চেঁউখালী জামে মসজিদের ইমাম। আগে ওই মসজিদে বসেই তিনি তেল-পানি পড়া দিতেন। গত চার সপ্তাহ ধরে এসেছেন বাগমারার তালঘড়িয়া গ্রামে। তার রোগীরা এখানেই ছুটে আসছেন।

তালঘড়িয়া গ্রাম বাগমারা উপজেলার পূর্ব প্রান্তে। এর পূর্বে নাটোরের নলডাঙ্গা আর পূর্ব-উত্তর দিকে নওগাঁর আত্রাই উপজেলা। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও বগুড়ার অনেক মানুষ এখানে আসছেন হুজুরের ‘ফুঁ’ নিতে। তাদের বিশ্বাস, হুজুরের তেল ও পানি পড়ায় অসুখ সারে। যে কোনো একটি অসুখের ‘নিয়্যতে’ পানি খেলে কিংবা তেল মালিশ করলে তাতে কাজ হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজের পরই শুরু হয় হুজুরের ‘ফুঁ’ দেওয়া। রিকশা, অটোরিকশা, ভ্যান, বাইসাইকেল-মোটরসাইকেলে বহু মানুষ তখন ছোটেন তালঘড়িয়ার দিকে। শুক্রবার দুপুরে বাগমারা গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। তালঘড়িয়া ঢোকার আগে পলিথিন বাজার। সেখান থেকেই রিকশা-ভ্যানের তুমুল যানজট চোখে পড়ে। যানজট ঠেলে তালঘড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বহু নারী-পুরুষ হুজুরের তেল ও পানি পড়া নিতে লাইন ধরে আছেন। স্কুলমাঠের পশ্চিম দিকে তালঘড়িয়া মাদ্রাসা। ওই মাদ্রাসার ভেতর বসে হুজুর ‘ফুঁ’ দিচ্ছেন। তবে তার কাছে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই। মাদ্রাসার কর্মীরা মানুষের কাছ থেকে প্লাস্টিকের ঝুড়ি ভর্তি তেল ও পানির বোতল নিয়ে যাচ্ছেন। তাতে হুজুরের ‘ফুঁ’ এনে তারা ফেরত দিচ্ছেন। কেউ কেউ সেখানে বসেই পানি পান করছেন।
মাঠজুড়ে রাখা হয়েছে দানবাক্স। মাইকে বার বার দানবাক্সে দান করতে বলা হচ্ছে। তাতে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা ফেলছেন। প্রতিটি দানবাক্সের জন্য রয়েছেন একজন করে পাহারাদার। মাঠজুড়ে বসেছে তেল ও পানির দোকান। এছাড়া নানারকম খাবার, শিশুদের খেলনাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রের দোকান বসেছে। দেখে মনে হচ্ছে, সেখানে গ্রামীণ মেলা বসেছে। মোটরসাইকেল রাখার জন্য কয়েকজন গ্যারাজ করেছেন। টাকা দিয়ে সেখানে মোটরসাইকেল রাখতে হচ্ছে। তুমুল এই ভিড় সামলাতে দায়িত্ব পালন করছেন আনসার সদস্যরা।
তবে বিশাল এই জমায়েতে ছবি তোলা কিংবা ভিডিও করার অনুমতি নেই। মাদ্রাসার ভেতর থেকে এক ব্যক্তি মাইকে বার বার এ ব্যাপারে সতর্ক করছেন। বলছেন, ‘এখানে কোনো খারাপ কাজ হচ্ছে না। কেউ ভিডিও করবেন না।’ কেউ যাতে ভিডিও করতে না পারেন, সে জন্য মাঠে রয়েছেন মাদ্রাসার লোকজন। কেউ ফোন বের করে উপরে তুললেই তারা এসে ভিডিও বন্ধ করছেন।
নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে এসেছেন মো. শহীদ। তিনি বলেন, ‘বিষ-ব্যাথা ভাল হয়। প্যারালাইসিসের রুগীও যুদি এক নিয়তে পানি খাই, সে-ও আরাম পায়। আবার বলতিসে যে, ক্যানসারের রুগীটাও নিয়ন্ত্রণ হোচ্চে। এ রকম মুখের কথা। বাঙালী তো আমরা হুজুগে বাঙালী। একটা কথা বলতিসে একজন, ওইডাই ধইরি লিচ্ছে। আমিও আইসচ্চি।’
বগুড়ার নন্দীগ্রাম থেকে এসেছেন বৃদ্ধ আবদুল হক। তিনি বলেন, ‘আমার হাঁটুতে ব্যাথা। পা তুইলতে পারি না। তাই হুজুরের পানি পড়া খাচ্ছি, তেল মালিশ করছি। পর পর চাইর সপ্তা পানিপড়া খাতি হবে। এবার আমার তিন সপ্তা হলো। একটু তো কম কম লাগিচ্চে। তাই আইস”ি।’
মাঠে রাখা একটি দানবাক্সের পাহারায় ছিলেন আবুল কাসেম। তিনি বলেন, ‘পানি পড়া নেওয়ার পর যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী দিচ্ছে। এটা মাদ্রাসা আর এতিমদের কল্যাণে খরচ হবে।’
মাদ্রাসার সামনে এক ব্যক্তি মাইকে নানা ঘোষণা দিচ্ছেন। বলছেন, যেসব মা-বোনদের বাচ্চা হয় না, তারা আগামী রোববার মসজিদে গিয়ে হুজুরের সাক্ষাৎ নিবেন। এখানে হুজুরের সঙ্গে দেখা হবে না। মাদ্রাসার ভেতরে বসে ‘ফুঁ’ দিচ্ছেন হুজুর। মূল ফটক বাঁশ দিয়ে ঘেরা। ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই। হুজুরের সঙ্গে দেখা করার জন্য এই ব্যক্তির সহযোগিতা চাইলে তিনি বলেন, আজ হুজুর কারও সঙ্গেই দেখা করবেন না। অনুমতি নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে হুজুর জাহিদুল ইসলাম তার গ্রামের মসজিদ থেকে তেল ও পানি পড়া দিতেন। কিছুদিনের মধ্যে সেখানেও প্রচুর মানুষ আসতে থাকেন। এখন সেটি বাদ দিয়ে এসেছেন বাগমারায়। আগে তিনি অটোরিকশা চালাতেন। পরে মসজিদের ইমাম হন। এখন তিনি প্রাইভেটকারে চলাচল করেন।
জাহিদুল ইসলামের প্রতিবেশী এবং নলডাঙ্গার চেঁউখালী জামে মসজিদের মুসল্লী রহিদুল ইসলাম দাবি করেন, ওই মসজিদে তেল ও পানি পড়ার দিন দান বাক্সে যে টাকা আদায় হতো, তা থেকে বিশ হাজার টাকা হুজুরকে দেওয়া হতো। টাকা নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় তিনি এখন তালঘড়িয়ায় পানি পড়া দিচ্ছেন। এখানেও একদিনেই কয়েক লাখ টাকা আদায় হয়।
স্থানীয়রা জানেন, এই টাকার বড় অংশ পান হুজুর জাহিদুল ইসলাম। বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েকদফা হুজুর জাহিদুল ইসলামকে ফোন করা হলেও ধরেননি।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন অফিসার এস.আই.এম রাজিউল করিম বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবগত নই। তেল ও পানি পড়ায় রোগ ভালো হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর কোন ভিত্তি নেই। কেউ যদি এ ধরনের অপকর্মের সাথে জড়িত থাকে তাহলে আমরা প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি দেখব।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, ‘এটা আমারও জানা ছিল না। আমি এটা দেখব।’









